উপেক্ষিত: এসআইআর-এ নাম বাদ পড়া মানুষের ভিড়, স্পেশাল ট্রাইবুনালে আবেদনের অপেক্ষায়। বালুরঘাট, এপ্রিল ২০২৬। ছবি: পিটিআই।
পশ্চিমবঙ্গ এখন সত্যি এক বড় বিপর্যয়ের মুখে, কারণ লক্ষ লক্ষ ভোটার বাদ গেছেন ভোটার তালিকা থেকে। আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে সব কাজ ফেলে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে নিজ অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয়েছে। গত ৭৫ বছরে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ এ ভাবে কখনও ঘটেনি।
মনে হচ্ছে বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তাঁর পূর্বসূরিরা— সে সুকুমার সেনের মতো কিংবদন্তি হোক বা টি এন শেষন— সকলের কাজই ‘ভুল’ ছিল, তিনিই এক ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) অভিযান করে সব শুধরে দেবেন। তাঁর ফরমান হল— সমুদ্র খালি করে সব মাছ গোনা হোক, সৃষ্ট চাপে ও দমবন্ধ অবস্থায় কত মাছ মরে গেল সে দিকে তোয়াক্কা না করেই।
মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ‘বিশ্বাসের সম্পূর্ণ ভাঙন’-এর কথা বলে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। এটা সত্যি যে, রাজ্য সরকার কমিশনকে বিভিন্ন শ্রেণির আধিকারিকদের নাম পাঠাতে যথেষ্ট দেরি করেছিল, কিন্তু কমিশনও অতি উগ্রতা দেখিয়েছে। উভয় পক্ষের চরম রেষারেষি অভূতপূর্ব।
জ্ঞানেশ কুমার ব্যাখ্যা করেননি, কেন তিনি কমিশনের সময়-পরীক্ষিত তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বাতিল করে নিজের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন আবিষ্কার করলেন, যা প্রচুর জটিল ও কৌশলপূর্ণ। ১৯৫০-এর জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(২) ধারা কমিশনকে তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা দেয়, আর ১৯৬০ সালের ‘রেজিস্ট্রেশন অব ইলেক্টরস রুলস’-এর নিয়ম ২৫ বলে যে, এই সংশোধন ‘ইনটেনসিভ’ (নিবিড়) বা সংক্ষিপ্ত ভাবে করতে হবে, অথবা আংশিক নিবিড় ও আংশিক সংক্ষিপ্ত ভাবে হতে পারে। যদিও ধারা ২১(২)-এ ‘স্পেশাল’ বা বিশেষ ‘রিভিশন’-এর বিধান রয়েছে, তবে সেটি যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’, তা ঠিক নয়। তাঁর পূর্ববর্তী ২৫ জন সিইসি এই ধারার ব্যবহার প্রয়োজনীয় মনে করেননি, কারণ এতে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া জড়িত। এবং এই ‘স্পেশাল রিভিশন’ নির্বাচনী তালিকার কেবল একটি আসন বা তার অংশের জন্যই রাখা আছে। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বর্তমান সিইসি এই বিধানগুলো মিশিয়ে নিজের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ তৈরি করেছেন, যার পদ্ধতি এত সময়সাপেক্ষ ও জটিল যে বিভিন্ন রাজ্যে ষাটেরও বেশি বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) আত্মহত্যা বা কাজের চাপে মারা গেছেন।
সুপ্রিম কোর্ট মাঝে মাঝে হস্তক্ষেপ করে গ্রহণযোগ্য নথির সংখ্যা বাড়িয়েছে, তবে পুরো এসআইআর-টি আইনসিদ্ধ কি না, সে বিষয়ে গভীরে মন্তব্য করেনি। বিএলও, ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও) ও তাঁদের সহকারী (এআরও)-রা খোলাখুলিই বলছেন যে, নির্বাচন কমিশন সব কিছুকে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত করে তাঁদের কম্পিউটার কার্যক্রমের মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি নির্বাচনী আধিকারিকদের আইনি ক্ষমতা আত্মসাৎ করছে, যদিও কম্পিউটার প্রোগ্রামটি স্পষ্টতই যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে ভুয়ো ভোটার ধরার কাজ নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয়, কিন্তু আতঙ্ক ছড়িয়ে এই কাজ হয় না। প্রচুর ক্ষেত্রে নির্বাচকদের মজবুত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের দাবি বাতিল করা হয়েছে। কম্পিউটার একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ৬০ লক্ষ ভোটারের তথ্যে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ আছে এবং তাঁদের ভয়ঙ্কর অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালে শেষ ‘ইনটেনসিভ রিভিশন’-কে ‘ভিত্তি’ ধরা হয়েছিল, এবং তার পরে তেইশ বছর ধরে যুক্ত হওয়া সব নাম— এমনকি প্রকৃত ভোটারদেরও— সন্দেহভাজন বলে গণ্য করা হচ্ছে, যতক্ষণ না সঠিক প্রমাণিত হয়। ২০০২-পরবর্তী ভোটারদের বংশানুক্রমিক সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হল। এই কুণ্ডলী মেলানোর কাজ তো এত দিন কেবল পুরী বা গয়ার মতো তীর্থস্থানের দক্ষ পান্ডাদের একচেটিয়া ছিল!
১৯৫০ থেকে কমিশনের ভোটার খুঁজে বার করা ও তালিকাভুক্ত করার দায়িত্ব পুরোপুরি উল্টে দিয়েছেন বর্তমান সিইসি জ্ঞানেশ কুমার। তিনি তালিকা সংশোধনে ‘নাগরিকত্ব’কে একটি মানদণ্ড হিসেবেও চালিয়ে দিয়েছেন। এটি তাঁর বহু বছরের ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী ‘বস’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, কেননা শাহই তো ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’দের জন্য জনপ্রিয় করেছিলেন দু’টি শব্দ: ‘ঘুসপেটিয়া’ ও ‘উইপোকা’।
অথচ নাগরিকত্ব আইন মতে, নির্বাচন কমিশনের এই জটিল কাজ করার কথা নয়। ১৯৫০-এর জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৯(খ) ধারা স্পষ্ট জানায়, ভোটার হওয়ার যোগ্যতার জন্য প্রয়োজন কেবল ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স, আর যে কোনও এলাকার ‘সাধারণ বাসিন্দা’ হওয়া। নির্বাচনী আইনের এই গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠিটি ২০ নম্বর ধারায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ১৯৫০-এর আইনের দীর্ঘতম ধারার মাধ্যমে।
কিন্তু সিইসি জ্ঞানেশ কুমার দাবি করেন যে, ধারা ১৬(ক)-তে ‘ভারতীয় নাগরিক’ শব্দটি উল্লিখিত আছে— যদিও তাঁর আগেকার সিইসি কিংবা নির্বাচন কমিশনার কখনও এই দাবি করেননি। ভোটারের নির্ণায়ক শর্ত ছিল ‘সাধারণ বাসিন্দা’। এর আগে কমিশনই লিখিত ভাবে স্পষ্ট করেছিল যে ‘গণনাকারীর কাজ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ণয় করা নয়’। সুপ্রিম কোর্ট যখন কমিশনকে ধমক দিয়েছিল, ২১ জানুয়ারি এই কমিশনই পিছু হটে ঘোষণা করেছিল যে নাগরিকত্ব যাচাই একটি ‘উদার, নমনীয় পদ্ধতি’, এবং তার লক্ষ্য অবৈধ নাগরিকদের দেশত্যাগ করানো নয়।
তবে সীমান্ত জেলাগুলিতে, বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিপুল সংখ্যক আপত্তি এই লক্ষ্যের বিপ্রতীপে যায়। কেবল মুসলমান নয়, এর ফল উভয় দিকেই কাটে, যা প্রকাশ করেছিল অসমের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি। সেখানে দেখা গিয়েছিল, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ছিলেন হিন্দু। পশ্চিমবঙ্গেও একই অবস্থা, এবং বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ২.৫ থেকে ৩ কোটি মতুয়ার মধ্যে অনেকেই (সম্ভবত অর্ধেক বা তার বেশি) ঘোষণা করেছেন যে, ভারতীয় নাগরিক হওয়ার মতো নথি তাঁদের নেই। ওঁদের ঠাঁই দেওয়ার জন্যই বিজেপি সরকার ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরক প্রতিবাদের সৃষ্টি করে, এবং সরকার ‘গতি কমাতে’ বাধ্য হয়।
স্বভাবতই, এই বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং তিনি প্রতি দিন এসআইআর-বিরোধিতাকে অক্লান্ত ভাবে উস্কে গেছেন। পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার পরে গুরুতর শাসক-বিরোধী আন্দোলন থেকে তিনি মানুষের মনোযোগ সরাতে পেরেছেন। এ ছাড়াও অধিকাংশ উদারপন্থী বাঙালির মধ্যে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এক মারণ ভীতি রয়েছে, যে অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনের অন্যতম প্রধান শক্তি। তবে এ বার কিন্তু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের হিন্দি-হিন্দুবিরোধী তৃণমূল-সমর্থনের ধৈর্যও স্পষ্টতই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এর ফলে বাম, কংগ্রেস বা অন্যান্য বিজেপি-বিরোধী দলের পরিস্থিতি এ বার কিছু ভাল বলেই মনে হয়। মমতার সমর্থক ‘মুসলিম ভোটার’ও এ বার দোলাচলে, কারণ তিনি এখন খোলাখুলি বিজেপির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্বে অবতীর্ণ। ইসিআই-এর পক্ষ থেকে মুসলিম ভোটারদের ব্যাপক নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টিও তৃণমূলের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।
ভোট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ইসিআই রাজ্যের মুখ্যসচিবকে সরানোর যে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ করেছে, তা খুবই দৃষ্টিকটু ও অপমানজনক। তবে এও তো সত্য যে, প্রাক্তন মুখ্যসচিবের নিয়োগ হয়েছিল আট-নয় জন সিনিয়র আইএএস অফিসারকে উপেক্ষা করে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আই-প্যাকের অফিসে যাওয়াও ছিল নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক। অনেকেই মনে করেন, এ রাজ্যে আমলারা ও পুলিশের একটি বড় অংশ অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে গেছে এবং এঁদের অনেকেই দুর্নীতিকে মদত দিয়ে গিয়েছেন।
এক তীব্র সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে এ বারের ভোট পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চলেছে। বহু বৈধ ভোটারই ভোট দিতে পারবেন না, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। তবে নির্বাচনের বাকি সময়টা যেন রাজ্যে সংঘাতের পরিবেশ কমে, শান্তি বজায় থাকে— এটাই আশা করা যাক।