Parivartan Yatra

রাজ্যে অষ্টদিবস ‘পরিবর্তন যাত্রা’ শেষে বিজেপির হাতে হিসাবের ‘পেন্সিল’, প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির খাতায় কাটাছেঁড়া দলের অন্দরে

কর্মসূচি শেষে বিজেপির হাতে এখন ‘পেন্সিল’। হিসাবের খাতা-পেন্সিল। যাত্রা থেকে প্রাপ্তি কতটা হল? কোন কোন লক্ষ্য অধরা রয়ে গেল? কাটাছেঁড়া শুরু হল পদ্মশিবিরের অন্দরে।

Advertisement
ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ১৯:৫৬
What result Parivartan Yatra yields to Bengal BJP? What are the take-away from an 8-day long programme? BJP calculated

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সূচনা পর্ব চলেছিল দু’দিন ধরে। ১ এবং ২ মার্চ। গোটা কর্মসূচি শেষ হল ১০ মার্চ। মাঝে দোল এবং হোলির জন্য দু’দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’। সব মিলিয়ে ছিল আট দিনের কর্মসূচি। তাতে গোটা দেশে থেকে গন্ডায় গন্ডায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ভিন্‌রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী-উপ মুখ্যমন্ত্রী, সর্বভারতীয় স্তরের নেতা-সাংসদ-খ্যাতনামীদের পশ্চিমবঙ্গে এনে হাজির করেছিল বিজেপি। পাল্লা দিয়ে চষে বেড়িয়েছেন রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির নেতারাও। কর্মসূচি শেষে বিজেপির হাতে এখন ‘পেন্সিল’। হিসাবের খাতা-পেন্সিল। ‘যাত্রা’ থেকে প্রাপ্তি কতটা হল? কোন কোন লক্ষ্য অধরা রয়ে গেল? কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে পদ্মশিবিরের অন্দরে।

Advertisement

প্রাপ্তির হিসাব

১. রাজ্যে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার আগেই নেতারা গোটা রাজ্য একবার চষে ফেলেছেন এবং কর্মীদের সঙ্গে একদফা দেখাসাক্ষাৎ, আলাপ-আলোচনা সেরে নিয়েছেন। যা ‘ফাইনাল ম্যাচ’ শুরুর আগে ‘ওয়ার্ম-আপ’ হিসাবে কাজ করবে।

২. প্রত্যেকটি জেলা তো বটেই, ‘যাত্রা’য় অধিকাংশ বিধানসভা কেন্দ্রও ছুঁয়ে ফেলেছেন বিজেপি নেতৃত্ব। জমায়েত বা কর্মসূচির চেহারা যেমনই হোক, সর্বত্র দলের কর্মীদের অন্তত রাস্তায় নামাতে পেরেছেন তাঁরা। ভোটের আগে কর্মীদের মধ্যে যে উৎসাহ জাগানো জরুরি ছিল, ‘পরিবর্তন যাত্রা’ তা পেরেছে বলে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছেন।

৩. গত আট দিনে বিজেপি গোটা রাজ্যেই দলের দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে। ‘যাত্রা’ কোনও এলাকায় পৌঁছোনোর আগে থেকে সেখানে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়েছে, তোরণ তৈরি হয়েছে, রাস্তায় রাস্তায় পতাকা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বড় হোর্ডিং মাথা তুলেছে। তার পরে নির্দিষ্ট দিনে ‘পরিবর্তন যাত্রা’র কনভয় তথা মিছিল পৌঁছেছে, ছোট-বড় সভাও হয়েছে। বিক্ষিপ্ত ভাবে নয়, বিজেপি গোটা রাজ্যে সমান ভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

৪. ‘পরিবর্তন যাত্রা’ তৃণমূলকে ‘আক্রমণাত্মক’ থেকে কিছুটা ‘রক্ষণাত্মক’ ভূমিকায় ঠেলে দিয়েছে বলে বিজেপির মূল্যায়ন। নারীসুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অনুপ্রবেশ তথা জাতীয় সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপি যে লাগাতার আক্রমণ শানাচ্ছে, সে সব কথা গোটা রাজ্যে ঘুরে ঘুরে বার বার করে বলেছেন দলের নেতারা। ফলে এলাকায় এলাকায় তো বটেই, রাজ্য স্তরেও তৃণমূলকে এই আক্রমণের জবাব দেওয়ায় কিছুটা অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে। তৃণমূলকে বিজেপি তার ‘নিজের মাঠে’ কিছুটা হলেও টেনে আনতে পেরেছে বলেই বিজেপি নেতাদের দাবি।

৫. দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘি থেকে ‘যাত্রা’র সূচনা করার সময়ে অমিত শাহ কর্মসংস্থান সংক্রান্ত যে তিনটি বড় ঘোষণা করেছেন, তা এই কর্মসূচিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল। শাহ ঘোষণা করেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করবে। ছ’মাসের মধ্যে সমস্ত শূন্য সরকারি পদে স্থায়ী নিয়োগ করবে। সরকারি চাকরি পাওয়ার বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় পাঁচ বছরের ছাড় ঘোষণা করবে। ‘যাত্রা’র পরবর্তী আট-দশ দিনে এই ঘোষণাগুলির অনুরণন গোটা রাজ্যে ছড়িয়েছে। ফলে রাজ্যের চলতি রাজনৈতিক ভাষ্যে বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।

অপ্রাপ্তির হিসাব

১. রাজ্যের সর্বত্র ‘যাত্রা’কে ঘিরে সমান উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি করা যায়নি। বিজেপি যে সব এলাকায় জিতে রয়েছে বা আগে জিতেছিল, সে সব এলাকায় ‘যাত্রা’ ঘিরে সাড়া আশাপ্রদ ছিল। কিন্তু যে সব এলাকায় বিজেপি সাংগঠনিক ভাবে পিছিয়ে, সে সব এলাকার পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেনি এই কর্মসূচি।

২. কোচবিহার জেলায় অধিকাংশ বিধানসভা আসন বিজেপির দখলে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লোকসভা আসনটিও বিজেপির দখলে ছিল। কিন্তু ‘পরিবর্তন যাত্রা’ সে জেলায় খুব একটা ছাপ ফেলতে পারেনি। বাঁকুড়ায় যেমন হাতছাড়া হওয়া দাপট ফিরে আসার লক্ষণ দেখা গিয়েছে, কোচবিহারে তার ছাপ দেখা যায়নি।

৩. নদিয়া দক্ষিণ এবং বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা বিজেপির ‘দুর্গ’ হিসাবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও ‘পরিবর্তন যাত্রা’ ঘিরে তেমন জনসমাগম হয়নি। বিজেপি সূত্রও সে কথা মানছে। মাত্রাছাড়া গোষ্ঠীদ্বন্দ্বই তার কারণ বলে দলের একাংশ মনে করছেন। বনগাঁয় সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের গোষ্ঠীর সঙ্গে মনোমালিন্য রয়েছে বিধায়কদের অনুগামী অংশের। নদিয়া দক্ষিণে দল আবার তিন ভাগে বিভক্ত। সাংসদ জগন্নাথ সরকারের অনুগামী, জেলা সভানেত্রী অপর্ণা নন্দীর অনুগামী এবং প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা বর্ষীয়ান বিধায়ক পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের অনুগামী। সে সবের ছাপ পড়েছে কর্মসূচিতে।

৪. কলকাতা এবং লাগোয়া শহরতলি এলাকায় ‘যাত্রা’র আয়োজন হয়নি। ছোট ছোট ট্যাবলোর মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে প্রচার তেমন দাগ কাটেনি। এমনকি, ধর্মতলায় রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে যে সভা করে সে সব ট্যাবলো রওনা করা হয়েছিল, সে সভাতেও তেমন ভিড় চোখে পড়েনি।

৫. বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র মূল সুর মেরুকরণের পথ ধরেই এগিয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে টানার ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেনি।

বিজেপির উপলব্ধি

১. ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের সাংগঠনিক প্রতিভা প্রশংসনীয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে ভাবে সামনে দাঁড়িয়ে ‘যাত্রা’য় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মোটের উপর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করেছেন, তা নজর কেড়েছে।

২. দলীয় তহবিল কাদের হাতে পৌঁছোলে সদ্ব্যবহার হতে পারে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের সচেতনতা। ‘পরিবর্তন যাত্রা’ সফল করতে বিজেপি খরচে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু সব ক্ষেত্রে জেলা নেতৃত্বকে দেওয়া তহবিল নীচের তলা পর্যন্ত ‘আশানুরূপ পরিমাণে’ পৌঁছোয়নি বলে নেতৃত্ব বুঝেছেন। তার জেরে কোন স্তরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা-ও পর্যবেক্ষকরা জানতে পেরেছেন। ফলে ভোটের আগে প্রদেয় তহবিল বিকল্প পথে খরচের কথা ভাবা শুরু হয়েছে।

৩. গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কোন কোন এলাকায় ক্ষতি করতে পারে, কোন বিধানসভায় কারা ‘অন্তর্ঘাত’ করতে পারেন, তা বোঝা গিয়েছে।

Advertisement
আরও পড়ুন