Albania AI Minister

দুর্নীতি দমনে এআই মানবীকে মন্ত্রী করেছিল ইউরোপের দেশ! প্রস্তুতকারী সংস্থার দুই কর্তাই ঘুষ নিয়ে গৃহবন্দি

ডায়েলা বার বার বলেছে, সে মানুষ নয়। তাই তার কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা উচ্চাশা নেই। ডায়েলার স্বার্থ নেই, কিন্তু তাকে যারা তৈরি করেছে বা নিয়োগ করেছে? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৪

ছবি: সংগৃহীত।

দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) মানবীকে মন্ত্রী নিয়োগ করেছিল আলবেনিয়া। মন্ত্রীর নাম ডায়েলা। এ হেন কাজে গোটা দুনিয়ায় আলবেনিয়াই ছিল প্রথম। এ বার সেই সর্ষের মধ্যেই ভূত! ডায়েলাকে যারা তৈরি করেছে, সেই ন্যাশনাল ইনফরমেশন এজেন্সি (আকশি)-র দুই কর্তার বিরুদ্ধে উঠল দুর্নীতির অভিযোগ। সংস্থার ডিরেক্টর এবং ডেপুটি ডিরেক্টর এখন গৃহবন্দি।

Advertisement

আলবেনিয়া সরকারের ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়টি মূলত দেখেন আকশির দুই কর্তা, যাঁরা এখন গৃহবন্দি। অভিযোগ, ওই দু’জন অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন, ঘুষ নিতেন, চুক্তি নিয়ে কারচুপিও করতেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে সরকারের দুর্নীতিদমন সংক্রান্ত পদক্ষেপ এখন প্রশ্নের মুখে। সেই সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতির প্রমাণ লোপাট বা তাতে কারচুপির জন্যও কি ব্যবহার করা যাবে এআই প্রযুক্তি?

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারি ভাবে এখনও কোনও চার্জ গঠন করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এডি রামা জানিয়েছেন, তদন্ত যত ক্ষণ না শেষ হচ্ছে, তিনি এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করবেন না। প্রসঙ্গত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে চাইছে আলবেনিয়া। সেই সদস্যপদ পাওয়ার অন্যতম শর্ত হল, দুর্নীতিদমন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সদস্য হতে হলে আলবেনিয়াকে দেশের দুর্নীতি দমন করতে হবে। বিচার ব্যবস্থাকে মজবুত করতে হবে। তার পরেই নড়েচড়ে বসেছিল আলবেনিয়ার রামা সরকার। ২০২৫ সালে চতুর্থবার ক্ষমতায় এসে রামা ঘোষণা করেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হবে আলবেনিয়া। দুর্নীতি দমন করতে যে পদক্ষেপ তারা করেছিল, তাতেও ধরা পড়ল দুর্নীতি!

দুর্নীতির বিষয়টি কী ভাবে প্রকাশ্যে এল? ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এআই-মানবীকে মন্ত্রীকে নিয়োগ করে আলবেনিয়া। এর পরে গত নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রিপোর্ট দিয়ে জানিয়ে দেয়, এত কিছুর পরেও সে দেশে দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত রয়েই গিয়েছে। তদন্তে নামে স্পেশাল প্রসিকিউশন ইউনিট। তার পরেই আকশির দুই কর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।

আলবেনিয়ার সাবেক পোশাক পরে ডায়েলা। গত বছর থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বক্তৃতা করেছে সে। দেশে দেশে প্রচার করেছে, সরকারি কাজে এআই কতটা কার্যকর হতে পারে। আর এই কথা বলতে গিয়ে ডায়েলা বার বার বলেছে, সে মানুষ নয়। তাই তার কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা উচ্চাশা নেই। তার রয়েছে, শুধু কিছু ডেটা, জ্ঞান আর অ্যালগোরিদম। তাদের কাজে লাগিয়ে মানুষের ভাল করতে চায় সে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলিতে ডিয়েলা এ-ও জানিয়েছে, তার দেশের প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাতে সে ব্যথিত। ডায়েলার স্বার্থ নেই, কিন্তু তাকে যারা তৈরি করেছে বা নিয়োগ করেছে? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

ডায়েলার কাজ কী? আলবেনিয়ান শব্দ ‘ডায়েলা’-র অর্থ সূর্য। ডায়েলা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মন্ত্রী হিসাবে ‘নিয়োগ’ পেলেও সে আলবেনিয়া সরকারের হয়ে কাজ শুরু করে ওই বছরের জানুয়ারি থেকে। তখন তাকে সরকারি ওয়েবসাইটের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজে লাগানো হয়েছিল। বিভিন্ন সরকারি কাজে নাগরিক পরিষেবা প্রদানের সহায়তা করত ডায়েলা। অভিযোগ, সে সব করতে গিয়ে ঘুষ চাইতেন সরকারি কর্মীরা। ডায়েলা সেই পথ বন্ধ করে দেন। পরে ডায়েলাকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেন প্রধানমন্ত্রী। কথা ছিল, সরকারি বরাত পাওয়ার জন্য যে সব আবেদন জমা পড়বে, তা পরখ করবে ডায়েলা। মনে করা হয়, স্বচ্ছ ভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে এআই-মানবী।

প্রশ্ন উঠছে, দুর্নীতিতে অভিযুক্তেরা যে প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, তা কি দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে? আলবেনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিয়েই তৈরি হয়েছে সংশয়।

আলবেনিয়ার স্পেশাল প্রসিকিউশন ইউনিট সে দেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, টিরানার মেয়র, উপপ্রধানমন্ত্রী বেলিন্ডা বাল্লুকুর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করছে। বাল্লুকু দেশের প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। বিরোধীদের দাবি, তাঁর কূটনৈতিক কবচ প্রত্যাহার করা হোক। সেই নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে জানিয়েছেন, তদন্তকারীদের পাশে রয়েছেন। প্রতিবাদীরা পথে নেমেছেন। রামা সরকারের অপসারণের দাবি তুলেছেন।

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, ডায়েলা দুর্নীতিতে কতটা লাগাম পরাতে পেরেছে? কারণ, দুর্নীতি রোধ করতে পারবে, এমন ভাবে তার প্রযুক্তি তৈরি করা হয়। দুর্নীতি চিহ্নিত করার ক্ষমতা তার নেই। বিরোধীদের একাংশের দাবি, আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দেখানোই উদ্দেশ্য ছিল রামা সরকারের। তারা দেখাতে চেয়েছিল, দেশে দুর্নীতি দমন নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ করা হচ্ছে। দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করার কোনও ইচ্ছা তাদের নেই।

Advertisement
আরও পড়ুন