Aravali Hills issues

জমি দখলের ফন্দি

বনের সংজ্ঞা পরিবর্তন দেখতে পাই ২০২৩ সালে ‘বন সংরক্ষণ আইন ১৯৮০’ সংশোধনের মাধ্যমে।

বিধান কান্তি দাস
শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২১
আশঙ্কিত: আরাবল্লীর সংরক্ষণের দাবিতে এগিয়ে এসেছে কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরাও, জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি, দিল্লি, ২৭ ডিসেম্বর।

আশঙ্কিত: আরাবল্লীর সংরক্ষণের দাবিতে এগিয়ে এসেছে কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরাও, জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি, দিল্লি, ২৭ ডিসেম্বর। পিটিআই।

কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রকের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ লক্ষ করলে দেখা যায়, বন, জঙ্গল, পর্বতমালা সংরক্ষণের নামে তারা কিছু কৌশলগত পন্থা অবলম্বন করছে। তার মধ্যে অন্যতম, বন-জঙ্গল-পর্বতমালার সংজ্ঞার পরিবর্তন, যাতে এক বিস্তীর্ণ বনভূমি বা পর্বতমালাকে সংরক্ষণের নিয়মকানুনের আওতার বাইরে রাখা যায়। বিস্তীর্ণ বনভূমি বা পাহাড়ের অংশ বন আইনের বাইরে রাখতে পারলে জমি হস্তান্তর সহজ হয়। জমির চরিত্র সহজেই বদল করা যায়। তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর নামে খনিজ ও লৌহ আকরিক খনন প্রকল্প রূপায়ণ গতি পায়। ফলে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু জৈববৈচিত্র ধ্বংস হবে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধের ক্ষমতাও হ্রাস পাবে। পরিবেশ দূষিত হবে, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করবে। মানুষের জীবন ও জীবিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

বনের সংজ্ঞা পরিবর্তন দেখতে পাই ২০২৩ সালে ‘বন সংরক্ষণ আইন ১৯৮০’ সংশোধনের মাধ্যমে। এই নতুন সংজ্ঞায় শুধুমাত্র সেই সব বনভূমিকে বন সংরক্ষণ আইনের আওতায় রাখা হল, যে বনভূমি ১৯২৭ সালের ভারতীয় বন আইন অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর ১৯৮০, বা তার পরে নথিভুক্ত করা হয়েছে। আবার যে সব বনভূমি ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই সব জমিও এই আইনের আত্ততায় পড়বে না— বলা হল। এই ধরনের বনভূমি নথিভুক্ত বনের প্রায় ২৮ শতাংশ। এই সঙ্কুচিত বনের সংজ্ঞা বিখ্যাত টি এন গোদাবর্মন মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ে বলা বনের সংজ্ঞাকে অর্থহীন করার একটা চেষ্টা। ১৯৮০ সালের বন সংরক্ষণ আইনের ২ নম্বর ধারায় সুপ্রিম কোর্ট-বর্ণিত বনভূমি হল যে কোনও বনজমি, যেটা সরকারি নথিতে নথিভুক্ত আছে। এই প্রসারিত সংজ্ঞা বন সংরক্ষণে অনেকটা সাহায্য করেছে। আবার অনেক জঙ্গল এলাকা আছে, যেটা সরকারের খাতায় বন বলে নথিভুক্ত নয়। এমন জমির পরিমাণ দেশের বন আচ্ছাদনের প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ। এর বেশির ভাগই সমষ্টিগত জঙ্গল বা ‘কমিউনিটি ল্যান্ড’। গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত, ওড়িশা, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশে এই ধরনের বনভূমি আছে। এই নতুন সংজ্ঞায় এই সব জঙ্গলে বসবাসকারী অধিবাসীরা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন। কারণ এই সব জঙ্গল সংশোধিত বন সংরক্ষণ আইনের বাইরে থাকছে। ফলে এই প্রাকৃতিক জঙ্গলগুলি কোনও রকম বাধা ছাড়াই বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বেসরকারি পুঁজির হাতে যাচ্ছে বা যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

একই ভাবে আরাবল্লী পর্বতের সংজ্ঞা পরিবর্তনের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাটি সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছিল। কেন্দ্রীয় পরিবেশ দফতর, ফরেস্ট সার্ভে অব ইন্ডিয়া, ও জিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া দ্বারা গঠিত এক বিশেষজ্ঞ কমিটি আরাবল্লী পর্বতের এক অভিন্ন সংজ্ঞার প্রস্তাব করেন, যা মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণ করেছিল। নতুন সংজ্ঞার মূল ভিত্তি হল উচ্চতা ও স্থানিক নৈকট্য বা ‘স্পেশিয়াল প্রক্সিমিটি’। ঢাল, ধারাবাহিকতা বা উদ্ভিদের আবরণের মতো পরিবেশগত দিককে ভিত্তি ধরা হল না। সেই অনুযায়ী, কোনও ভূমিরূপকে আরাবল্লী পর্বত বলতে গেলে সেই পাহাড়ের উচ্চতা স্থানীয় সমতলভূমি থেকে কমপক্ষে ১০০ মিটার বেশি হতে হবে। আবার, দু’টি পাশাপাশি পাহাড়ের মধ্যে যদি ৫০০ মিটারের বেশি দূরত্ব হয়, দু’টিকে আলাদা আরাবল্লী পাহাড় হিসাবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, পর্বতমালার যে ধারাবাহিকতা থাকে সেটা আর থাকবে না। আরাবল্লী পাহাড়ের এই নির্ধারণ পদ্ধতি এক দিকে যেমন পরিবেশের ব্যাপক পরিবর্তন করতে পারত, অন্য দিকে এক বিস্তীর্ণ এলাকার জমির চরিত্রের পরিবর্তন হত বলে বিজ্ঞানী এবং পরিবেশ সচেতন মানুষরাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আপাতত সেই আশঙ্কার খানিক নিরসন হয়েছে। কারণ, দেশজোড়া প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট স্বয়ং তার ২০ নভেম্বরের রায়কে স্থগিত রেখে জানিয়েছে, নতুন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে আরাবল্লী বিষয়ে নতুন ভাবে পর্যালোচনার পরই এই পর্বতের সংজ্ঞা স্থির করা যেতে পারে।

আরাবল্লী পাহাড়ের জন আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, এই পর্বত দীর্ঘ দিনই খনিমাফিয়াদের নেকনজরে। সম্প্রতি সেই বেআইনি কাজকর্মে সরকারি সিলমোহর পড়তে শুরু করেছে। আরাবল্লীর সংজ্ঞা পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় তাগিদ তারই প্রমাণ। এখানে আরাবল্লী পাহাড় নির্ধারণে স্থানীয় সমতলভূমিকে ভিত্তি হিসাবে ধরা খুব আশ্চর্যজনক পদক্ষেপ, কারণ আগে সমুদ্রপৃষ্ঠকে পাহাড়ের উচ্চতা মাপার ভিত্তি হিসাবে ধরা হত। ৩ ডিগ্রি ঢালের ফর্মুলা অনুযায়ী, আরাবল্লী রাজস্থানের ১৫টি জেলার ৪০,৪৮৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এই ১০০ মিটারের সংজ্ঞায় ১৫টি জেলার শতকরা ৯৯ ভাগ আরাবল্লী পর্বতেশ্রেণির অংশই আর ‘পাহাড়’ থাকত না। ফলে এই বিস্তীর্ণ অংশ খননকার্য বা রিয়াল এস্টেট গঠনে আইনগত স্বীকৃতি পেয়ে যেত।

আরাবল্লী পর্বতমালা পৃথিবীর প্রাচীন পর্বতমালাগুলির মধ্যে অন্যতম। এমনকি হিমালয় পর্বতমালার থেকেও তা অনেক পুরনো। আরাবল্লীর গুরুত্ব ও স্বাতন্ত্র্য উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয়, সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং প্রাকৃতিক ঢাল হিসাবে কাজ করে। ৬৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত পর্বতমালা দিল্লি থেকে শুরু হয়ে হরিয়ানা, রাজস্থান হয়ে গুজরাতে শেষ। এখানকার জৈববৈচিত্র অসীম। কেন্দ্রীয় পরিবেশ দফতর দ্বারা গঠিত কমিটির রিপোর্ট বলছে, আরাবল্লী পর্বতমালা এলাকার শতকরা ৫০ ভাগ চাষবাসের জমি, ১০ ভাগ বড় গাছের জঙ্গল, ২ ভাগ জলাজমি, এবং শতকরা ২০ ভাগ সংরক্ষিত জঙ্গল। আরও শতকরা ২০ ভাগ বন্যপ্রাণী সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে খননকার্য নিষিদ্ধ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, আরাবল্লী পর্বতমালা ‘গ্রিন ব্যারিয়ার’ হিসাবে কাজ করে, হরিয়ানা, রাজস্থান, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ ও গাঙ্গেয় সমতলভূমিকে থর মরুভূমির প্রসার থেকে আটকায়। মরুভূমি থেকে আসা ধুলো, বালিকণা, গরম হাওয়া আটকায় দিল্লি ও আশপাশের অংশে। এই পর্বতমালা ধ্বংস হলে দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার বিপুল পরিবর্তন ঘটবে, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মানুষেরা নানা রোগের শিকার হবেন। এ ছাড়া বিজ্ঞানীদের হিসাব, আরাবল্লীর ভূমিস্তর প্রতি হেক্টরে ২ মিলিয়ন লিটার ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জ করার ক্ষমতা রাখে। এর নীচে অ্যাকুইফার বা ভূগর্ভস্থ জলের ভান্ডারগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়গুলোর মাঝখানে খননের অনুমতি দিলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাবে। অতিরিক্ত খননকার্য ও পাথর ভাঙার কাজের ফলে হরিয়ানা ও রাজস্থানের আরাবল্লী এলাকায় ইতিমধ্যেই জলের অভাব হচ্ছে এবং কৃষি উংপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই নতুন অভিন্ন সংজ্ঞা গৃহীত হলে তার পরিণতি সহজেই অনুমেয়।

একটা পর্বত শুধুমাত্র একটা উঁচু পাথরের চাঁই নয়। এর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিবেশগত কার্যকারিতা আছে। আরাবল্লী পর্বতমালা তার থেকে আলাদা নয়। সেই কারণেই এই পর্বতমালার মতো বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আরাবল্লী পর্বতমালা রক্ষায় বিভিন্ন সংগঠন, নাগরিক সমাজ সরব হয়েছে বলে সরকার কিছুটা পিছু হটেছে। কিন্তু এটাও ঠিক যে, একই রকম ভাবে বন সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী জঙ্গল-নির্ভর জনজাতিভুক্তদের জীবন ও জীবিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেললেও তা নিয়ে কাউকেই সরব হতে দেখা যায় না। সরকারও এই সব ক্ষমতাহীন প্রান্তিক মানুষের সমস্যাকে গ্রাহ্যই করে না।

আরও পড়ুন