প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নোবেল দেওয়া হতে পারে সেরা বাজি
Nobel Peace Prize

তাতে যদি শান্তি ফেরে

সেই কবে থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের উপরেও তাঁর নজর, অতীতে বহু বার ট্রাম্প নিজে বা তাঁর অনুগামীরা এই নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন।

অতনু বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩৭
বে-হাত: মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বে-হাত: মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: পিটিআই।

সম্প্রতি তাঁর গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টাকে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রথম পর্বের শাসনের শেষ দিক থেকেই গ্রিনল্যান্ডের উপর নজর তাঁর। দ্বিতীয় পর্বে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার আগে থেকেই তাঁর গ্রিনল্যান্ড ‘চাই’, সেই সঙ্গে কানাডা আর পানামা খাল। গোড়ায় কেউ অবশ্য ভাবেনি যে, একুশ শতকের এক-চতুর্থাংশ পেরিয়ে ‘ডন’ নেটো-শরিক ডেনমার্কের থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করবেন। সেনা পাঠিয়ে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আমেরিকায় উঠিয়ে নিয়ে আসার পর দুনিয়া বিশ্বাস করতে শিখেছে, ট্রাম্প ২.০ সব কিছুই করতে পারেন। ইরানের যুদ্ধ সে বিশ্বাসকে মজবুততর করছে। কিউবা নিয়েও আশঙ্কার মেঘ জমছে— অদূর ভবিষ্যতে যে সেখানে কোনও কাণ্ড ঘটাবেন না ট্রাম্প, তেমন ভরসা দেওয়া মুশকিল।

সেই কবে থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের উপরেও তাঁর নজর, অতীতে বহু বার ট্রাম্প নিজে বা তাঁর অনুগামীরা এই নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন। আমেরিকা তথা বিশ্ব শাসনের দ্বিতীয় পর্বে এই নোবেল-আকাঙ্ক্ষা প্রবলতর হয়েছে, নিজমুখেই অজস্র বার নোবেল চেয়েছেন তিনি। শুধু তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের দিয়েই নয়, নানা দেশের কুশীলবদের দিয়েও নোবেলের জন্য তদবির করানো হয়েছে বার বার। বিষয়টা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন তিনি বলছেন, তোমরা আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দাওনি, তাই দুনিয়ার শান্তির কোনও দায়ভারও আমার নেই। একেবারে পাগলা দাশুর মতো চিনেপটকা ফাটানোর যুক্তি, “ও কেন আমায় মিহিদানা দিতে চাচ্ছিল না?”

তবে উপায়? শান্তিপূর্ণ বিশ্বের ‘আশা’য় কি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে দেওয়াই উচিত? এটা কিন্তু নতুন কথা নয়। শান্তি ‘নিয়ে এসেছেন’ বলে নয়, বরং শান্তি ‘নিয়ে আসবেন’, এই প্রত্যাশায় অতীতে নোবেল দেওয়া হয়েছে বহু বার। বলতেই পারেন যে, আজকের যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এ কথা ভাবাও ভয়ঙ্কর। সত্যিই। এবং সেই কারণেই ভাবা প্রয়োজন।

২০০৯ সালে বারাক ওবামার শান্তি পুরস্কার নিয়ে তাঁর সমর্থকদের, এমনকি ওবামার নিজেরও অস্বস্তি ছিল যথেষ্ট। তিনি নিজেই বলেছিলেন, “আমি একে আমার নিজের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসাবে দেখছি না, বরং বিশ্বে আমেরিকান নেতৃত্বের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসাবে দেখছি।” নোবেল মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১ ফেব্রুয়ারি, ওবামা প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র বারো দিন পর। এই সময়সীমায় ওবামা এমন কী করেছিলেন যার জন্য তাঁকে মনোনীত করা হয়, তা স্পষ্ট নয়। ওবামা বলেন, তিনি এই পুরস্কারকে একটি কর্মের আহ্বান (কল টু অ্যাকশন) রূপে গ্রহণ করবেন। জনপ্রিয় টক-রেডিয়ো উপস্থাপক রাশ লিম্বো বলেছিলেন, এই পুরস্কারের মানে আসলে ওবামাকে আফগানিস্তানে সেনা বৃদ্ধি না করতে এবং ইরান ও তার পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে উৎসাহ দেওয়া। পরবর্তী কালে ওবামা যখন আফগানিস্তান, গুয়ান্তানামো ও অন্যান্য সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, তখন রিপাবলিকানরা যুক্তি দিয়েছেন, নোবেল কমিটির পদক্ষেপের ফলে ওবামা বিশ্বের এমন সব অভিজাতদের কাছে দায়বদ্ধ, যাঁরা জর্জ ডব্লিউ বুশের নীতির ফাঁস থেকে বেরোতে চেয়েছেন।

শুধু ওবামার নোবেল নয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বার বারই ব্যবহৃত হয়েছে কৌশলগত ধাক্কা হিসাবে— উৎসাহ দিতে, চাপ দিতে, এমনকি ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলতেও। ইতজ়াক রাবিন, শিমোন পেরেজ় এবং ইয়াসের আরাফাতকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল ১৯৯৪-এ। অসলো শান্তি প্রক্রিয়ার সময়, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পরে নয়। পুরস্কারটিকে তাই দেখা হয়েছিল বিভিন্ন পক্ষকে শান্তির টেবিলে একত্রিত করা এবং সব পক্ষের মধ্যপন্থী নেতাদের শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসাবে। মেনাখেম বেগিন এবং আনোয়ার সাদাতকে ১৯৭৮ সালে নোবেল দেওয়া হয়েছিল ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পরে, কিন্তু আরব-ইজ়রায়েল সমস্যার পুরো মীমাংসার আগেই। নোবেল কমিটি স্পষ্ট ভাবেই একে তুলে ধরেছিল, ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসাবে। নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ককে ১৯৯৩-এ যখন নোবেল দেওয়া হয়, সে সময় আনুষ্ঠানিক ভাবে বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটেছিল বটে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার রূপান্তর তখনও বেশ অস্থিতিশীল। স্পষ্টতই পুরস্কারটির উদ্দেশ্য ছিল আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে উৎসাহ দান এবং শান্তি-বিনষ্টকারীদের দমন।

২০০০ সালে কিম দে-জুং’কে পুরস্কৃত করা হয় উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘সানশাইন পলিসি’র জন্য, যা সে সময়ে ছিল মূলত এক আকাঙ্ক্ষামূলক নীতি। নোবেল কমিটি খোলাখুলি স্বীকার করেছিল, তারা সমর্থন করছে একটি পদ্ধতিকে, প্রমাণিত ফলাফলকে নয়। কলম্বিয়ার জনগণ গণভোটে অল্প ব্যবধানে গেরিলা সংগঠন এফএআরসি-র সঙ্গে শান্তি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার পর ২০১৬-য় পুরস্কার দেওয়া হয় জুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসকে। নরওয়ের নোবেল কমিটি সরাসরি বলে, এটি দেওয়া হয়েছে যে কোনও মূল্যে শান্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে। আউং সান সু চি গৃহবন্দি থাকাকালীন ১৯৯১-এ নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁকে। মায়ানমারে কোনও গণতান্ত্রিক রূপান্তর তখনও অর্জিত হয়নি। এ ছিল এক প্রতীকী, ভবিষ্যৎমুখী পুরস্কার। ১৯৮৩-তে যখন লেখ ওয়ালেসাকে নোবেল দেওয়া হয়, পোল্যান্ড তখনও সামরিক শাসনে, সলিডারিটি আন্দোলন দমন করা হয়েছে। পুরস্কারটি ছিল এক কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থনের ইঙ্গিত।

শান্তির প্রত্যাশায় শান্তির নোবেল দেওয়া স্পষ্টতই এক ধারাবাহিক ক্রম, কোনও ব্যতিক্রম নয়। এটা পরিষ্কার যে, নোবেল কমিটি ‘শান্তি’-কে দেখে একটি প্রক্রিয়া হিসাবে, শেষ বিন্দু হিসাবে নয়। প্রায়ই তারা ভবিষ্যৎমুখী পুরস্কার দেয় আশার উপর ভিত্তি করে; এ যেন ‘আপনি শান্তির কাজটি করেছেন’ বলার চেয়েও বেশি করে বলা, ‘থামবেন না, এগিয়ে চলুন’। ভাবনাটা যেন, অপেক্ষা না করে পুরস্কারের মাধ্যমে এই ব্যক্তিকে এখন খানিক শক্তি জোগালে ভবিষ্যতে শান্তির সম্ভাবনা বেশি। প্রায়ই তাই পুরস্কৃত করা হয় যুদ্ধবিরতিকে— যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই। চরমপন্থীরা আবার শক্তি ফিরে পাওয়ার আগেই পুরস্কৃত করা হয় মধ্যপন্থাকে।

এই সব প্রচেষ্টার কিছু কিছু সাফল্যও পায়, যেমন ম্যান্ডেলা এবং ডি ক্লার্ক-এর পুরস্কার। বেগিন ও সাদাতের পুরস্কারও বেশ সফল। সাদাত নিহত হয়েছিলেন তা সত্য, কিন্তু ১৯৭৯-র মিশর-ইজ়রায়েল শান্তি চুক্তি এখনও ওই অঞ্চলের সবচেয়ে টেকসই চুক্তিগুলির একটি। সান্তোসের পুরস্কারও আশ্চর্যজনক ভাবে কার্যকর হয়েছে: গণভোটে পরাজয় সত্ত্বেও তিনি এগিয়ে যান, একটি সংশোধিত চুক্তি পাশ হয়। নোবেল পুরস্কার হয়তো রাজনৈতিক মনোবল জুগিয়েছিল তাঁকে।

ভবিষ্যৎমুখী কিছু নোবেল শান্তি পুরস্কারের ফল আবার মিশ্র বা অস্পষ্ট। যেমন কিম দে-জুং’এর নোবেল। সানশাইন নীতি উত্তর কোরিয়াকে পাল্টাতে পারেনি অবশ্যই, তবে তা সাময়িক ভাবে উত্তেজনা কমিয়েছে, খুলে দিয়েছে নতুন কিছু পথও। সমালোচকরা মনে করেন, পুরস্কারটি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে সদিচ্ছাকে। সমর্থকরা অবশ্য বলেন, তা প্রতিরোধ করেছে আরও খারাপ পরিস্থিতিকে। ওবামার পুরস্কারের ফলাফলও বিতর্কিত। সমর্থকরা বলেন, তা কূটনীতিকে শক্তিশালী করেছে; ইরান চুক্তি, জলবায়ুর প্রশ্নে নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করেছে। সমালোচকরা কিন্তু বলেন, ওবামার কাছে প্রত্যাশা ছিল অবাস্তব রকমের। আবার ইয়াসের আরাফাত বা সু চি-কে নোবেল দেওয়ার সুবাদে শান্তির প্রচেষ্টা স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে। অসলো চুক্তি ভেঙে গিয়ে হিংসা শুরু হলে সমালোচকরা যুক্তি দেন, পর্যাপ্ত রূপান্তর ছাড়াই এই পুরস্কার বৈধতা দিয়েছে আরাফতের মতো এক জনকে।

সব মিলিয়ে, আজকের অশান্ত দুনিয়ায় আরও বড় বিপর্যয় এড়াতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি সত্যিকারের নোবেল পুরস্কার (খেলনা হিসাবে মারিয়া কোরিনা মাচাদো-র মতো অন্য কোনও বিজয়ীর পদক নয়) দেওয়া বিশ্বশান্তির পক্ষে হয়তো খুব একটা খারাপ বাজি না-ও হতে পারে।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা

আরও পড়ুন