শোনা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে নমামি গঙ্গে প্রকল্পের জন্য এত দিন বেশি দূর এগোনো যায়নি, কেননা পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার তার জন্য প্রয়োজনীয় জমি দেয়নি। কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী সি আর পাটিল জানিয়েছেন, নদীর শোধনের জন্য বর্জ্য শোধনাগার প্লান্ট তৈরি করা চাই, সেই কারণেই জমি দরকার। দুর্ভাগ্য, গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের বিবিধ প্রকল্পের কাজ এই ভাবে কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্বের জটে পড়ে স্থগিত কিংবা স্তিমিত হয়ে গিয়েছে। বিগত তৃণমূল সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়ে রাজ্যের স্বার্থ, রাজ্যবাসীর প্রাপ্যের ক্ষতি সাধন করেছে, তার দিকে নির্দেশ করে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ গত দেড় দশকে বারংবার সতর্কবার্তা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গবাসীর স্বার্থ সবচেয়ে উপরে, তার জন্য প্রয়োজনে সরকারি জট খোলা, মুখ্যমন্ত্রীর ‘ইগো’ কমানো, কিংবা সমাধানসূত্রের সন্ধানটি জরুরি, বারংবার বলা হয়েছে। গঙ্গাসংস্কার প্রকল্পও সেই একই কারণে বেশি দূর এগোতে পারেনি, এই অভিযোগ তাই সর্বতো বিশ্বাসযোগ্য।
এও শোনা যাচ্ছে, বর্তমান সরকার এই দিকে এ বার পূর্ণ মনোযোগ দেবে। নমামি গঙ্গে প্রকল্প পুরোপুরি চালু করার সঙ্গে সঙ্গে নদী দূষণ রোধ বা স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করবে। এমনকি দু’টি ডলফিন পার্ক তৈরি করা হবে। এই সবই রাজ্যের পক্ষে অতি সুসংবাদ। আগামী কয়েক বছরে কেবল গঙ্গা নদী নয়, রাজ্যের অন্য বড় নদীগুলির নাব্যতা বৃদ্ধিও কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক ও রাজ্য সরকারের যৌথ লক্ষ্য হয়ে উঠুক, এই আবেদন রইল। সঙ্গে রাজ্য সরকারের কাছে আরও একটি অনুরোধ, কলকাতা শহরের খালগুলি সংস্কার প্রয়াস অনেক বার শুরু হয়ে অনেক বারই অবহেলিত হয়েছে, পরিস্থিতি যে-কে-সেই। অথচ প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দুই জনেই চেয়েছিলেন কলকাতার খাল সংস্কারের মাধ্যমে নতুনতর নাগরিক পরিবহণ ও বিনোদন প্রকল্প তৈরি করা হোক। সেই কাজ যে কেবল সৌন্দর্যায়নের জন্য জরুরি ছিল, তা-ই নয়, পরিবেশ দূষণ রোধ, বিকল্প পরিবহণের জন্যও বিরাট সহায় হতে পারত। কোনও প্রশাসনই তা করে উঠতে পারেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সব জলবাজার তৈরি করেছিলেন, সেগুলিও ক্রমে অকার্যকর হয়ে যায় প্রশাসনিক পরিকল্পনার অভাবে, পরিদর্শন ও সংস্কারের অভাবে।
মুশকিল হল, এই মুহূর্তে অনেক সুসঙ্কল্প শোনা গেলেও কেন যেন ভরসা জাগে না। কেননা নদীদূষণ বা নদীর অনাব্যতা, কিংবা খালপথের তুমুল দুরবস্থা তো কেবল এই রাজ্যের বাস্তব নয়, ভারতের উত্তরাংশের প্রায় সমস্ত প্রদেশের বাস্তব। কেবল যমুনা নদীর কথা ভাবাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। যমুনার ফেনিল দূষণ যে মাত্রায় পৌঁছেছে তা এখন বিশ্বরেকর্ড তৈরির দিকে দ্রুত ধাবমান। ডাবল ইঞ্জিন সরকার সত্ত্বেও এই পরিস্থিতি কেন, কেন সংস্কারের কাজ হচ্ছে না, প্রশ্ন থেকেই যায়। নমামি গঙ্গে প্রকল্প নিয়ে সরকারি উচ্ছ্বাস সর্বব্যাপী, কিন্তু উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের বাস্তব এখনও অন্য কথা বলে। সংশয় হয়, যে-ই যায় ক্ষমতায়, তারই প্রতিশ্রুতিসমূহ ক্রমে বিস্মৃতি, অবহেলা ও অবজ্ঞায় নিমজ্জিত হয়ে যায়। সুতরাং অতিশ্রুত শ্লোকটি একটু পাল্টে বলা যাক, প্রতিশ্রুতি নয়, জলেন পরিচীয়তে।