bangladesh election 2026 result

ইউনূস এখন কী করবেন? ভোট পরবর্তী বাংলাদেশে বিদায়ী মুখ্য উপদেষ্টার ‘তিন পরিকল্পনা’র পাশাপাশি জল্পনায় অন্য অঙ্কও

ঘটনাচক্রে, একদা হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরাগী ছিলেন ইউনূস। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানবিরোধী প্রচারে সক্রিয় ছিলেন তিনি। প্রাথমিক ভাবে হাসিনার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও পরবর্তী সময়ে একে অপরের সমালোচক হয়ে ওঠেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৭
As General Election over, what will Muhammad Yunus, Chief Adviser of Bangladesh Interim Government do

তারেক রহমানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পরে কি ক্ষমতার বৃত্ত থেকে দূরে সরে যাবেন মুহাম্মদ ইউনূস? ছবি: সংগৃহীত।

ঠিক এক মাস আগে তাঁর নির্বাচন-পরবর্তী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার। রাজধানী ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’য় সাংবাদিক বৈঠক করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব ছাড়ার পরে মূলত তিনটি কাজে মনোনিবেশ করবেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল দেখে বাংলাদেশের আমজনতার একাংশের মনে প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যেই, বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পরে সত্যিই কি ক্ষমতার বৃত্ত থেকে দূরে সরে যাবেন ইউনূস? না কি রাজনীতির বদলে যাওয়া সমীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সরকারের জমানায় গুরুত্ব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হবেন?

Advertisement

ঘটনাচক্রে, একদা হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরাগী ছিলেন ইউনূস। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ‘বাংলাদেশ সিটিজেনস কমিটি’ (বিসিসি) গড়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে শামিল হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এই মেধাবী ছাত্র। মুজিব-হত্যার কয়েক বছর পরে তাঁর কন্যা হাসিনা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। তাঁর সঙ্গেও একটা সময় পর্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল ইউনূসের। ১৯৯৭ সালে ওয়াশিংটনে আয়োজিত মাইক্রোক্রেডিট (ক্ষুদ্র ঋণ) কনভেনশনে আমেরিকার তৎকালীন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনের সঙ্গে হাসিনাকে যুগ্ম সভাপতিত্বের দায়িত্ব দিয়েছিলেন ইউনূসই। কিন্তু পরে হাসিনার সঙ্গে ইউনূসের সম্পর্কের অবনতি হয়। ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে ‘সুদখোর’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইউনূসকে বলা হয়েছিল ‘গরিবের রক্তচোষা’। হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বেই ইউনূসের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল দুর্নীতির মামলা।

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ভোট-পরবর্তী বাংলাদেশে ইউনূসের ‘বাণপ্রস্থে’ যাওয়ার ঘোষণা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে ওই মামলা নিয়েই। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে ফৌজদারি মামলা থেকে রেহাই পেতে রাষ্ট্রপতি পদের ‘রক্ষাকবচে’ নজর দিতে পারেন তিনি। ঘটনাচক্রে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ তথা হাসিনার ‘ঘনিষ্ঠ’ ছিলেন। ২০২৪ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পরেই ইস্তফার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে ইউনূসের ‘সম্ভাব্য গন্তব্য’ নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।

ইউনূসের তিন কাজ

গত ১১ জানুয়ারি ইউনূসের তরফে তাঁর উপ-প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব ছাড়ার পর মূলত তিনটি কাজে মনোযোগ দেবেন তিনি—

১. ‘ডিজিটাল হেলথকেয়ার ডেভেলপমেন্ট’। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীদের স্বাস্থ্য পরিষেবায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি, প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খোঁজখবর রাখতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হবে।

২. শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। যুবসমাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন ইউনূস।

৩. যে ‘থ্রি জিরো তত্ত্ব’ নিয়ে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন, তাতে নতুন গতিসঞ্চারের চেষ্টা। এই তত্ত্বের মূল অভিমুখ হল বাংলাদেশকে ‘শূন্য দারিদ্র’, ‘শূন্য বেকারত্ব’ এবং ‘শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ’ রাষ্ট্রে পরিণত করা। প্রসঙ্গত, ‘শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ’ বলতে বোঝায় বায়ুমণ্ডলে মানুষের কার্যকলাপের ফলে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের (কার্ডন ডাই অক্সাইড প্রভৃতি) পরিমাণ এবং প্রাকৃতিক বা প্রযুক্তিগত উপায়ে (যেমন গাছ লাগানো, কার্বন ক্যাপচার) বায়ুমণ্ডল থেকে সরিয়ে নেওয়া গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ একই রাখা।

কোন কোন পথ খোলা

২০২৪ সালের ৫ অগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের তিন দিন পরে বাংলাদেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের মুখ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইউনূস। তখন থেকেই জল্পনা ছিল, সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চাইবেন না তিনি। বস্তুত, দ্রুত ভোটের আয়োজনের দাবি তুলে বার বার তাঁর ‘সদিচ্ছা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। গত বছরের ৫ অগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের বর্ষপূর্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারির মধ্যে সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোটের আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তখন তাঁর বিরোধীদের একাংশ বলেছিল, ইউনূসের পরিকল্পনা হল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী (‘জামাত’ নামে যা পরিচিত), এনসিপি এবং ইসলামপন্থী অন্য দলগুলিকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা। আর নিজের রাষ্ট্রপতি হওয়া। তার আগে জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকা ছাত্রনেতাদের একাংশ যখন নতুন দল এনসিপি গড়েছিলেন, তার নেপথ্যেও ইউনূসের ‘হাত’ দেখেছিলেন অনেকে।

স্বয়ং ইউনূস কী বলেছিলেন? গত কয়েক মাসে একাধিক বার তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচনের আয়োজন করব আমরা। যা গোটা বিশ্বের জন্য রোল মডেল হবে।’’ যদিও বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে দূরে সরিয়ে রেখে এ বারের নির্বাচন কতটা ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ হয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে কোনও পর্যবেক্ষকদলও এ বার পাঠানো হয়নি বাংলাদেশে। ইউনূসের স্বপ্নের জুলাই সনদে চারটি অধ্যায় জুড়ে বিবৃত ৮৪ দফার প্রস্তাবের (‘আর্টিকেল ৮৪ রেফারেন্স’ নামে যা পরিচিত) বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তোলা বিএনপি এ বারের ভোটে জয়ী হয়েছে। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে ‘পুনর্বাসন’ দিতে রাজি হবেন কি না, তা নিয়ে তাই সংশয়ও রয়েছে। তবে অনেকে বলছেন, ভোট ঘোষণার অনেক আগেই গত জুন মাসে ব্রিটেন সফরে গিয়ে লন্ডনে তারেকের সঙ্গে বৈঠক করে ইউনূস তার পরবর্তী ‘গন্তব্য’ পাকা করে রেখেছেন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতীয় সংসদ ছাড়া সম্ভব নয়। সাংসদেরা ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি ইউনূসকে বেছে নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। সম্ভাব্য সেই পরিস্থিতিতে হাসিনা জমানায় শ্রম আইন লঙ্ঘন, পদ্মা সেতুতে অন্তর্ঘাত থেকে আর্থিক নয়ছয়ের অভিযোগ সংক্রান্ত শতাধিক মামলায় অভিযুক্ত ইউনূস আবার বিদেশে পাড়ি দিতে পারেন বলেও অনেকে মনে করছেন। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র বিএনপির জয় বা জামাত-এনসিপির পরাজয় নয়, এ বারের ভোটের ফলাফল বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে। তেমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইউনূস দেশে থাকা নিরাপদ মনে করবেন না। ইতিহাস বলছে, সেনার একাংশের বিদ্রোহে বঙ্গবন্ধু মুজিব নিহত হওয়ার পরে কয়েক বছর আওয়ামী লীগের কার্যকলাপ কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। তারেকের পিতা তথা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান আবার তাদের মূলস্রোতের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে মুজিবহত্যার পরে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হাসিনা আশির দশকের গোড়ায় জিয়ার জমানাতেই বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। ‘ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত’ হাসিনাকে না ফেরালেও আওয়ামী লীগের ‘ভবিষ্যতের নেতা’ হিসাবে চিহ্নিত সজীব ওয়াজেদ জয়কে রাজনীতি করার সুযোগ তারেক দিতে পারেন বলে জল্পনা রয়েছে।

ফিরে দেখা

ইউনূসের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৮ জুন। চট্টগ্রামের বাথুয়া গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরে চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিয়েছিলন ইউনূস। পরে আমেরিকার ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে মিডল টেনেসি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে ইউনূস ফিরে আসেন বাংলাদেশে। তার মাত্র তিন বছর আগে স্বাধীনতা পাওয়া মাতৃভূমির উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন।

এর পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে গ্রামীণ অর্থনীতির পরিস্থিতি অনুধাবন এবং তার উন্নয়নের প্রয়াসে ইউনূসের জড়িয়ে পড়া। সেই পদক্ষেপ থেকেই শুরু হয় ‘মাইক্রোক্রেডিট’ (অতি ক্ষুদ্র ঋণ) আন্দোলন। যার পরিণতিতে ১৯৮৩ সালে জন্ম নেয় বাংলাদেশ গ্রামীণ ব্যাঙ্ক। ২০০৬ সালে ‘গরিবের ব্যাঙ্কার’ ইউনূসের ঝুলিতে এসেছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার। অনেকে বলেন, হাসিনার সঙ্গে তাঁর সংঘাতের সূচনাও তখন থেকেই। ২০১২ সালে উগান্ডায় সমকামীদের বিচারের সমালোচনা করে অন্য তিন নোবেলজয়ীর সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন ইউনূস। সমকামিতাকে সমর্থন করায় কট্টর ইসলামপন্থীদের নিশানা হয়েছিলেন তিনি। তাঁকে ‘ধর্মত্যাগী’ ঘোষণা করেছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশন। অধুনা তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত জামাত নেতৃত্বও সে সময় ইউনূসের সমালোচনায় সরব ছিলেন।

হাসিনা জমানায় এক বার ইউনূস বলেছিলেন, ‘‘আমি জেলের সাজা এড়াতে চাই বলেই দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারি না। যে মুহূর্তে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছি, মনে হয়েছে শিকড় ছিঁড়ে যাবে।’’ ইতিহাস বলছে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অতীতে দেশ ছেড়ে না গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন তিনি। এ বার কি তার পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে? তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।

Advertisement
আরও পড়ুন