Bangladesh General Election 2026

স্বস্তি, আপাতত

ভোটের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে সব পক্ষেই গভীর অসন্তোষ জমা হয়েছে। ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ, ভোটদানে বাধা, বলপূর্বক বুথ থেকে পোলিং এজেন্টদের বার করে দেওয়া, এমনকি ধাক্কাধাক্কি মারামারি, কিছুই বাদ থাকেনি।

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:২৪

ভারতের প্রাচীন শাস্ত্র অল্পে সুখ পেতে বারণ করেছে। তবু কোনও কোনও সময় আসে যখন অল্পকেই অনেক বলে সুখী বোধ করা আবশ্যিক এবং জরুরি। তা ছাড়া, সাম্প্রতিক ইতিহাস মনে রাখলে বাংলাদেশের নির্বাচন-পর্ব সমাপ্ত, ভোটের ফল প্রকাশিত, ইসলামি মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়ে শাসক হতে যাচ্ছে না, বরং বিএনপি-ই জয়ী বলে ঘোষিত: এত কিছুকে সত্যিই ‘অল্প’ বলা যায় কি না, সেটাও একটি বড় প্রশ্ন। এই জাতীয় নির্বাচনে সে দেশের অন্যতম বৃহৎ জাতীয় পার্টি, প্রাক্তন শাসক দল আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা-মঞ্চে অবতীর্ণ হতে দেওয়া হয়নি, ফলে একে কত দূর গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলা যাবে, বলা মুশকিল। কিন্তু বিরাট মৌলবাদী ও কর্তৃত্ববাদী চাপের সামনে, হিংসাপ্লাবন রোধ করে, অস্থিরতা ও আতঙ্ক জয় করে, সীমিত গণতান্ত্রিক পরিসরে যে শেষ পর্যন্ত দেশ জুড়ে নির্বাচন সমাধা হল, এই খবর কেবল বড় নয়, উদ্বেগ-হ্রাসকারী। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি-ই প্রধান গণতান্ত্রিক দল বলে স্বীকৃত, ফলত এও বড় খবর যে গণতান্ত্রিক পরিচিতি-সহ একটি দলের পক্ষে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় প্রধান হতে চলেছেন। ভোটের হার কম, সন্দেহ নেই, কিন্তু গত তিন বারের তুলনায় সেই সংখ্যাকে আবার খুব কমও বলা যায় না। বর্তমান আবহে মহিলা ভোটার, যুব ভোটার এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের সংখ্যাও সন্তোষজনক— এও বড় খবর। সঙ্গত ভাবেই বাংলাদেশের নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশ্বের অনেক নেতা, যার মধ্যে আছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভোটের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে সব পক্ষেই গভীর অসন্তোষ জমা হয়েছে। ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ, ভোটদানে বাধা, বলপূর্বক বুথ থেকে পোলিং এজেন্টদের বার করে দেওয়া, এমনকি ধাক্কাধাক্কি মারামারি, কিছুই বাদ থাকেনি। সারা দিন সে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উত্তেজনা ও অশান্তির সংবাদ ভেসে এসেছে। বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়েছেন। তবে কিনা, ভোটকালীন হিংসা অপ্রত্যাশিত ছিল না, যে-হেতু এই ভোটের আগে গত দেড় বছরে হিংসার প্রস্ফুরণে বাংলাদেশ রীতিমতো রেকর্ড তৈরি করে ফেলেছে, এবং অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধান ইউনূস ও তাঁর সহকর্মীরা প্রমাণ করেছেন যে, তাঁরা হিংসাস্রোত থামাতে হয় অক্ষম, নয় অনিচ্ছুক। সেই দিক থেকে দেখলে, ভোট-কালীন পরিস্থিতি মোটের উপরে সন্তোষজনক।

সে-দেশের সংসদে বিরোধী আসন গ্রহণ করতে চলেছে জামায়াতে ইসলামী। এ দিকে, জাতীয় ভোটের পাশাপাশি জুলাই সনদ বা বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কারের উপর গণভোটের সনদের পক্ষে জনমত যাওয়ায় বিশেষ সন্তুষ্ট জামায়াত-সহ এনসিপি-ও। তবে কিনা, এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে কতখানি পরিবর্তন আসবে, তাতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কতখানি লাভ বা ক্ষতি ঘটবে, সে সব এখনও স্পষ্ট নয়। লক্ষণীয়, পরোক্ষে ও প্রত্যক্ষে, ভারত এই নির্বাচনে একটি গুরুতর বিষয় হয়ে উঠেছিল। নতুন সরকার গঠনের পর, আশা করা যায়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অতীত নৈকট্য ও বোঝাপড়া আবার অনুভূত হবে। বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে মিত্রতা ও আদানপ্রদানের সম্পর্ক থাকলে যে অনেক বাধা ও অসুবিধাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, আশা করা যায়, বাংলাদেশের নতুন সরকার তা বিস্মৃত হবে না। আশঙ্কাও কম নয়। মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামী যে হেতু এ বার বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যার আসন দখল করেছে, সে দেশের সংসদীয় রাজনীতির একাংশের ভারতবিরোধিতা তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা, যা এই উপমহাদেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক পরিবেশটিকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে। তাই আপাতত, আশা ও আশঙ্কার দোলাচলের মধ্যেই— বাংলাদেশের নতুন পর্বকে স্বাগত।

আরও পড়ুন