Review of Book

একের পর এক ‘দেশভাগ’

স্মৃতির অতলে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এই পার্টিশন বা বিভাজন-অধ্যায়টিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় স্যাম ডালরিম্পলের বইটি— তাঁর লেখা প্রথম বই।

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরী
শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৯
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল রেঙ্গুনের বাসিন্দারা সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলেন— আজ থেকে তাঁরা আর ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক নন। সরকারি দফতরের কর্মচারীদের নতুন মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে বলা হল; লেখাপড়ার জন্য কলকাতা বা ঢাকায় যেতে হলে ছাত্রছাত্রীদের হঠাৎ লাগতে শুরু করল নতুন নথিপত্র; বণিকরা বুঝতে পারলেন যে, এ বার থেকে ভারতে পণ্য পাঠাতে হলে শুল্ক দিতে হবে। লন্ডনের কোনও এক দফতরে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাতারাতি প্রতিবেশী, বন্ধু ও ব্যবসায়িক সঙ্গীদের আলাদা উপনিবেশের নাগরিক করে তুলল। প্রায় নিঃশব্দেই সুসম্পন্ন হল উপমহাদেশের প্রথম বিভাজন, যার অভিঘাত, আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়, ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর।

স্মৃতির অতলে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এই পার্টিশন বা বিভাজন-অধ্যায়টিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় স্যাম ডালরিম্পলের বইটি— তাঁর লেখা প্রথম বই। গোড়াতেই ডালরিম্পল স্পষ্ট করে দেন বইটি রচনার মূল উদ্দেশ্য। সেটি হল পাঠককে মনে করিয়ে দেওয়া, এই উপমহাদেশের বিভাজনের ইতিহাস কোনও একটি ঘটনা নয়। সেই ইতিহাস বহু পর্বে বিভক্ত। ১৯৪৭-এর অগস্টের দেশভাগ এবং তজ্জনিত বিপর্যয় নিশ্চিত ভাবেই সেই ইতিহাসের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কিন্তু সেই মর্মান্তিক ঘটনার আগে এবং পরে একাধিক বিভাজনের সাক্ষী থেকেছে এই উপমহাদেশ। ডালরিম্পলের মতে, দেশভাগ অর্ধশতাব্দী ধরে চলতে থাকা রাষ্ট্রের ভাঙন, সীমান্ত-বদল আর জাতিপরিচয়-সংক্রান্ত সংগ্রামের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

মূলত পাঁচটি বিভাজনের প্রতি লেখক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন— ব্রিটিশ ভারত থেকে বর্মার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া (১৯৩৭), ভারতের থেকে এডেন ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলগুলির পৃথকীকরণ (১৯৩৭-৪৭), পূর্ব ও পশ্চিম কিছু প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তান গঠন (১৯৪৭), ‘প্রিন্সলি স্টেটস’ বা করদ রাজ্যগুলিকে স্বাধীন ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া (১৯৪৭) এবং অবশেষে বহু সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশে রূপান্তর (১৯৭১)। এই বিভাজনগুলির ফলে ব্রিটিশ ভারত— যার ভৌগোলিক বিস্তার ছিল এশিয়ার একটা বিরাট অংশ জুড়ে— মাত্র অর্ধশতাব্দীরও কম সময়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পরিণত হয় বারোটি নতুন রাষ্ট্রে। ডালরিম্পলের মতে, এই পাঁচটি বিভাজনের ঘটনা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া নতুন রাষ্ট্রই গড়ে তুলেছে আজকের এশিয়ার ভূ-রাজনীতি।

শ্যাটার্ড ল্যান্ডস: ফাইভ পার্টিশনস অ্যান্ড দ্য মেকিং অব মডার্ন এশিয়া

স্যাম ডালরিম্পল

৭৯৯.০০

ফোর্থ এস্টেট

ডালরিম্পল মূলত তথ্যচিত্র-নির্মাতা ও ‘প্রোজেক্ট দাস্তান’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ‘প্রোজেক্ট দাস্তান’ এমন এক উদ্যোগ যা ১৯৪৭-এর ভারত বিভাজনের মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করে। এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই আর্কাইভাল তথ্যপ্রমাণ ছাড়াও, এই বই লেখার সময় তিনি সুযোগ পেয়েছেন বহু বাস্তুহারা ও ছিন্নমূল মানুষের স্মৃতিকথা ও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার ব্যবহার করার। এই সব সূত্র ব্যবহার করেই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, ১৯৩৭ থেকে ১৯৭১, চার দশক ধরে ঘটে চলা বিভাজনের ইতিহাস কেবল মানচিত্র পরিবর্তন, নতুন চুক্তি বা উচ্চপর্যায়ের রাজনীতির কাহিনি নয়। বরং এটি সেই সাধারণ মানুষদের কাহিনি, যাঁদের জীবনে রাতারাতি টানা হয়েছিল নতুন সীমারেখা। না-চেয়েও যাঁদের ত্যাগ করতে হয়েছিল সাত পুরুষের ভিটে, কিংবা যাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন নবনির্মিত রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে উঠতে।

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ সেই অধ্যায়গুলি, যেখানে বিভাজন সংক্রান্ত বিস্মৃত ঘটনাবলিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয়েছে। ব্রিটিশ ভারত থেকে বর্মার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধ্যায়টি যেমন। গত শতকের তিরিশের দশকে বর্মায় দশ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর মতো অনেকে তখনও বর্মাকে ভারতের অংশ মনে না করলেও (তিনি বলেছিলেন, “এ নিয়ে আমার মনে কোনও সংশয় নেই যে বর্মা স্বশাসিত ভারতের অংশ হতে পারে না”), এ কথা অনস্বীকার্য, ১৯৩৭-এর আগে বর্মা প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক এবং সামরিক ভাবে ভারতের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত ছিল। ডালরিম্পল দেখিয়েছেন, ১৯৩৭-এ ভারত-বর্মা বিভাজনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিণতি হয় ভয়াবহ। এই বিভাজন দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে, অভিবাসন-সঙ্কট ডেকে আনে এবং পরবর্তী কালের একাধিক সংঘাতের বীজ বপন করে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড, সীমান্ত অঞ্চল বা বালুচিস্তানের মতো এলাকা নিয়ে ডালরিম্পলের আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সীমারেখা এই অঞ্চলগুলিতে জন্ম দেয় দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত ও জাতিপরিচয়-সঙ্কটের। এই প্রসঙ্গে লেখক বলেন নাগা পাহাড়ের এক বাইবেল-বিক্রেতার সংক্ষিপ্ত কাহিনি, যিনি স্বেচ্ছায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করতে যেতে চেয়েছিলেন। নাগারা জাতিগত ভাবে তিব্বত-বর্মা গোষ্ঠীর মানুষ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের এবং উত্তর-পশ্চিম মায়ানমারের সীমান্ত অঞ্চলের অধিবাসী, যাঁদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়ের বোধ অত্যন্ত প্রবল। সেই বাইবেল-বিক্রেতাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় তিনি ভারতীয় না বার্মিজ়, তিনি উত্তর দেন, “আমি প্রথমত নাগা, দ্বিতীয়ত নাগা এবং শেষ পর্যন্ত নাগা।” ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা এমন কোনও পরিচয়ের জন্ম দিতে পারেনি, যা ঔপনিবেশিক সীমারেখা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

এই বইটির ব্যাপ্তি বিশাল। কিন্তু এই ব্যাপ্তিই কখনও কখনও তার দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির পাঁচটি ঘটনার মধ্যে সাযুজ্য খোঁজার এই প্রচেষ্টা বৌদ্ধিক ভাবে যুক্তিযুক্ত মনে হলেও সব সময় বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। ১৯৩৭ সালে ভারত থেকে বর্মার আলাদা হয়ে যাওয়া ছিল মূলত ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস; আর ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের বিভাজন ছিল ব্যাপক ধর্মীয় হিংসা ও রক্তপাতের ফল। এই ঘটনাগুলিকে ধারাবাহিক ভাবে দেখার ফলে প্রতিটি ঘটনার স্বতন্ত্র কারণ ও গতিপ্রকৃতি সব সময় যথাযথ ভাবে প্রস্ফুটিত হয় না যেন। আরও একটি দুর্বলতা— ব্যক্তিগত কাহিনি ও স্মৃতিকথার উপরে অতি-নির্ভরতা। এর ফলে কখনও কখনও বইটির বিশ্লেষণাত্মক গভীরতা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। প্রায় দু’শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের পরেও একটি রাষ্ট্র কেন এত ভঙ্গুর থেকে গিয়েছিল— কেন অর্থনৈতিক অসন্তোষ, ভাষাগত পরিচয় এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন একত্রে ভারতকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে পেরেছিল, এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাঠক স্পষ্ট ভাবে পান না। হায়দরাবাদ, জুনাগড়, কাশ্মীরের মতো করদ রাজ্য সংক্রান্ত আলোচনাও বেশ তাড়াহুড়ো করে সেরে ফেলা হয়েছে বলে মনে হয়। বইটিতে অন্য লেখকদের প্রকাশিত লেখা থেকেও বহু অংশ ব্যবহার করেছেন ডালরিম্পল নিজের বক্তব্য জোরালো করতে। নিশ্চয়ই এটা দোষের নয়, কিন্তু কখনও কখনও সেটা এতটাই বিস্তারিত যে তা পড়তে একটু ক্লান্তিকর লাগে, সেই রচনাগুলি বহুপঠিত বলেই (যেমন, অমর্ত্য সেনের আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স থেকে ব্যবহৃত অংশবিশেষ)।

ডালরিম্পলের গদ্য প্রাণবন্ত ও সাবলীল, যা পড়তে পড়তে তাঁর পিতা— ইতিহাসবিদ ও প্রাবন্ধিক উইলিয়াম ডালরিম্পলের লেখার কথা মনে পড়তে বাধ্য। আর্কাইভ থেকে উদ্ধার করা তথ্যকে জীবন্ত রূপ দিতে তাঁর অসুবিধা হয় না একটুও। এর ফলে বইটি সাধারণ পাঠকের জন্য সহজপাঠ্য হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কখনও কখনও এই শৈলী যেন অতিনাটকীয় হয়ে ওঠে। ইতিহাসের সতর্ক বিশ্লেষণ সেখানে জায়গা ছেড়ে দেয় গল্পকারের নাটকীয়তা ও দুর্দান্ত ক্লাইম্যাক্স পেশ করার অভিপ্রায়ের কাছে। কিছুটা সংযম এবং উৎসের স্পষ্ট উল্লেখ বইটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারত।

এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শ্যাটার্ড ল্যান্ডস আমাদের ইতিহাসবোধকে প্রসারিত করে, এটা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়। এই বই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এশিয়ার যে রাজনৈতিক ভূগোলকে আমরা আজ স্বাভাবিক বলে মনে করি, তা কোনও চিরন্তন সত্য নয়। বরং এই মহাদেশের দক্ষিণ অংশে বহু সীমান্তরেখা টানা হয়েছিল আকস্মিক ভাবে, ঔপনিবেশিক প্রশাসক ও জাতীয়তাবাদী নেতাদের মিলিত ক্রিয়ায়। আজও দক্ষিণ এশিয়া সীমান্ত-সংঘর্ষ ও শরণার্থী সমস্যায় জর্জরিত। ডালরিম্পল আমাদের মনে করিয়ে দেন, এর শিকড় লুকিয়ে রয়েছে বিভাজন ও বিচ্ছেদের বিস্মৃত এই ইতিহাসে— বইটি তাই ইতিহাসের বই হয়েও আশ্চর্য রকম প্রাসঙ্গিক।


আরও পড়ুন