National Green Tribunal

ধ্বংসযজ্ঞ

আশঙ্কার কথাই বলে আসছেন পরিবেশবিদরা। গ্রেট নিকোবরে নির্মিত হবে জাহাজের বন্দর, বিমানবন্দর, উপনগরী, বিলাসবহুল শহর, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি।

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৯:১৩

জাতীয় পরিবেশ আদালতের অনুমোদন মিলেছে এই বছরের গোড়াতেই। প্রায় ৮১০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের ক্ষেত্রে তার কৌশলগত গুরুত্ব এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচ গ্রহণের কথাটিও উল্লেখ করেছে আদালত। আপাতত এই প্রকল্পের সামনে আর কোনও বাধা নেই। ধরে নেওয়া যায়, অচিরেই প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ, জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ এবং সুদীর্ঘ কালের জনজাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে এক কোণে ছুড়ে ফেলে এই দ্বীপভূমি অতি আধুনিকতার পথে সবেগে ধাবমান হবে। কিন্তু সম্প্রতি লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী মোদী সরকারের এই স্বপ্নের প্রকল্পকে অন্যতম বৃহৎ দুর্নীতি এবং দেশের প্রাকৃতিক ও জনজাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্যের প্রতি অপরাধ বলেছেন। জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের অতি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি গোষ্ঠীর হাতে এই দ্বীপের জমি তুলে দেওয়ার জন্যই এই প্রকল্পের পরিকল্পনা। যে দ্বীপ ভারতের চিরহরিৎ অরণ্যের অন্যতম ঠিকানা ছিল, সেই দ্বীপে শুধু এই প্রকল্পের কারণে লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা পড়বে।

ঠিক এই আশঙ্কার কথাই বলে আসছেন পরিবেশবিদরা। গ্রেট নিকোবরে নির্মিত হবে জাহাজের বন্দর, বিমানবন্দর, উপনগরী, বিলাসবহুল শহর, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি। অর্থাৎ, দ্বীপপুঞ্জের এক বিশাল অংশের চরিত্রগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ কেন? যে প্রকল্পে চিরহরিৎ বনভূমি উজাড় করে হরিয়ানায় বিকল্প বনভূমি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়, সেই প্রকল্পে ‘সুরক্ষাকবচ’-এর সরকারি দাবিও হাস্যকর ঠেকে। ভূপ্রকৃতিগত ভাবে সংবেদনশীল, ভূমিকম্পপ্রবণ এক দ্বীপপুঞ্জে যে কোনও ভারী নির্মাণকাজই বিপদস্বরূপ, সেখানে একযোগে এত কিছুর পরিকল্পনাই বা কেন? কংগ্রেস এর আগেও বিপন্ন শম্পেন জনজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সেই সূত্র ধরেই সম্প্রতি রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, কী ভাবে জনজাতি গোষ্ঠীর জমি কেড়ে বড় ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকে। অবশ্য, যে বৃহত্তর ক্ষতির মুখে তাঁরা ইতিমধ্যেই দাঁড়িয়ে, সেই ক্ষতির পূরণ টাকার অঙ্কে অসম্ভব। শম্পেনরা সুনামির ধাক্কায় এক বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফের তাঁদের উৎখাত হতে হলে হয়তো শীঘ্রই তাঁরা নিশ্চিহ্ন হবেন। দুর্ভাগ্য, সর্বগ্রাসী দক্ষিণপন্থী রাজনীতির চোখে তাঁদের অস্তিত্বের মূল্য কানাকড়িও নয়।

প্রসঙ্গত, বিরোধীদের দায়িত্বের কথাটিও মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি। গণতন্ত্রে শাসক যদি অন্যের অধিকার হরণে উদ্যোগী হয়, দেশের জমি, জল, হাওয়াকে অন্যায় ভাবে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কাজে লাগায়, তবে বিরোধী রাজনীতির দায়িত্ব সংগঠিত প্রতিবাদ জানানো, এবং জনমতকে নিজেদের সমর্থনে টেনে আনা। শুধুমাত্র মুখে অভিযোগ জানানো নয়, দরকার হলে পথে নামাও প্রয়োজন। এ দেশের বিরোধী শক্তি সেই পথে হাঁটছে কি? আরাবল্লী, নিকোবর, সরিস্কা, উত্তরাখণ্ড— শুধুমাত্র পর্যটনকেন্দ্র নয়, দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্যই এদের পরিবেশ বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। ক্ষমতাবান যদি তার পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলগত কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়, তবে তাকে ঠিক পথে চলতে বাধ্য করাই প্রকৃত বিরোধী রাজনীতির কাজ। সাময়িক, বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ তার বিকল্প হতে পারে না। বিরোধী দলগুলিকে দ্রুত তা বুঝতে হবে।

আরও পড়ুন