(বাঁ দিক থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। —ফাইল চিত্র।
আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বুধবার সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। সমঝোতাপত্রের শিরানামেই মধ্যস্থতাকারী হিসাবে পাকিস্তানের নামোল্লেখ করা হয়েছে। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ জানিয়েছেন, দুই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরেই সমঝোতার শর্তগুলি কার্যকর হওয়া শুরু হবে। সংবাদসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মার্কিন আধিকারিকেরা কনফারেন্স কলে সমঝোতাপত্রে থাকা শর্তগুলি প্রকাশ্যে এনেছেন। ইরানের তরফে অবশ্য সমঝোতাপত্রের শর্তের বিষয়ে এখনও কিছু জানানো হয়নি। আমেরিকা যে ১৪টি শর্তের কথা প্রকাশ্যে এনেছে, সেগুলি হল—
১) লেবানন-সহ পশ্চিম এশিয়ার সব প্রান্তে দ্রুত পাকাপাকি ভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে আমেরিকা, ইরান এবং তাদের সহযোগী রাষ্ট্রগুলি।
২) আমেরিকা আর ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানাবে এবং কোনও পক্ষই অপর পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না।
৩) চূড়ান্ত চুক্তিস্বাক্ষরের আগে আমেরিকা এবং ইরান ৬০ দিন ধরে আলোচনা করবে। অমীমাংসিত বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হবে এই পর্বে। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই ৬০ দিনের সময়সীমা বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে।
৪) সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের পরেই হরমুজ় প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। হরমুজ় লাগোয়া ইরানের বন্দরগুলিতে আর কোনও ‘বাধা’ সৃষ্টি করবে না তারা। ৩০ দিনের মধ্যে অবরোধ তুলে নেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। শর্তাবলীর চতুর্থ দফায় এ-ও বলা হয়েছে যে, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে আমেরিকা।
৫) সমঝোতাপত্রে থাকা শর্ত মেনে ইরান হরমুজ়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হবে। জাহাজগুলির কাছ থেকে কোনও রকম শুল্ক আদায় করবে না তারা। একই সঙ্গে পঞ্চম দফার শর্তে বলা হয়েছে যে, আগামী দিনে কী ভাবে হরমুজ় প্রণালী ধরে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হবে, তা ঠিক করতে ওমান এবং পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশগুলির সঙ্গে ‘বৃহত্তর’ বোঝাপড়া করবে ইরান। প্রসঙ্গত, হরমুজ় প্রণালীর এক প্রান্তে রয়েছে ইরান। অপর প্রান্তে রয়েছে ওমান। মার্কিন প্রশাসনের একাংশের আশঙ্কা, হরমুজ়ে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশের আপত্তি থাকতে পারে। তা এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা বণ্টন করে দিতে চাইছে ওয়াশিংটন।
৬) যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৬ লক্ষ কোটি টাকা) একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে আমেরিকা এবং সহযোগী দেশগুলি। কী ভাবে এই প্রকল্প কার্যকর করা হবে, তা আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় চূড়ান্ত হবে। তবে আমেরিকার একটি সূত্রের দাবি, এই প্রকল্পে ইরানের জন্য নিজেদের তহবিল থেকে এক টাকাও খরচ করবেন না ট্রাম্প। এক মার্কিন আধিকারিক বিবিসি-কে জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি কর্তৃপক্ষকে বলেকয়ে ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করিয়ে দিতে পারে আমেরিকা।
৭) ইরানের তেল এবং জ্বালানি দ্রব্যের উপর যাবতীয় বিধিনিষেধ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে আমেরিকা। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের আওতায় ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত বিধিনিষেধগুলিও পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। যদিও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
৮) পরমাণু অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি অনুসারে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না-করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। ইরানের কাছে ইতিমধ্যেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, তা কী ভাবে ব্যবহৃত হবে, সেই বিষয়ে বোঝাপড়া করবে তেহরান এবং ওয়াশিংটন। একটি সূত্রের দাবি, ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মান কমাতে বলা হবে, যাতে কোনও ভাবেই তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না-পারে।
৯ এবং ১০) ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আপাতত স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হবে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার আগে আমেরিকা ইরানের উপর নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। ইরানকে তাদের তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম সামগ্রী বিক্রি করার বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে।
১১) ধাপে ধাপে বাজেয়াপ্ত সম্পদের একাংশ ইরানকে ফিরিয়ে দেবে আমেরিকা। এক মার্কিন আধিকারিক জানিয়েছেন, দুই দেশের সমঝোতার পর যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হবে, তার ভিত্তিতে বাকি সম্পদ ফেরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
১২, ১৩ এবং ১৪) সমঝোতাপত্রে তা শর্তগুলি মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে আমেরিকা এবং ইরানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গঠিত একটি দল। যদিও সেই দল কী ভাবে কাজ করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।