কিংশুক সরকারের ‘চুক্তি-কর্মী সেই তিমিরেই’ (২৮-১) প্রবন্ধের শালিনী, ইতিহাসে অনার্স চন্দ্রা, বি কম পাশ অরূপদের অনিশ্চয়তায় ভোগার একটিই কারণ— বিপুল কর্মক্ষম শ্রমশক্তির উপযুক্ত কাজের অভাব। শালিনীর ন্যায় অস্থায়ী কর্মীদের পিএফ, গ্র্যাচুইটি, বোনাস ইত্যাদির যেমন বাধ্যবাধকতা নেই, সেই রকমই চন্দ্রাদের মতো গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীদেরও নেই কোনও ন্যূনতম বেতনের দায়বদ্ধতা এবং কর্মী-সুরক্ষা, অর্থাৎ নিরাপত্তার অঙ্গীকার। মিড-ডে মিলকর্মী, আশাকর্মীদেরও ‘কর্মী’ স্বীকৃতি, ন্যূনতম বেতন, মাতৃত্বের ছুটি ইত্যাদি দাবিগুলি আজও বকেয়ার খাতায়।
‘গিগ’ শব্দটির অর্থ— এমন এক চাকরি যা অস্থায়ী এবং সাধারণত কোনও মালিকের অধীনে না থেকে নিজের জন্য কাজ করা। কিন্তু বাস্তবে এই কর্মীদের স্বাধীনতা হরণ করেছে একটি অদৃশ্য সফটওয়্যার। তাঁরা কোম্পানির অংশীদার, এই আখ্যা দেওয়া হলেও, যে কোনও সময় মালিক ইচ্ছে করলে, যে কোনও কর্মীকে অ্যাপ থেকে বহিষ্কার করে দিতে পারেন। যতই গালভরা পদ দেওয়া হোক না কেন, তাঁরা ওই ব্যবসার পার্টনারও নন, কোম্পানির খাতায় নাম লেখা শ্রমিকও নন। অর্থাৎ শোষণের সাম্য বজায় আছে চুক্তিভিত্তিক কর্মী থেকে গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক কর্মীদের ক্ষেত্রেও। শ্রম আইনের আওতায় লক্ষ লক্ষ গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু না-করে শুধু ১০ মিনিটে ডেলিভারির প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের শব্দ বদল হল, কিন্তু গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জীবন-মরণ দৌড়ের ঝুঁকি কি বদলাল? কর্মীদের আয় সরাসরি গতির উপর নির্ভরশীল। ইনসেনটিভ কাঠামোও এমন ভাবে তৈরি, যাতে ধীর কাজ মানে কম আয়। শোষণের বাস্তব সমীকরণ একটুও বদলায়নি। কারণ ভারতে বহু মানুষের কাছেই এখন ‘গিগ’-এর অর্থ সাময়িক কাজ নয়, বিকল্পহীন বাধ্যবাধকতা।
প্রকৃত কর্মসংস্থানের অভাবে বাজারে শ্রমের জোগান যথেষ্ট। আগে চিরাচরিত শ্রমব্যবস্থায় লাভের সঙ্গে ব্যবসায়িক ঝুঁকিটাও বহন করতেন মালিকরা, শ্রমিক তাঁর সময় ও শ্রম বিক্রি করতেন। এখন কোম্পানি লাভের অধিকার রেখে দিয়েছে, ঝুঁকির প্রায় পুরোটাই শ্রমিকের কাঁধে। এটাই গিগ অর্থনৈতিক কাঠামো বা যে কোনও চুক্তিভিত্তিক কাজের ভিত্তি এবং সমস্যার উৎপত্তি। আগে মানুষ লড়াই করত জমি বা কারখানার মালিক ইত্যাদি দৃশ্যমান ক্ষমতার সঙ্গে, কিন্তু এখন ক্ষমতা লুকিয়ে আছে চুক্তিভিত্তিক কাগজ বা অ্যালগরিদমের মধ্যে। কাজ এবং জীবন দুটোই অসুরক্ষিত। ক্ষেত্রবিশেষে এর বিরুদ্ধে টুকরো-টাকরা প্রতিবাদ হলেও দাগিয়ে দেওয়া হয় ‘আইনভঙ্গকারী’ বলে। এর থেকে মুক্তির পথ এখনও বহু দূর।
সুপ্রিয় দেবরায়, বরোদা, গুজরাত
ভরসা নষ্ট
বঞ্চনার প্রতিবাদে ও সুনির্দিষ্ট দাবির ভিত্তিতে রাজ্য জুড়ে আশাকর্মীদের আন্দোলন চলছে। কিন্তু লজ্জাজনক বিষয় হল, তাঁদের দাবিকে মান্যতা না-দিয়ে পুলিশ-প্রশাসনের নির্মম দমনপীড়ন রাজ্য সরকারের অসংবেদনশীল মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এ প্রসঙ্গে ‘সাদা বনাম বেগুনি’ (২৮-১) সম্পাদকীয়কে সমর্থন করে কয়েকটি কথা। অন্য স্থায়ী আর্থিক উপার্জনের সুযোগ না-থাকায় চুক্তিভিত্তিক অল্প পারিশ্রমিকে ‘আশা’ নামক স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে হাজার হাজার মহিলা নিযুক্ত। প্রশাসনের নানা কাজ করতেও তাঁরা বাধ্য হন। সামান্য উৎসাহ ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও তা প্রায় না-মেলারই শামিল। এই অবস্থায় গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করতে তাঁরা বাধ্য হয়েছেন, এটা তাঁদের অধিকার। সদ্য রাজ্য বাজেটে তাঁদের জন্য ১০০০ টাকা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা সামান্যই। আইন অনুযায়ী, অসংগঠিত ক্ষেত্রে নির্মাণকার্য, সাফাই প্রভৃতি বিভাগে এক জন অদক্ষ শ্রমিকেরও মজুরি দৈনিক ৭৮৩ টাকা, ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী। মাসে ২০,৩৫৮ টাকা। কৃষিক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি প্রায় ৪৫০ টাকা। সরকার খেলা, মেলা, পুজো মন্দিরের জন্য বহু কোটি টাকা খরচ করতে পারলে আশাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন কেন? আলোচনার পথে না-গিয়ে পুলিশ দিয়ে অত্যাচার করা কি সরকারের মানবিকতার পরিচয়? মহিলাদের প্রতি মুখে দরদ দেখিয়ে লাভ নেই। আশা, আইসিডিএস, মিড-ডে মিলের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের দাবির প্রতি মান্যতা দেওয়া একান্ত উচিত। নয়তো রাজ্য সরকারের উপর মহিলাদের আস্থা-ভরসা বিশ্বাস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে।
সারনাথ হাজরা, হাওড়া
অমানবিক
‘সাদা বনাম বেগুনি’ সম্পাদকীয় প্রবন্ধটি সময়োপযোগী। গ্রাম ও শহরের আশাকর্মীরা তাঁদের ভাতা বৃদ্ধি-সহ কিছু দাবি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করছেন। ২১ জানুয়ারি স্বাস্থ্যকর্তারাই তাঁদের দেখা করতে বলেছিলেন। হঠাৎ কার নির্দেশে পুলিশ স্বাস্থ্যভবনে যেতে দেবে না বলে তাঁদের টেনেহিঁচড়ে আটকে রাখার ঘৃণ্য পথ নিল।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ শো-কজ় নোটিস পাঠিয়েও আশাকর্মীদের আন্দোলন থামাতে পারেননি। তার উপর ২১ তারিখের পুলিশি অত্যাচার। কিন্তু এতে পিছু হটার পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের ঐক্য ও জেদ আরও বেড়ে গেল। এই দরিদ্র মেয়েরা সংসারের অভাব-অনটন সামলাতে এই সমাজসেবামূলক কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে নিজ এলাকার মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেন তাঁরা। অথচ বিনিময়ে সামান্য ভাতা পান এঁরা। সর্বস্তরের সরকারি কর্মীর বেতন বাড়ে, এমএলএ, এমপি-দের ভাতা বাড়ে, কিন্তু এঁরা বঞ্চিতই থেকে যান।
মাসে পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র ১৫০০০ টাকা পাওয়ার দাবি এঁদের। ৫২৫০ টাকা, আর অনিয়মিত সামান্য উৎসাহ ভাতা, তাও দীর্ঘ দিন বকেয়া থাকে, এটা কি এঁদের যোগ্য প্রাপ্য? রাজ্য বাজেটে আরও ১০০০ টাকা ভাতা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও আজকের দিনে কি এই টাকায় সংসার চলে? ভাতা বাড়ানোর দাবি কি অযৌক্তিক? অথচ আশাকর্মীদের যে তৎপরতার সঙ্গে পুলিশ বাধা দিয়েছে, তাতে প্রশ্ন জাগে, সরকার কি পুলিশ-প্রশাসনকে যন্ত্রে পরিণত করেছে, না কি যতটুকু মানবিক বোধ এদের আজও টিকে আছে তাও গলা টিপে মারার চেষ্টা চলছে!
আজ সকলের দাবি তোলা উচিত, স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজে নিয়োজিত আশাকর্মীদের সম্মানজনক ভাতা বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সচল রাখার।
অনুরূপা দাস, পাঁশকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর
দূষিত বায়ু
‘স্বার্থের পরিবেশ’ (২৪-১) সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামে উল্লেখ করেছেন, ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা অস্বাস্থ্যকর দূষিত বাতাস। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিবেশ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে কোনও অর্থনৈতিক উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ভারতে প্রতি বছর কুড়ি লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যান বায়ুদূষণ সংক্রান্ত অসুখে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির স্থান দখল করার লক্ষ্যে পৌঁছনোর তাগিদে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে উন্নয়নের বিষবাষ্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি। স্মার্টফোনের দৌলতে বায়ুদূষণের মাত্রা (একিউআই) আমরা প্রতিনিয়ত জানতে পারলেও সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্তরেও আমরা ভীষণ উদাসীন। উচিত, যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহণ ব্যবহার করা। ঘরের মধ্যে ছোট গাছ লাগিয়ে ঘরের দূষণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই ছোট পদক্ষেপগুলোও কিন্তু বায়ুদূষণের হাত থেকে আমাদের রক্ষার প্রশ্নে সদর্থক ভূমিকা নিতে পারে।
শেষাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভদ্রেশ্বর, হুগলি