Bangladesh Election 2026 Result

নৌকাবিহীন ভোটে বাংলাদেশের আস্থা চেনা ধানের শিষের উপর, ক্রমশ পিছোতে পিছোতে কুড়ি বছর পর ‘সবার আগে’ বিএনপি

শেষ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা এবং হাসিনাকে কেন্দ্র করেই। এই অক্ষ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে বার করে আনার ডাক দিয়েছিলেন জামাত, এনসিপি-র নেতারা। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখনও অচেনা বা অল্প চেনাদের হাতে শাসনভার দিতে স্বচ্ছন্দ নন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৫
বিএনপি-র জয়ের পর দলের পতাকা হাতে নিয়ে এক খুদে।

বিএনপি-র জয়ের পর দলের পতাকা হাতে নিয়ে এক খুদে। ছবি: সংগৃহীত।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’! এই স্লোগান নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ভোটের ফল বলছে, বাংলাদেশের জনগণ ‘সবার আগে’ রাখল সেই বিএনপি-কেই। আনুষ্ঠানিক ভাবে ফলাফল ঘোষণা করা না-হলেও গণনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০ বছর পর ফের ঢাকার মসনদে ফিরছে প্রয়াত খালেদা জিয়ার দল।

Advertisement

নৌকাবিহীন (আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক) নির্বাচনে ধানের শিষ (বিএনপি-র নির্বাচনী প্রতীক) মাথা তুলবে, এমন পূর্বাভাস ছিলই। তবে এ বারের বাংলাদেশের নির্বাচনে এমন কিছু চরিত্র ছিলেন, সেই অর্থে যাঁরা অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত। ২০২৪ সালের জুলাই-অগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-যুবদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনী লড়াইয়ে ছিল। তারা জোট বেঁধেছিল জামায়াতে ইসলামী (যা ‘জামাত’ নামেই পরিচিত)-র সঙ্গে। ভোটের ফল বলছে, এনসিপি-র প্রাপ্ত আসন দুই অঙ্কের সংখ্যাও ছুঁতে পারেনি। হেরেছেন দলের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েক জন নেতা।

শেষ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা এবং হাসিনাকে কেন্দ্র করেই। সেই ‘অক্ষ’ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে বার করে আনার ডাক দিয়েছিলেন জামাত এবং এনসিপি-র নেতারা। কিন্তু দেখা গেল, বাংলাদেশের জনগণ এখনও অচেনা বা অল্প চেনাদের হাতে দেশের শাসনভার তুলে দিতে স্বচ্ছন্দ নন। হাসিনার আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসাবে তাঁরা এখনও বিএনপি-কেই চান।

‘প্রত্যাবর্তন’! ভোটের ফলাফলকে এই একটি শব্দেই ব্যাখ্যা করছেন বিএনপি-র কর্মী-সমর্থকেরা। তাঁদের প্রাপ্ত আসনসংখ্যার দিকে নজর রাখলে প্রত্যাবর্তনের আগে ‘দাপুটে’ শব্দটি জু়ড়ে দিলেও অত্যুক্তি হবে না। শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বে (২০০৮ থেকে ২০২৪) আওয়ামী লীগের প্রভাব যত বেড়েছিল, ততই শক্তিহীন হয়েছিল বিএনপি। বাংলাদেশের গত তিনটি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে দু’টিতে (২০১৪ এবং ২০২৪) লড়েইনি তারা। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে লড়ে বিএনপি জিতেছিল মাত্র সাতটি আসনে! বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল খালেদা জিয়ার দলকে কার্যত খরচের খাতাতেই ফেলে দিয়েছিল।

তা ছাড়াও, হাসিনার আমলে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হন বিএনপি-র শীর্ষস্থানীয় বহু নেতা-কর্মী। অভিযোগ, এই মামলাগুলির অধিকাংশই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দায়ের করা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে নড়বড়ে বিএনপি-র হাল ধরবেন কে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। খালেদার অসুস্থতা, খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের লন্ডনবাস সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছিল। এই সময়কালে জিয়া পরিবারেও ভাঙন ধরে। ২০১৮ সালে দু’টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয় খালেদার। বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে ২০০৮ সালে দেশ ছাড়েন তারেক। ২০১৫ সালে অকালে মারা যান খালেদার কনিষ্ঠপুত্র আরাফত রহমান কোকো।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অনুঘটক করে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের জেরে ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট পতন হয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। তার পরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি-র প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল। তারেকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল খালেদাকে।

১৭ বছর পরে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেরেন তারেক। তার পাঁচ দিনের মাথায় মৃত্যু হয় খালেদার। তাঁর শেষযাত্রায় সাধারণ মানুষের ঢল দেখেই বাংলাদেশের অনেকে আগামীর দেওয়াল লিখন পড়ে ফেলেছিলেন। শুক্রবার কার্যত তাতে সরকারি সিলমোহর পড়ল।

২০২৪-এর অগস্টের পর বহু ক্ষেত্রেই ‘অচেনা’ বাংলাদেশে ‘চেনা’ দল বিএনপি ফেরায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিএনপি-র জয়ে স্বস্তি ফিরবে নয়াদিল্লিতেও। কারণ, শাসক বিএনপি-র সঙ্গে অতীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাদের দুর্বলতা বা বাধ্যবাধকতার জায়গাগুলি সম্পর্কে ভারত সরকারের অবহিত থাকা। অনেকেই অবশ্য মনে করছেন, তারেকের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে। খাতায়কলমে মধ্য-দক্ষিণপন্থী দল হলেও তারেকের কথায় ইদানীং অনেকেই বামপন্থার সুর খুঁজে পাচ্ছেন। তারেক সব ধর্ম, সব মতকে নিয়ে চলার কথা বলছেন। পুরনো জোটসঙ্গী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি হিসাবে পরিচিত জামাতের সঙ্গে জোট দূরস্থান, কোনও নির্বাচনী বোঝাপড়াতেও যেতে রাজি হননি তিনি। এমনকি, বিএনপি-র জয়কে ‘রাহুমুক্তির ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে ব্যাখ্যা করেও খানিক দার্শনিকের ভঙ্গিতে তারেক বলেছেন, “বিজয়ীর কাছে পরাজিতেরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়।” বিজয়ীর এই ‘সংযমও’ বাংলাদেশে নতুন বলে মনে করছেন অনেকে।

বিএনপি-র তরফে যতই নিরপেক্ষ বিদেশনীতির কথা বলা হোক, অনেকেই মনে করছেন নানাবিধ কারণে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে হবে তারেকের বিএনপি সরকারকে। শুক্রবারই তারেককে অভিনন্দন জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নয়াদিল্লি এবং ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম একটি সুতো হল মুক্তিযুদ্ধ। গঙ্গা এবং পদ্মাপারের বহু মানুষই মনে করেন, জামাত ক্ষমতায় এলে সেই সুতোটা ছিঁড়ে যেত। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতোই মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য বহনকারী বিএনপি-র পক্ষে এই সুতো ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব নয়। এই সুতোই গত দেড় বছরের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেবে বলে আশাবাদী অনেকে।

বাংলাদেশের এক বেগম লোকান্তরে। আর এক বেগম দেশান্তরে। তবু বদলের বাংলাদেশে শাসনভার রইল প্রয়াত এক বেগমের উত্তরাধিকারীর হাতেই।

Advertisement
আরও পড়ুন