গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, হুমকি, মারধর এমনকি ডাকাতির পরিকল্পনা! নানা অভিযোগে রাজ্যের দিকে দিকে গ্রেফতার তৃণমূলের নেতা এবং ঘনিষ্ঠেরা। গত দু’দিন ধরে একের পর এক গ্রেফতারির ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ করছে তৃণমূল।
মঙ্গলবারই তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন বিধাননগরের তৃণমূল কাউন্সিলর সুশোভন মণ্ডল ওরফে মাইকেল। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকার কয়েক জন দোকানদার থানায় অভিযোগ করেন। তার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ বলে পুলিশ সূত্রে খবর। এক দোকানদারের দাবি, তাঁর কাছ থেকে ৩ লক্ষ টাকা তোলা নেওয়া হয়েছে। সোমবার রাতে বিধাননগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপিতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিজিৎ পোল্লে ওরফে ছোটু নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ। তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। রাস্তার ধারে বিভিন্ন দোকান থেকে তোলার অভিযোগ যেমন রয়েছে, অটো, টোটো, বাস এবং হকারদের থেকেও তোলাবাজিতে অভিযুক্ত তিনি। অভিযোগ, অনেকের কাছে দৈনিক হিসাবেও টাকা তুলতেন ছোটু। গত ৪ বছর ধরে এমনটাই চলছিল। ওই ভাবে কত টাকা তোলা হয়েছে, কার কাছে সেই টাকার ভাগ গিয়েছে, তা তদন্তসাপেক্ষ বলে জানান বিধাননগরের এক পুলিশকর্তা। এলাকাবাসীদের দাবি, প্রাক্তন পুরপ্রধান সব্যসাচী দত্তের ‘ঘনিষ্ঠ’ ছিলেন ছোটু।
আবার শিরোনামে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি। প্রাক্তন তৃণমূল নেতা শাহজাহান শেখ-ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতের নাম শ্রীদাম হাউলি। সন্দেশখালি-২ ব্লকের তৃণমূল সহ-সভাপতি তিনি। শ্রীদামের বিরুদ্ধে দাঙ্গা, মারধর, খুনের চেষ্টা, নারী নির্যাতন এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে । তা ছাড়া ২০১৫ সালে ভেড়িদখল নিয়ে সংঘর্ষে তিনি জড়িত ছিলেন। ২০২০ সালে অতিমারির সময়ে সরকারি নির্দেশ অমান্য এবং পুলিশকে আক্রমণের অভিযোগও রয়েছে।
ডাকাতির পরিকল্পনায় যোগসাজশের অভিযোগে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বাঁকুড়ার জেলার সহ-সভাপতি সূরজ বক্সকে পাকড়াও করেছে পুলিশ। তাঁকেও সোমবার রাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাঁকুড়া সদর থানার পুলিশ সূত্রে খবর, নির্বাচনের আগে এক প্রাথমিক শিক্ষক তথা সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের নেতাকে রাস্তায় ফেলে মারধরের ঘটনায় নাম জড়ায় সূরজের। মামলা হয়েছিল। তৃণমূলের ওই যুবনেতা জামিন পাওয়ার পর এলাকাতেই ছিলেন। মঙ্গলবার তাঁকে বাঁকুড়া জেলা আদালতে হাজির করানো হলে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক। তবে এই মামলাটি গত ১২ মে-র।
বাঁকুড়া সদর থানার পুলিশের কাছে খবর যায় রাজগ্রাম-শ্যামডাঙার রাস্তায় খাদি কেন্দ্র লাগোয়া একটি ফাঁকা জায়গায় জড়ো হয়ে রাস্তায় যাতায়াতকারী গাড়িতে ডাকাতির পরিকল্পনা করছে একদল দুষ্কৃতী। সেখানে হানা দিয়ে সুরজিৎ প্রামাণিক এবং আকাশ গড়াই নামে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু বাকিরা রাতের অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যান। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে যে ক’জনের নাম পাওয়া গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে একজন তৃণমূলের যুবনেতা।
পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরে ‘প্রভাবশালী’ তৃণমূল নেতা আহম্মদ হোসেন শেখকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি পুরনো মামলায় জামিন নিতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে পাকড়াও হন। মন্তেশ্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি আহম্মদ হোসেনের গ্রেফতারিতে শোরগোল মন্তেশ্বরে।
স্থানীয় সূত্রে খবর, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মন্তেশ্বরের বিজেপি প্রার্থী সৈকত পাঁজা জয়ী হওয়ার পর থেকে এলাকায় দেখা যাচ্ছিল না ওই তৃণমূল নেতাকে। এমনকি, পঞ্চায়েত সমিতির অফিসেও তাঁকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছিল না। আগে একাধিক দুর্নীতি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। কিন্তু শাসকদলের নেতা হওয়ায় পুলিশ তাঁকে ছুঁতেই পারেনি বলে স্থানীয়দের একাংশের দাবি। ওই তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী থেকে ইঞ্জিনিয়ারদের গায়ে হাত তোলার মতো অভিযোগও রয়েছে। রাজ্যের প্রাক্তন গ্রন্থাগার মন্ত্রী তথা মন্তেশ্বরের বিধায়ক সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাতেও আহম্মদ হোসেনের নাম জড়িয়েছিল। তখনও তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হয়নি। মঙ্গলবার ওই তৃণমূল নেতাকে আদালতে হাজির করানো হচ্ছে।
পুলিশের গায়ে হাত পড়লে কাউকে রেয়াত করা হবে না— পার্ক সার্কাসে পুলিশের উপর হামলার পর এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঘটনাক্রমে র্যাফের উপর হামলার অভিযোগে হাওড়ায় একজনকে গ্রেফতার করল গোলাবাড়ি থানার পুলিশ। ধৃতের নাম মহম্মদ আরশাদ আনসারি। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর হাওড়া পিলখানা এলাকায় শেখ সৌফিক নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। হারুন খান ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। সেই সময়ে দোষীদের গ্রেফতারির দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। পথঅবরোধ করে রাস্তায় দাঁড়ানো বাইকে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যত্রতত্র চলে ভাঙচুর। পুলিশ এবং র্যাফ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের উপরে হামলা হয়। কর্তব্যরত সরকারি আধিকারিককে লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগ ওঠে আরশাদের বিরুদ্ধে। তৃণমূল জমানার ঘটনায় আরশাদকে গ্রেফতার করল শুভেন্দু অধিকারীর পুলিশ।
রবিবার রাতে পশ্চিম বর্ধমানের অন্ডালের পড়াশকোল এলাকায় তৃণমূলের বুথ সভাপতি-সহ দুই নেতা পাকড়াও হয়েছেন তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট রাজ চালানোর অভিযোগে। ধৃতদের নাম রামজীবন লোহার এবং মুন্না সাউ। রামজীবন লোহার বহুলা পঞ্চায়েতে তৃণমূলের উপপ্রধান। বীর বাহাদুরের ডান হাত বলে পরিচিত। অভিযোগ, এলাকার কোলিয়ারির কয়লা সিন্ডিকেট থেকে মোটা অঙ্কের তোলা আদায় করতেন তাঁরা। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হত। দিনের পর দিন এই জুলুমবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে থানায় অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। তার পরেই এই গ্রেফতারি।