ক্ষুব্ধ: অসমে পশ্চিম কার্বি আংলং-এর খেরোনিতে উচ্ছেদ ঘিরে গোষ্ঠী সংঘর্ষের পর প্রতিবাদে শামিল জনতা, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫। পিটিআই
অসম কি বর্তমানে ভারতের অন্যতম অশান্ত রাজ্যে পরিণত? সম্প্রতি অসমের কার্বি আংলং জেলায় ভূমি অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন, সঙ্গে জাতিগত বিরোধ ও উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ভূমিপুত্র ও বহিরাগত সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা গেল। প্রশ্ন হল, কেন অসমে জমি, চাকরি ও সম্পদের উপর অধিকারকে কেন্দ্র করে এত হিংসার অবতারণা? কেনই বা অসমে বার বার ফিরে আসে ভূমিপুত্র বনাম বহিরাগতদের পরিচয়ের রাজনীতির প্রশ্ন?
অসমের প্রেক্ষাপটে ‘খিলঞ্জিয়া’ শব্দটা আজকাল প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অসমের আদি বাসিন্দা বা ভূমিপুত্র আসলে কারা? কাদের বৈধ অধিকার আছে রাজ্যের জমিতে? কারাই বা এই রাজ্যে চাকরি পেতে পারেন শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে? কারা সত্যিই বহিরাগত এবং সরকার কাদের অস্তিত্বের অধিকারকে অস্বীকার করতে পারে বা পারে না? ইতিহাস বলে, কেবল আহোম রাজবংশের উত্তরসূরি অহমিয়া বা অসমিয়ারাই ভূমিপুত্রের দাবিদার নন। প্রাচীন অসমের ইতিহাস ছিল কামরূপ সাম্রাজ্যকেন্দ্রিক। আর মধ্যযুগে আহোম, কোচ, কাছাড়ি রাজবংশ ছাড়াও, বারো ভুঁইয়ার মতো স্থানীয় সামন্ত রাজারা কামরূপ ও কামতা অঞ্চলে স্বাধীন শাসক ছিলেন।
অসমে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে ভূমিপুত্র হিসেবে এখন ধরা হয় এমন জনগোষ্ঠীদের, যাঁরা ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই অসমের বাসিন্দা ছিলেন। মনে রাখা ভাল, আরও অনেক আগে আহোম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সুকাফা মায়ানমার-অসম রুট ধরে অসমে আসেন; বোড়ো, কাছাড়ি, নাগা, রাভা, কার্বিরা আসেন তিব্বত-হিমালয় রুট হয়ে। নৃতাত্ত্বিক বিচারে কার্বিরা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত, সম্ভবত চিন থেকে আসেন। অস্ট্রো-এশীয় গোষ্ঠীর খাসি ও জয়ন্তিয়ারাও একই ভাবে অসমে আসেন। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র রুট দিয়ে আসেন ইন্দো-আর্য গোষ্ঠী। সবই বহু শতক আগের কথা। সুতরাং অসমে এই গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষেরা যতটা বহিরাগত, ততটাই ভূমিপুত্রও বটে।
তা হলে অসমে ভূমিপুত্র এবং বহিরাগতের ধারণা তৈরি হল কী ভাবে? ১৮২৬ সালে ইয়ান্দাবু চুক্তির পরে ব্রিটিশরা চা বাগান, সস্তা শ্রম এবং কৃষি উৎপাদনের জন্য তৎকালীন পূর্ববঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা থেকে প্রচুর মানুষকে অসমে নিয়ে আসে। স্থানীয় মানুষ দেখতে পান, তাঁদের জমি ও কর্মসংস্থানে বহিরাগতদের প্রভাব বাড়ছে। তখন থেকে ‘আমরা বনাম তারা’ চেতনার বীজ রোপিত হয়। ১৯২০-র দশকে ব্রিটিশ সরকার অভিবাসীদের বসতি নিয়ন্ত্রণের জন্য লাইন সিস্টেম বা এক নির্দিষ্ট সীমানা চালু করে, যার ও-পারে অভিবাসীরা জমি কিনতে পারতেন না। ভূমিপুত্র ও অভিবাসীর মধ্যে প্রশাসনিক রেখা টানা হয়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৫১ সালে প্রথম এনআরসি তৈরির সময় তথাকথিত ভূমিপুত্র পরিচয়, নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। বলা হয়, ১৯৫১ সালের আগে যাঁরা অসমে ছিলেন, তাঁরা অসমের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে গণ্য হবেন। ১৯৭৯ সালে অসম আন্দোলনের সময়, এই ‘ভূমিপুত্র’ ধারণার সঙ্গে যোগ হয় জমি, জাতি, সম্পদ আর অধিকারের ধারণা। এই আন্দোলনের মূল কথা ছিল অসম কেবল অসমিয়াদের জন্য— এত রকম জাতি, জনজাতি, অভিবাসী, ধর্মীয় সম্প্রদায় নিয়ে তৈরি আবহমান কালের মিশ্র সংস্কৃতির ধারণা এতে ধাক্কা খেল। ১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরল, যার থেকে তৈরি হল নাগরিকত্ব সংক্রান্ত টানাপড়েন।
এই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই দেখতে হবে অসমের অন্তর্গত কার্বি আংলং জেলায় ভূমিপুত্র কার্বি জনগোষ্ঠী এবং বাইরে থেকে আসা বাঙালি, বিহারি, নেপালি এবং কুকি বা নাগা জনজাতিদের মধ্যে সংঘর্ষকে। ‘প্রাচ্যের নিউ জ়িল্যান্ড’ বলে অভিহিত, অসমের মধ্যাঞ্চলের পার্বত্য জেলা কার্বি আংলং প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ অধিগ্রহণের পরে, মিকির হিলস নামে পরিচিত হয় এই অঞ্চল। দেশভাগের পর অসমের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি পাহাড়ি জনজাতিদের নিজস্ব ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ গঠনের সুপারিশ করে। তার ভিত্তিতে, ১৯৪৭ সালের ‘আসাম ল্যান্ড রেভিনিউ রেগুলেশন’-এর অধীনে, ১৯৫০ সালের ‘ট্রাইবাল বেল্ট এবং ব্লক’ আইনের মাধ্যমে সরকার কিছু এলাকা সংরক্ষিত বলে চিহ্নিত করে, যে জমি জনজাতি বা সংরক্ষিত শ্রেণির বাইরে কোনও মানুষ কিনতে, দখল বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। এই অঞ্চলে শিক্ষা, কৃষি এবং সংস্কৃতির বিষয়ে সুরক্ষা এবং নিজেদের এলাকা নিজেরা শাসন করার ক্ষমতা পায় জনজাতিরা। সংবিধানের ২৪৪(২) এবং ২৭৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে নগাঁও, শিবসাগর এবং খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড়ের কিছু অংশ নিয়ে তৈরি হয় ইউনাইটেড মিকির অ্যান্ড নর্থ কাছাড় হিলস জেলা। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে উত্তর কাছাড় পাহাড় স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ এবং ১৯৫২ সালে মিকির হিলস স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৭৬ সালের মিকির হিলস জেলার নাম পরিবর্তন করে কার্বি আংলং রাখা হয়, যার মানে হল কার্বিদের পাহাড়। অন্য অংশ পরিচিত হয় নর্থ কাছাড় হিলস নামে (বর্তমানে ডিমা হাসাও জেলা)। ২০১৬ সালে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য কার্বি আংলংকে আবার দু’ভাগে করা হয়— পূর্ব কার্বি আংলং এবং পশ্চিম কার্বি আংলং।
২০২১ সালের কার্বি শান্তি চুক্তি অসমের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এই চুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার কার্বি আন্দোলনের দাবিগুলোকে এক কাঠামোগত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। অস্থিরতা তৈরি হয় ভূমি প্রশ্নে ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে। জনজাতির স্বায়ত্তশাসিত পরিষদগুলি সেখানে রাজ্যের ভিতরে আর একটা ছোট রাজ্যের মতো কাজ করে। কার্বিদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে জাল নথিপত্র ব্যবহার করে বা সরকারি শিথিলতার সুযোগ নিয়ে সংরক্ষিত এলাকায় তাঁদের জমি অবৈধ ভাবে দখলে রাখা হয়।
কার্বি আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি তাঁদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়। ডিমা হাসাও, বোড়োল্যান্ডের জনজাতিদের মতো কার্বি আংলং-এও এক আশঙ্কা কাজ করছে। স্বায়ত্তশাসিত পরিষদগুলির দুই রক্ষাকবচ ‘ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লক’ আইন আর ষষ্ঠ তফসিল— জনজাতিদের জন্য সাংস্কৃতিক দুর্গের মতো। এই সুরক্ষা তুলে নিলে তাঁরা নিজভূমে পরবাসী হয়ে পড়বেন।
কার্বিদের আশঙ্কা, রাজ্য সরকার হয়তো ষষ্ঠ তফসিলের ক্ষমতা কমিয়ে, এই অঞ্চলগুলিকে সাধারণ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মতো করে, কর্পোরেটদের জমি দিতে চাইছে। তাঁদের মতে, সরকার আসলে তাঁদের মতো ভূমিপুত্রদেরই বাস্তুচ্যুত করে বড় কোম্পানিকে জমি দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করছে। তাই স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছে ‘আদানি-অম্বানী গো ব্যাক’। ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনগুলি রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।
‘জাতি, মাটি আরু ভেটি’, ২০১৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এই স্লোগান ব্যবহার করেছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্রদের বোঝানো, সরকার যে কোনও মূল্যে বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে স্থানীয়দের রক্ষা করবে। বর্তমানে কার্বি আংলং এবং বোড়োল্যান্ডের মানুষ এই স্লোগানকে সরকারের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁদের কাছে এই শব্দগুলো তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ লড়াইয়ের ডাক। কার্বি আংলং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। তাঁদের দাবি, এই সম্পদ শুধু তাঁদের উন্নয়নেই ব্যবহার করতে হবে।
অসমে আন্দোলন হত মূলত বিদেশি বিতাড়ন নিয়ে। কিন্তু, কার্বি আংলং এখন একাধারে নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং অন্য দিকে জমি রক্ষার লড়াইয়ে উত্তপ্ত। এই আন্দোলন প্রথম কর্পোরেট পুঁজি বনাম জনজাতি অধিকারকে সামনে এনেছে।
অসমের রাজনীতিতে ‘ভূমিপুত্র’ শব্দটি এখন এক রাজনৈতিক বর্মে পরিণত। বিজেপি যতই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করুক, কার্বি আংলং প্রমাণ যে, জনজাতিরা তাঁদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ রক্ষায় কতটা আপসহীন। সরকার যদি দ্রুত আইনি ও রাজনৈতিক সমাধান বার করতে না পারে, তা হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই ‘গেটওয়ে’ রাজ্যে আরও বড় অস্থিরতা প্রায় অনিবার্য।