গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।
ধর্মতলায় নারাজ প্রশাসন। কিন্তু ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবস’ পালন করবেই মমতাপন্থী তৃণমূল। জোর গলায় বলছেন ওই শিবিরের নেতারা। একই কথা বলছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও। কোথায়, তা নিয়ে এখনও ধন্দ কাটেনি। এরই মধ্যে বুধবার কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এক কর্মিসভায় ২১ জুলাই সকালে দক্ষিণ কলকাতার হাজরা মোড়ে জমায়েতের ডাক দিয়েছে। সেখানেই কি হবে ‘শহিদ দিবসে’র জমায়েত? এখনও স্পষ্ট নয়। অন্য দিকে ঋতব্রত শিবির জানিয়েছে, তারাও কর্মসূচির জায়গা নির্বাচনের জন্য আলোচনা চালাচ্ছে।
বুধবার দক্ষিণ কলকাতার মহারাষ্ট্র নিবাস হলে ২১ জুলাই নিয়ে এক কর্মিসভার আয়োজন করে মমতাপন্থী তৃণমূল। সেখানে হাজির ছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, মদন মিত্র, দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, রাজ্যসভা সাংসদ দোলা সেনরা। সেখান থেকেই ২১ জুলাই সকালে হাজরা মোড়ে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়। এর পর উত্তর কলকাতার জন্যও একটি কর্মিসভা হবে বলে জানা গিয়েছে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল সূত্রে খবর, সেখান থেকে সম্ভবত হেদুয়ার মোড়ে জমায়েতের ডাক দেওয়া হবে। বুধবার ওই কর্মিসভা থেকে বেরিয়ে আনন্দবাজার ডট কমকে বৈশ্বানর বলেন, “জমায়েত হবেই। ওরা আমাদের শহিদ তর্পণ করতে দেবে না, এটা আমরা মানব নাকি?” একই সুর শোনা যায় দোলার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘‘জমায়েত হবেই।’’
কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদার জানান, তাঁরা প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, “দিদি যদি জমায়েতের ডাক দেন, কর্মীরা তো যাবেনই।” পাশাপাশি অসিতের আশঙ্কা, ২১ জুলাইয়ের আগেই তাঁকে বা যাঁরা কর্মীদের সংগঠিত করতে উদ্যোগী হচ্ছেন, তাঁদের গ্রেফতার করা হতে পারে। তাঁর কথায়, ‘‘গ্রেফতার করলে করবে! কী আর করব! কিন্তু গ্রেফতার করে ওরা কত কর্মীকে আটকাবে?” বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার, বারুইপুর পশ্চিমের তৃণমূল বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এত দিনের বসে যাওয়া কর্মীরা এখন সবচেয়ে বেশি উৎসাহী। তাঁরা অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। স্থানীয় ভাবেও আলোচনা চলছে।”
অর্থাৎ, জমায়েত যে হবে, সেটা নিশ্চিত করছেন নেতানেত্রীরা। কিন্তু হবে কোথায়? পুলিশ তো ধর্মতলায় জমায়েতের অনুমতি দেয়নি। উপরন্তু, ধর্মতলা-সহ মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ২ জুলাই থেকে ৩০ অগস্ট পর্যন্ত— ৬০ দিনের জন্য জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। অন্য দিকে, ২০১৮ সালে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ভিক্টোরিয়া হাউজ়ের সামনে সম্পূর্ণ রাস্তা আটকে ২০২৫ সালেও ‘শহিদ দিবস’ পালনের অভিযোগে তৃণমূলকে সম্প্রতি নোটিস দিয়েছে আদালত। অনুমতি না-পেলে কোথায় কী ভাবে জমায়েত হবে, সে প্রশ্নে মুখ খুলছেন না কোনও তৃণমূল নেতাই। দোলার কথায়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তিনি আমৃত্যু শহিদ দিবস পালন করবেন। যতই বাধা আসুক, আমরা নিশ্চয়ই আইন মেনেই এই কর্মসূচি করব।” তবে, প্রশাসনিক নির্দেশকে আইনি ভাবে চ্যালেঞ্জ করা হবে কি না, সে বিষয়ে দোলা বা বৈশ্বানর কেউই স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি।
এ প্রসঙ্গে মমতা দলের অন্দরে কোনও বার্তা দিয়েছেন কি? তা জানা না-গেলেও দলের কলকাতার এক নেতার মতে, মমতা এখনও জল মাপছেন। সরাসরি প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার অবস্থায় দল আছে কি না, আদালতে কী হতে পারে, বিকল্প স্থানে করা যায় কি না, এই সব নানান আলোচনা তিনি সারছেন ঘনিষ্ঠ মহলে। দলের ওই নেতার মতে, ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসার কোনও উপায় নেই। কারণ তা হলে মনে হবে ‘দিদি’ দমে গিয়েছেন। দিদি অদম্য, এটাই তাঁর মূল পরিচিতি। সরাসরি সংঘাতই তাঁর চিরাচরিত পথ। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হঠকারিতা না-করার কথাও ভাবতে হচ্ছে। দলের একটা অংশের মতে, বিকল্প স্থান হিসেবে ব্রিগেড ময়দানকে ভাবা হোক। সে ক্ষেত্রেও অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে। অনুমতির বিষয় যেমন আছে, তেমনই এটাও সত্যি যে, লোক কম হলে সেটা ব্রিগেডেই সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায়। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যে আগের মতো ভিড় হবে না, এটা প্রায় সবাই মেনে নিচ্ছেন। মমতা এখনও মুখ খোলেননি। দলীয় নেতাদের ইঙ্গিত, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে তিনি এই নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না-ও বলতে পারেন।
তৃণমূলের ঋতব্রত শিবিরও জানিয়েছে, ২১ জুলাই তারাও কর্মসূচি করবে। তবে সম্ভবত প্রশাসনের সঙ্গে কোনও রকম সংঘাতের পথে তারা যাবে না। এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেন, “আশা করছি, এই সপ্তাহের শেষের মধ্যেই আমরা আলোচনা করে ঠিক করে ফেলতে পারব, কর্মসূচি কোথায়, কী ভাবে হবে।”