শনিবার ব্রিগেডে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: পিটিআই।
গেরুয়া ফতুয়া আর সরু দুধে আলতা পাড় ধুতি। কপালে গেরুয়া তিলক। শনিবার ব্রিগেড ময়দানে এ ভাবেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। অনেকে মনে করছেন, পোশাক বাছাইয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের কথা মাথায় রেখেছেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে নিজের বাঙালি সত্ত্বাকেও তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে মনে করছেন বিজেপিরই একাংশ।
ভোট প্রচারে হোক বা বিধানসভার অধিবেশন কিংবা বিজেপির কর্মসূচি— শুভেন্দুকে সাদা ফুলহাতা পাঞ্জাবি এবং পাজামাতেই বেশি দেখা গিয়েছে। হলুদ বা গেরুয়া পাঞ্জাবি যে তিনি পরেননি, তা নয়। প্রচারেও তাঁকে ওই গেরুয়া বা কাঁচা হলুদ রঙের পাঞ্জাবি বা ফতুয়া পরতে দেখা গিয়েছে। তাঁকে হাফ হাতা ফতুয়া পরতে দেখা গিয়েছে আকছার। গত ২৯ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে, নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে তিনি সেই হাফ হাতা ফতুয়া এবং পাজামা পরেই ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। গত ৪ মে, ভোটের ফলপ্রকাশের দিনেও তাঁর পরনে ছিল ওই একই পোশাক— হাফ হাতা সাদা ফতুয়া এবং পাজামা।
শনিবার ব্রিগেডের মাঠে শপথ গ্রহণের দিনেও সেই হাফহাতা ফতুয়া এবং ধুতিতে দেখা গেল শুভেন্দুকে। ফতুয়ার রং গেরুয়া। হাফহাতা কুর্তা বা ফতুয়া সাধারণত আরএসএসের পূর্ণকালীন (হোলটাইমার) বা প্রচারকদের পরতে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নিজে যে দিন শপথ নিচ্ছেন, সে দিন শুভেন্দু কেন হাফহাতা পরলেন, তা নিয়ে অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যা খুঁজছেন। তবে অধিকাংশের মতে, শপথের দিনের পোশাক আরএসএসের প্রতি শুভেন্দুর বার্তা।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি-তে প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে আরএসএসের ‘ঘরের ছেলে’ হিসাবে যে ক’জনকে দেখা হয়, শুভেন্দু সে বন্ধনীতে পড়েন না। কিন্তু তা বলে শুভেন্দুর মুখ্যমন্ত্রিত্বে আরএসএস কোনও আপত্তিও করেনি বলেই খবর। বরং সঙ্ঘের পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের নেতৃত্বই শুভেন্দুকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়ার প্রস্তাবে সিলমোহর দিয়েছেন বলে কেশব ভবন সূত্রের খবর। শুভেন্দুও তাই শপথের দিনে নিজের বেশভূষায় সঙ্ঘের সঙ্গে ‘একাত্মতা’র বার্তা দিলেন বলে অনেকে মনে করছেন। সঙ্ঘের প্রচারকদের ওই পরিধানের মধ্যে ‘সাধারণ জীবনযাপন’-এর বার্তা থাকে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার দিন শুভেন্দুও সম্ভবত বোঝাতে চাইলেন যে, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কোনও ‘দূরের নক্ষত্রে’ পরিণত হবেন না। ‘সাধারণ’-ই থাকবেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণা হওয়ার পরেই শুভেন্দু জানিয়ে দিয়েছিলেন ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রে এগিয়ে যাওয়ার কথা।
গেরুয়া ফতুয়ার সঙ্গেই শুভেন্দু বেছে নিয়েছিলেন দুধে আলতা পাড় সাদা ধুতি। কেউ কেউ মনে করছেন, বাঙালি আবেগকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। ভোটের আগে প্রচারে তৃণমূল বার বার দাবি করেছিল, বিজেপি বাঙালি-বিরোধী দল। ক্ষমতায় এলে বাঙালির মাছ-ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়ে দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মুখ্যমন্ত্রী হবে বাঙালিই— বাংলায় কথা বলা, বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়া। অনেকে মনে করছেন, শপথ নেওয়ার সময় শুভেন্দু শাহের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের কথাই মনে করিয়ে দিলেন।
শুভেন্দুর পাশাপাশি শনিবার ব্রিগেডে শপথগ্রহণ করেছেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। দিলীপের পরনে ছিল সেই তথাকথিত সাদা পাঞ্জাবি, তবে ফুলহাতা এবং সঙ্গে পাজামা। অগ্নিমিত্রার পরনে ছিল লাল পাড়-সাদা শাড়ি। শাড়িতে ফুলের ছাপ। গলায় গেরুয়া-সবুজ উত্তরীয়, যাতে ছিল বিজেপির প্রতীক পদ্ম। নিশীথ পরেছিলেন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। গলায় সবুজ সুতোর কাজ করা হলুদ রঙের উত্তরীয়। অশোকের পরনে ছিল সাদা ফুলহাতা শার্ট এবং সাদা প্যান্ট। গলায় বিজেপির প্রতীক আঁকা গেরুয়া উত্তরীয়। ক্ষুদিরামের পরনে ছিল হালকা গেরুয়া পাঞ্জাবি এবং পাজামা। গলায় গেরুয়া রঙের বিজেপির প্রতীক আঁকা উত্তরীয়।