(বাঁ দিকে) রাজ্যপাল আরএন রবি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
পরিবর্তনে শামিল হতে রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান করলেন রাজ্যপাল আরএন রবি। তুলে ধরলেন পশ্চিমবঙ্গের অতীত এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা। ডাক দিলেন পশ্চিমবঙ্গের গৌরবকে পুনরুদ্ধার করার জন্য। বুধবার পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে লোক ভবনে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন তিনি। সেখানেই রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে এই অঙ্গীকার করার পরামর্শ দেন রাজ্যপাল। এই মন্তব্যের পর পরই মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম না-করে নিশানা করছেন তাঁকে।
লোক ভবনে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল জানান, পশ্চিমবঙ্গ চিরকালই সাহিত্য, শিল্পচর্চা, সংস্কৃতি এবং বৌদ্ধিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ছিল। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ভাবেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল এবং দেশের অন্যতম সেরা রাজ্যগুলির মধ্যে একটি ছিল। কিন্তু এখন আর সেই গরিমা নেই বলেই মনে করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের সেই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করার জন্য সকলকে এগিয়ে আসার ডাক দেন রাজ্যপাল রবি।
রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ইতিবাচক হওয়ার প্রতিজ্ঞা করুন। পরিবর্তনের অংশ হওয়ার প্রতিজ্ঞা করুন। উন্নততর হওয়ার, গৌরব পুনরুদ্ধার করার এই পরিবর্তন আকাশ থেকে এসে পড়বে না। এটা আমাদেরই করতে হবে। আমাদের প্রত্যেককে করতে হবে। আসুন, শপথ করুন। যখন দেশ এমন অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে চলছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে থাকতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গকেও এর সঙ্গী হতে হবে। হয়তো নেতৃত্বও দিতে হবে।”
কথা প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ‘এ কাল এবং সে কাল’-ও তুলে ধরেন রাজ্যপাল। তিনি জানান, স্বাধীনতার সময়ে এবং পরবর্তী দশকগুলিতে দেশের সেরা তিন অর্থনীতির মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। তিনি বলেন, “৬০’-এর দশকে দেশের মোট জিডিপি-র ১০ শতাংশেরও বেশি আসত পশ্চিমবঙ্গ থেকে। তামিলনাড়ু, কর্নাটক বা গুজরাত থেকে নয়— পশ্চিমবঙ্গ থেকে। এই মাটি ছিল শিল্পের মাটি। এই মাটি ছিল সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক ভাবে প্রাণবন্ত।”
রাজ্যপাল আরও বলেন, “১৯৮০-র দশকের আগে গোটা দেশে মাত্র চারটি রাজ্যের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বেশি ছিল। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজ ১৫টি রাজ্যের লোকের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে ঢের বেশি। জাতীয় পুঁজিতে আমাদের ভাগ ১০.৬ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আজ স্কুল এবং কলেজে নাম নথিভুক্তকরণের যে অনুপাত রয়েছে রাজ্যে, তা জাতীয় অনুপাতের চেয়ে অনেক কম।” তাঁর দাবি, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি নথিভুক্ত এবং কার্যকর ক্ষুদ্র, কুটির এবং মাঝারি শিল্প রয়েছে। তার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাটা প্রায় তিন লক্ষ। রাজ্যের পরিস্থিতির কথা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, “কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছি আমরা। যে রাজ্য গোটা দেশকে প্রগতিতে পথ দেখাত, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজ পরিস্থিতি খুব খারাপ।” একই সঙ্গে রাজ্যপাল আরও বলেন, “এই মাটি মা দুর্গার মাটি। পশ্চিমবঙ্গ যে নিজের গৌরব ফিরে পাবে, তা নিয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। ভারতের বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার পথে পশ্চিমবঙ্গেরও একটি অগ্রণী ভূমিকা থাকবে।”
রাজ্যপাল রবির এই মন্তব্যের পর উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের সভা থেকে তোপ দাগেন মমতাও। তিনি বলেন, ‘‘বাংলার লাটসাহেব, সবচেয়ে বড় বাড়িতে যিনি থাকেন, আমি নাম নেব না, আজ বিবৃতি দিয়েছেন। আজ নববর্ষ, বাংলার মানুষকে অভিনন্দন জানান। আমাকে গালি দিয়েছেন। আগে তো অশান্তি হত না। এখন আপনাদের অধীনে আসার পর প্রতি দিন অশান্তি হচ্ছে। এটা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যায়। আমাদের হাতে এখন আইনশৃঙ্খলা নেই। নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রের কাছে রয়েছে।’’
গত মার্চেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্বগ্রহণ করেছেন রবি। গত ১২ মার্চ কলকাতায় আসেন তিনি। ১৩ মার্চ লোক ভবনেই তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতাও। আনন্দ বোসের জমানায় অতীতে বার বার রাজ্য বনাম রাজ্যপাল সংঘাত প্রকট হয়েছে। তবে রবি দায়িত্বে আসার পর গত এক মাসে সে ভাবে কোনও সংঘাত দেখা যায়নি। মাঝে ২১ মার্চ লোক ভবনে গিয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতও করেন মমতা।
তবে বুধবার নববর্ষের প্রথম দিনেই রাজ্যপাল বুঝিয়ে দিলেন, এ রাজ্যের অর্থনৈতিক হাল ভাল নয় বলেই মনে করেন তিনি। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে রাজ্য যে অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তা-ও জানালেন রাজ্যপাল। তা নিয়ে আবার পাল্টা নিশানা করলেন মমতাও। এ অবস্থায় নবান্ন এবং লোক ভবনের সমীকরণ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়েও কৌতূহল দানা বাঁধতে শুরু করেছে।