Civilization

অতি লোভে সভ্যতা বিপন্ন

মানুষেরও আগের মানবপ্রজাতিরা গুহায় থেকেছে, বন্য জন্তু তাড়িয়ে থাকার ব্যবস্থা করেছে, পাথর দিয়ে ঘর বানিয়েছে। একাধিক কারণে তাদের এই তাড়না: ঝড় বৃষ্টি রোদ ঠান্ডা পশু-আক্রমণ থেকে বাঁচতে।

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০৭:৫২

আধুনিক সভ্যতার উন্নয়নের মাপকাঠি হল উন্নত নগরায়ণ। নগর যত বিস্তার লাভ করে, গ্রাম তত সঙ্কুচিত হয়, কমে কৃষিপ্রধান অঞ্চল। তিনটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক পর্যায়ে নগরায়ণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়, প্রাক্‌-শিল্প, শিল্প ও মহানগরীয় পর্যায়। শিল্প ও মহানগরীয় পর্যায়ের বয়স কম, বলতে গেলে মাত্র তিনশো বছর। প্রাক্‌-শিল্প যুগে নগরায়ণের ইতিহাসের ব্যাপ্তি বিশাল, আনুমানিক দশ হাজার বছর আগে থেকে গ্রাম ক্রমে নগরে রূপান্তরিত হয়েছে।

মানুষেরও আগের মানবপ্রজাতিরা গুহায় থেকেছে, বন্য জন্তু তাড়িয়ে থাকার ব্যবস্থা করেছে, পাথর দিয়ে ঘর বানিয়েছে। একাধিক কারণে তাদের এই তাড়না: ঝড় বৃষ্টি রোদ ঠান্ডা পশু-আক্রমণ থেকে বাঁচতে। শেষ হিমবাহ-উত্তর যুগে ইতিহাসের সিংহভাগ জুড়ে মানুষ জীবনধারণের সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীতে পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে গিয়ে ঘর বেঁধেছে, গড়ে উঠেছে গ্রাম।

ইরানের দক্ষিণ-পূর্বে মেমান্দ গ্রাম দশ-বারো হাজার বছর আগে এমনই গড়ে ওঠা এক জনবসতির স্বাক্ষর বয়ে চলেছে। পাহাড়ের গায়ে পাথর কেটে তাঁরা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে; অত্যন্ত রুক্ষ আবহাওয়ার জন্য পরিযায়ী হয়ে অন্যত্র চলে গেলেও, কিছু মানুষ এখনও রয়ে গেছেন। ইরানে জাগ্রোস পাহাড়ের কোলে দশ হাজার বছর আগে শুরু হয় সভ্যতার অন্যতম মাইলফলক কৃষি, পরে যা সংগঠিত কৃষিশিল্পে পরিণত হয়। আরও কোথাও কোথাও অন্য মানবগোষ্ঠী গ্রাম গড়েছে, চাষ করেছে, যেমন জানা গেছে পাকিস্তানের মেহরগড়, ভারতের লাহুরাদেওয়ায় ন’হাজার বছর আগের কৃষিশিল্প।

গ্রাম থেকে নগরসভ্যতায় আসার পথে হল একাধিক প্রযুক্তিগত উন্নতি। মাটি রোদে পুড়িয়ে ইট তৈরি শুরু হয় মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী-অববাহিকায় ছ’হাজার বছর আগে নগর পরিকল্পনা করে। সেখান থেকে মাত্র দেড় হাজার বছরের মধ্যে সিন্ধু-ঘাগ্‌গার-হাকরা সভ্যতায় নগর পরিকল্পনায় ব্যবহার হল মাটি পুড়িয়ে ইটের ব্যবহার। এই দুইয়ের মাঝে শুরু হয় নীলনদ উপত্যকায় মিশরীয় নগরসভ্যতা, রোদে জ্বলা ইট ও পাথর মিলিয়ে। যত সময় এগিয়েছে, নগর উন্নত হয়েছে। মেসোপটেমিয়ায় শহরটাই একটা রাজ্য, তার মধ্যে উঁচু এক ইমারত থেকে একাধারে প্রকৃতি-উপাসনা ও শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হত। নগর ছিল প্রাচীরবেষ্টিত। কৃষিতে ছিল উন্নত সেচ ব্যবস্থা। মিশরে ফারাওরা ছিল ঈশ্বরপ্রতিম, রাজাদের মৃত শরীর মমি করে তার উপর পিরামিড তৈরি ছিল প্রথা। প্রযুক্তি কতখানি উন্নত হলে ওই বিশাল পাথুরে স্থাপত্য তৈরি সম্ভব! সুস্থির কৃষি নগরবাসীর খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করেছিল। পোড়ামাটির ইটের তৈরি সিন্ধু সভ্যতার নগরায়ণ ছিল পরিকল্পনার নিরিখে সর্বোন্নত। গ্রিড নকশায় শহর গড়ে উঠেছে: পাকা ইটের চওড়া নিকাশি নালা রাস্তার পাশে, ঢাকা পোড়ামাটির টালি দিয়ে। ভূগর্ভস্থ নালা, নালা সংযোগে ময়লা জমার গর্ত, বাড়ির দেওয়ালের ভিতর পোড়ামাটির নলবাহিত নিষ্কাশন নালি অবাক করে। ইরানের পার্সিপোলিসে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দূষণ-সচেতন মানুষ পানীয় জলের নালার নীচে পেতেছিল নিষ্কাশন নালা।

এই তিন নাগরিক সভ্যতার ধ্বংস হয়েছে প্রধানত আবহাওয়া পরিবর্তন, নদীর পথ বদল, রুক্ষতা, বৃষ্টির স্থান পরিবর্তন ও বাণিজ্যিক ক্রমাবনতির জন্য। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দেখা গেছে সাতটি স্তরে সিন্ধু নগরসভ্যতা, প্রতিটি স্তর প্লাবিত হওয়ার পর নদীকে কেন্দ্র করেই নতুন নগর গড়ে উঠেছে। ক্রমে নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে।

সাড়ে চারশো কোটি বছরের পৃথিবী একাধিক বার আবহাওয়া পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়ে হারিয়েছে তার প্রাণসম্পদ, আবার উদ্ভব হয়েছে নতুন প্রাণীর। ২৬ কোটি বছর আগে নব্বই শতাংশের বেশি সামুদ্রিক প্রাণী হারিয়ে যায় হিমবাহের কবলে পড়ে। ‘মানুষ’ তার দু’লক্ষ বছরের জীবনে একাধিক হিমবাহ-উষ্ণায়ন চক্রের সাক্ষী। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে শেষ হিমবাহ কাটিয়ে এসেছে বর্তমান উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যে। কিন্তু এ বারেই প্রথম সে পৃথিবীর এক মূল উপাদান মাটিকে কাজে লাগাল রোদে শুকিয়ে ইটের ঘর বানাতে। পরে মাটি আগুনে পুড়িয়ে আরও মজবুত করে গড়ে তুলল ঘর ও বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক নগর। সে একের পর এক নগর পত্তন করেছে আগের ধ্বংসের উপর।

আজকের মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত, আবহাওয়াবিজ্ঞানের খুঁটিনাটিও তার জানা। সব সত্ত্বেও সে অরণ্য ধ্বংস করে, পর্বতকে ভেঙে শিল্প ও নগরায়ণের নেশায় মত্ত। পৃথিবী জুড়ে সে প্রকৃতিকে শোষণ ও নিকাশ করে চলেছে— ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের প্রকোপে হিমবাহের দ্রুত গলনে নদী ও সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস, অনিয়ন্ত্রিত ঝড়বৃষ্টি, বৃষ্টির স্থান পরিবর্তন, শস্য ফলনে বদল ইত্যাদি নানান বিপদের মোকাবিলা তাকে করতে হচ্ছে।

প্রতিকূল আবহাওয়ার জেরে আমেরিকার পশ্চিম, পূর্ব জাপান-সহ বিভিন্ন উপকূলে জলোচ্ছ্বাস তাণ্ডব চালাচ্ছে আধুনিকতম নগরে— মানুষ হচ্ছে গৃহহীন, দিশাহারা। শিল্প ও নগরায়ণ প্রসারের বেলাগাম প্রলোভন একুশ শতকের মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে তার স্বহস্তে গড়া সৃষ্টি ধ্বংসের পথে, চরম ক্ষতি হচ্ছে বাস্তুতন্ত্রের।

আরও পড়ুন