অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
গত লোকসভা ভোটে কোচবিহার আসনটি জিতেছিল তৃণমূল। সাতটি বিধানসভার কেন্দ্রের মধ্যে দু’টিতে জিতেই ওই লোকসভা জেতে রাজ্যের শাসকদল। পরে উপনির্বাচনে আরও একটি আসন জিতে আপাতত তারা সাতটি বিধানসভার মধ্যে তিনটিতে এগিয়ে। কিন্তু চারটি এখনও বিজেপির দখলে। বিধানসভা ভোটে এই হিসাব প্রত্যাশিত ভাবেই চাইছেন না তৃণমূলের ‘সেনাপতি’। তাই মঙ্গলবার কোচবিহারের জনসভা অভিষেক বিজেপির অন্দরে বিভাজন তৈরির কৌশল নিলেন।
মঙ্গলবার কোচবিহারের সভার মঞ্চেও ১০ জনকে হাজির করান অভিষেক। যাঁরা এসআইআরের খসড়া তালিকায় ‘মৃত’। তবে ওই আক্রমণের মুখে পড়ে বিজেপি পাল্টা বুথ স্তরের আধিকারিক বা বিএলও-দের দিকে আঙুল তুলেছে। অভিষেককে কটাক্ষ করে শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ বলেছেন, ‘‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ করতে চাই, আপনি আপনার সভায় যে ভূতেদের র্যাম্পে হাঁটিয়ে নির্বাচন কমিশনকে দোষারোপ করছেন, সেই জীবিত মানুষদের যাঁরা ভূত বানিয়েছেন, সেই বিএলও-দেরও এবার র্যাম্পে নিয়ে আসুন বা তাঁদের নাম প্রকাশ করুন।’’
অভিষেকের এই অভিযোগের পরে তৎপর হয়েছে কমিশন। তারা জানিয়েছে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।
কমিশনকে আক্রমণ ছাড়া বাকিটা ছিল বিজেপির অন্দরে বিভাজনের কৌশল। যার একদিকে নিশীথ প্রামাণিক। অন্যদিকে অনন্ত মহারাজ। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বার বার কোচবিহারের প্রাক্তন সাংসদ নিশীথকেই কটাক্ষ করে গেলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁকে ‘বিজেপির আবর্জনা’ বলেও উল্লেখ করলেন। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করা নিশীথকে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে হারানোর জন্য ধন্যবাদ জানালেন কোচবিহারবাসীকে। আর ধন্যবাদ জানালেন বিজেপিরই রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজকে। বললেন, অনন্ত সত্যি কথা বলেছেন। তাই তাঁকে ‘কুর্নিশ’ জানাচ্ছেন তিনি।
রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিজেপির দিকে আঙুল তোলেন অভিষেক। সেই প্রসঙ্গেই ধন্যবাদ জানান অনন্তকে। অভিষেক বলেন, ‘‘নোটবন্দির পরে ভোটবন্দির নামে সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে (মোদী সরকার)। আমরা অবৈধ আর দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈধ! ধন্যবাদ জানাই অনন্ত মহারাজকে। তিনি সত্যি কথাটা বলেছেন।’’ প্রসঙ্গত, অনন্ত বলেছেন, যাঁদের ভোটার তালিকায় নাম থাকবে না, বিশেষত রাজবংশীদের, তাঁদের উপর অত্যাচার করা হয়েছে। অসমের এনআরসি তালিকায় ১২ লক্ষ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিষেক বলেন, ‘‘অনন্ত মহারাজ বলছেন, সকলকে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাবে বিজেপি। তিনিই বলেছেন, দেশের প্রধানমন্ত্রীর শংসাপত্র রয়েছে? রাষ্ট্রপতির রয়েছে? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রয়েছে? তাঁরা নিজে তো বাংলাদেশি, পাকিস্তানি। এ কথা আমি বলছি না। অনন্ত মহারাজ বলছেন। সত্যি বলার জন্য তাঁকে কুর্নিশ জানাই।’’
তার পরেই অভিষেক কটাক্ষ করেন নিশীথকে। অমিত শাহের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নিশীথ। বিএসএফের মাধ্যমে কোচবিহারের মানুষের উপর অত্যাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘আগামী দিনের লড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা বাংলার মানুষকে প্রাণে মারতে চেয়েছেন। বিএসএফ দিয়ে শ্রমিক-কৃষকদের উপর অত্যাচার করিয়েছেন। তাঁদের কে মারছে? বিজেপির অমিত শাহের অধীনস্থ বিএসএফ। তার প্রতিমন্ত্রী কে ছিলেন? এই লোকসভা কেন্দ্রের (প্রাক্তন) সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক। কোচবিহারের মানুষকে কুর্নিশ জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই, ২০২৪ সালে ৭৮ হাজার ভোটে তৃণমূলকে জিতিয়ে বিজেপির আবর্জনাটাকে দূর করেছেন।’’
নিশীথকে কটাক্ষের সুর আরও চড়িয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘কী ঔদ্ধত্য, অহঙ্কার! পরিযায়ী সাংসদ। থাকতেন দিল্লিতে। মাঝে মাঝে এসে এক দিন থেকে পালাতেন।’’ জনতাকে তিনি বলেন, ‘‘আপনার আর আমার মধ্যে দূরত্ব ছিল। সেই দেওয়াল ভেঙে দিয়েছি। এখন আর দূরত্ব নেই।’’
প্রসঙ্গত, নিশীথ ছিলেন কোচবিহারের যুব তৃণমূল নেতা। সেই পর্বে অভিষেকই ছিলেন যুব তৃণমূলের সভাপতি। দলের অন্দরে নিশীথের পরিচয় ছিল, তিনি ‘অভিষেকের লোক’। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কোচবিহারে অভিভাবক বনাম যুব সংগঠনের কোন্দল বেআব্রু হয়ে গিয়েছিল। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে সর্বত্র তৃণমূলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্দল হিসাবে নিশীথের বাহিনী মনোনয়ন জমা দিয়েছিল বলে অভিযোগ। বহু আসনে তৃণমূলের প্রার্থীদের হারিয়ে দিয়েছিলেন সেই নির্দল প্রার্থীরা। সংঘাত এমন জায়গায় গিয়েছিল যে, কার্বাইনের মতো অস্ত্র প্রকাশ্যে এসে পড়েছিল। তার পরে সেই নিশীথ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জেতেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের জগদীশচন্দ্র বসুনিয়ার কাছে হেরে যান নিশীথ। অভিষেকের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, নিশীথই ছিলেন সেই ‘দেওয়াল’।