নির্বাচনী পোস্টারে মোড়া ঢাকার রাস্তা। বুধবার। ছবি: রয়টার্স।
চার বছর আগে বিশ্বের সামনে পদ্মা সেতুর সাড়ম্বর উদ্বোধনের মহড়ায় এসে দেখেছিলাম বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির সঙ্গে জাতীয় আবেগকে মিশিয়ে দিচ্ছেন। মাওয়া ঘাট, শিমুলিয়া ঘাট সে দিন ছিল উৎসবের কেন্দ্রে।
সেই রাজনৈতিক আবেগ এবং পদ্মার জলে চড়া পড়তে দেখলাম আজ, গোটা দেশ যখন সুদিন আসার আশায় নিশিযাপন করছে। নিয়তির মতো কথা বললেন সঙ্গী গাড়ির চালক ইমতিয়াজ শেখ। “মাত্র কয়েক বছরে কী ভাবে ইতিহাস বদলে যায়! আমরা এই ঘাট থেকে ফেরি পার হয়ে এসে দৌড়ে বাস ধরতাম যাত্রাবাড়ি যাওয়ার। এখন তো সেই ঘাটই খুঁজে পাচ্ছি না! অথচ এখানে আমি এলাম আজ মাত্র দেড় বছর পর।”
দাঁড়িয়ে রয়েছি, লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ফেরিঘাটে। এই ঘাট এবং সংলগ্ন বাস ডিপো দোকান হাট এক হারিয়ে যাওয়া নগরের মতো। সামনে ধু ধু চড়া, দূরে কুয়াশায় ঝুলে রয়েছে পদ্মা সেতু। সামনে চড়া, জং ধরা কিছু অতীতের কিছু লোহার কাঠামো। আওয়ামী লীগের জন্য এখানে হা হুতাশ রয়েছে খুবই সন্তর্পণে। কিন্তু পদ্মার পাড় এখন বিএনপি-র সঙ্গেই।
“প্রদীপের তলায় সবচেয়ে অন্ধকার,” বলছেন গুলিস্তান যাত্রাবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের লাগোয়া সেলুন মালিক মোজ্জামেল শেখ। “আগে মানুষ এখানকার ঘাটগুলি থেকে ফেরি পার হয়ে ২৪টি জেলায় যেত। খুলনা, বরিশাল, যশোর, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা এবং বেনাপোল হয়ে কলকাতা চলে যাওয়ার আগে এখানে মানুষ এক-আধদিন থেকে যেত। তাতে এই বিস্তীর্ণ এলাকার সুসার হত, আমদানি বাড়ত। এখন সবাই সেতু ধরে সোজা চলে যান, থামার প্রশ্নই নেই। ফলে পদ্মা সেতু দক্ষিণের জন্য আশীর্বাদ, আমাদের জন্য নয়।”
উন্নয়ন হলে কিছু মানুষকে তার মাসুল গুনতেই হয়, তা সে মওলা ঘাটই হোক বা শিমুলিয়া ঘাট বা বিশ্বের কোথাও। কিন্তু সেতুর ফলে নাব্যতা কমেছে, চড়া বেড়েছে এবং ড্রেজ়িংয়ের কোনও উদ্যোগের কথা গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তিকালীন সরকার ভাবেনি বলেই সমস্বর অভিযোগ পাড়ের মানুষদের। রং চা (কালো চায়ের বাংলাদেশি নাম) চক্রে মঈদুল মিঞার কথায়, ‘‘আগে আমাদের ১২০টা মাছ ধরার ট্রলার ছিল, এখন অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। আগে সরকার (আওয়ামী লীগ) ড্রেজ়িং করে দিত। এখন যা পরিস্থিতি, যারা একটু বড়লোক ব্যবসায়ী তারা চরের দখল নিয়ে রেখেছে। আমরা কিছু করতে চাইলে তেড়ে আসে। বিএনপি-র আব্দুস সালাম আজাদ যখন আমাদের এলাকায় (আসন মুন্সিগঞ্জ-২) ভোট চাইতে এসেছিলেন, আমরা এই দাবিই করেছি। আশা করি জিতে এলেকথা রাখবেন।’’
বোঝা গেল এখানে জামায়েতে ইসলামীর কোনও শিকড় নেই। এনসিপি-র শাপলা চিহ্নে দাঁড়িয়েছেন যিনি তাঁকে এলাকার মানুষ চেনেনও না। হিন্দু-মুসলমান কোনও অশান্তির খবরও মওলা ঘাটের একান্নবর্তী সংসারে নেই। ঘাট থেকে উঠে বড় রাস্তায় সার দেওয়া ইলিশ কেন্দ্রিক রেস্তরাঁ, যেখানে পর্যটক কমে এসেছে বলে জানাচ্ছেন দোকানিরা। “ঢাকায় গত দেড় বছরে এত অশান্তি হয়েছে, মানুষ নদীর পারে এসে টাটকা ইলিশ খাওয়ার উৎসাহই হারিয়ে ফেলেছেন। তা ছাড়া, কাজকর্মের অনিশ্চয়তায় লোকে খরচও করতে চাইছেন না। ভারত থেকে অনেক পর্যটক আসতেন, সেই হারও কমেছে। আমরা কাল সকালে ভোট দিতে যাব আগের সুদিন ফেরার আশা নিয়ে’’, জানাচ্ছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘শখের হাঁড়ি’ রেস্তরাঁর এক ম্যানেজার।
মাছের আড়ত এবং জোগানের মূল কারবারিরা হিন্দু, কয়েক প্রজন্ম ধরেই। মাছের আড়তের পাশেই দাসপাড়া, খুবই ঘিঞ্জি এক না-গ্রাম না-মফস্সল জনপদ। যার কেন্দ্রে রয়েছে রাধাকৃষ্ণ মন্দির। পুজো কমিটির ভজন দাস পালা গেয়ে বেড়ান এ দিক সে দিক। ভাবের ঘোরে থাকেন। তবে তাঁর পরিবারের অন্যরা জমজমাট ব্যবসা চালান। প্রায় হাজার পাঁচেক হিন্দু ঐক্যকে যেমন আগে প্রয়োজন ছিল আওয়ামী লীগের, এখন তেমনই বিএনপি-র। আর টিকে থাকার লড়াইয়ে এঁরাও নিজেদের আনুগত্য বদলে বদলে চলেন, নয়তো উপায় কী? মাছ বিক্রেতা নিরঞ্জন দাস যেমন বললেন, ‘‘যখন যে ক্ষমতায় থাকবে তাদের সঙ্গে আমাদের মানিয়ে চলতে হবে তো নাকি!’’
ধলেশ্বরী নদী আর বুড়িগঙ্গার উপর দিয়ে শেখ হাসিনার আমলে তৈরি পস্তখোলা ব্রিজ ধরে মওয়া রোডে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকা ফিরতে সময় লাগে ঘণ্টা দেড়-দুই। ফেরার তোড়জোড় করছি, দাঁড়িয়ে গেলাম চায়ের দোকানে পাতানো এক বন্ধুর কথায়। “আগের সরকার থাকার সময় এখানে ব্যবসা চাঙ্গা ছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিনিধি বাছার সুযোগ ছিল না। কাল অনেক বছর পর নিজেদের পছন্দের লোককে ভোট দিতে পারব।”