Rubio’s Kolkata Visit

চলতি মাসের শেষে কলকাতায় মার্কিন বিদেশসচিব? গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অতিথি আসছেন ‘রামের বনবাস’-এর মেয়াদ কাটিয়ে!

রুবিয়োর ভারত সফরসূচি এখনও বিশদে জানানো হয়নি। তবে ২৪, ২৫ ও ২৬ মে তিনি ভারত সফরে থাকছেন বলে খবর। দিল্লিতে তিনি একাধিক বৈঠকে যোগ দেবেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ১৭:২৯
US Secretary of State Marco Rubio may visit Kolkata during his India tour by May end, say sources in New York

মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। —ফাইল চিত্র।

বিস্ময়কর সমাপতন পশ্চিমবঙ্গে! মাত্র পাঁচ দিন আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রামপন্থী সরকার। আর এর মধ্যেই জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে এ রাজ্যের গুরুত্বের প্রশ্নে ‘রামচন্দ্রের বনবাস’-এর মেয়াদ সংক্রান্ত হিসাব প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ১৪ বছর বনবাসে ছিলেন রাম। তার পরে অযোধ্যায় ফিরেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও ঠিক ১৪ বছর পরে কোনও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অতিথির আগমনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো চলতি মাসের শেষ দিকে ভারত সফরে আসছেন। তাঁর কর্মসূচি মূলত দিল্লি-কেন্দ্রিকই হতে চলেছে। কিন্তু সে সবের মাঝে তিনি কলকাতা সফরেও আসছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সূত্রের দাবি। কলকাতায় নিযুক্ত মার্কিন দূতের কথাতেও সে ইঙ্গিত মিলেছে।

Advertisement

রুবিয়োর ভারত সফরসূচি এখনও বিশদে জানানো হয়নি। তবে আগামী ২৪, ২৫ ও ২৬ মে তিনি ভারত সফরে থাকছেন বলে খবর। দিল্লিতে তিনি একাধিক বৈঠকে যোগ দেবেন। তার মধ্যে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক তো থাকছেই, কোয়াড (আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত) গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের সম্মেলনও থাকছে। ইরান যুদ্ধের আবহে এই বৈঠক তথা সম্মেলনগুলি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কূটনীতিকদের মতে, রুবিয়োর এই আসন্ন ভারত সফর শুধু আঞ্চলিক স্তরে নয়, সারা বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সফরের ফাঁকেও রুবিয়ো এক বার কলকাতা ছুঁয়ে যাবেন বলে মার্কিন সূত্রই দাবি করছে।

শেষ বার কোনও মার্কিন বিদেশসচিব কলকাতা সফরে এসেছিলেন ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বের বয়স তখন বছর দেড়েক। তদানীন্তন মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন কলকাতায় এসেছিলেন। বড়সড় প্রতিনিধিদল সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। মহাকরণে গিয়ে মমতার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক করেছিলেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়েছিল যে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। হিলারির সঙ্গে যেমন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ন্যান্সি পাওয়েল বা কনসাল জেনারেল ডিন থম্পসন ছিলেন, তেমনই মমতার সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র, মুখ্যসচিব সমর ঘোষ, স্বরাষ্ট্রসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়েরা। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১২ মিনিট বেশি চলেছিল সে বৈঠক।

হিলারির সে কলকাতা সফরের পর থেকে আর কোনও শীর্ষ মার্কিন কর্তাকে পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসতে দেখা যায়নি। গত ১৪ বছরে, বিশেষত নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে, প্রথম ও তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের শীর্ষনেতাদেরই বার বার ভারত সফরে আসতে দেখা গিয়েছে। আমেরিকার বারাক ওবামা, জো বাইডেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, চিনের শি জিনপিং, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, ফ্রান্সের নিকোলাস সারকোজি, ইম্যানুয়েল মাকরঁ, জার্মানির ওলাফ শোলস, ইজ়রায়েলের বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ব্রিটেনের ঋষি সুনক— মোদী জমানায় এঁদের সকলকেই ভারত সফরে আসতে দেখা গিয়েছে। কাউকে এক বার, কাউকে একাধিক বার। এই সময়ের মধ্যেই ভারতে কখনও জি-২০ শিখর সম্মেলন হয়েছে, কখনও ব্রিকস শীর্ষ বৈঠক হয়েছে। সে সব কর্মসূচিতে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইটালি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল-সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ভারতে দেখা গিয়েছে। কোনও কর্মসূচি দিল্লিতে হয়েছে, কোনওটি অহমদাবাদে, কোনওটি মুম্বইয়ে, এমনকি কোনওটি তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরমেও হয়েছে। কিন্তু কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ব্রাত্যই থেকেছে। এ বছরের মে মাসের শেষে রুবিয়ো কলকাতায় এলে ব্রাত্য থাকার সে দীর্ঘ পরম্পরায় ছেদ পড়বে। পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে জাতীয় মানচিত্রে রাজ্যের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে, সে ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়ে যাবে।

মে মাসের শেষ সপ্তাহে ভারত সফরে থাকাকালীন রুবিয়ো যে কলকাতাতেও আসবেন, সে কথা এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে মার্কিন দূতাবাস জানায়নি। তবে কলকাতার মার্কিন কনসুলেট জেনারেল সূত্রে কয়েক দিন আগে জানানো হয়েছে যে, তাঁরা বিদেশসচিব রুবিয়োকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকারি সফরসূচিতে, সে সবের কোনও উল্লেখ এখনও নেই।

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বাম জমানা শুরুর প্রায় এক দশক আগে থেকেই বামেদের দাপটে কলকাতা বিদেশি অতিথিদের জন্য অস্বস্তির গন্তব্য হয়ে উঠেছিল বলে অনেকে মনে করেন। ১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর বিশ্বব্যাঙ্কের তৎকালীন প্রধান তথা প্রাক্তন মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব রবার্ট ম্যাকনামারাকে কলকাতায় এসে বামেদের বিক্ষোভ দেখতে হয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ম্যাকনামারার ভূমিকার বিরোধিতা করে বামপন্থী সংগঠনগুলি সে দিন এমন বিক্ষোভ করেছিল যে, ম্যাকনামারা হেলিকপ্টারে চড়ে কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। সে ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তির পক্ষে ইতিবাচক হয়নি। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে বাম-যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে তাই গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অতিথিরা, বিশেষত উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা সহজে কলকাতামুখো হতেন না।

ব্যতিক্রম ঘটেছিল মাদার টেরেসার প্রয়াণের পরে। তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিতে ১৯৯৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় হাজির হয়েছিলেন আমেরিকার তৎকালীন ফার্স্ট লেডি (প্রেসিডেন্টের স্ত্রী) হিলারি ক্লিন্টন, জর্ডনের রানি নুর, বেলজিয়ামের রানি ফ্যাবিওলা, স্পেনের রানি সোফিয়া। ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজ়াবেথ প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, সে দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকট এসেছিলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের স্ত্রী, ইটালির প্রেসিডেন্ট, কানাডার প্রধানমন্ত্রীও এসেছিলেন। কিন্তু সেটি কোনও রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সফর ছিল না। তাই ১৪ বছর আগে হিলারির মহাকরণে আসাই ছিল পশ্চিমবঙ্গে শেষ বার কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি রাষ্ট্রনেতার আগমন। অনেকে বলছেন, এ মাসের শেষে মার্কিন বিদেশসচিব রুবিয়ো কলকাতায় এলে, প্রতীকী অর্থে ‘রামচন্দ্রের বনবাস’ শেষ হবে।

Advertisement
আরও পড়ুন