West Bengal Politics

বিপন্ন

পশ্চিমবঙ্গ এ বার বিপুল ভাবে পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই ‘অ-পরিবর্তন’ এই রাজ্যের প্রাপ্য নয়।

শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ ০৮:৫২

পশ্চিমবঙ্গ প্রমাণ করছে, এ রাজ্যের রাজনীতির চরিত্র পাল্টায়নি তিলমাত্র। বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেন বুধবার গভীর রাতে। গুরুতর আহত তাঁর গাড়ির চালকও। ঘটনাটিতে কে দোষী, তদন্তে নিশ্চয়ই তার নিষ্পত্তি হবে— কিন্তু, রাজনৈতিক সন্ত্রাসের এই মাত্রা পশ্চিমবঙ্গেও খুব পরিচিত নয়। ফল-পরবর্তী হিংসায় একাধিক বিজেপি কর্মীর প্রাণহানি হয়েছে, এবং একটি ঘটনায় তৃণমূলের এক নেতা গ্রেফতারও হয়েছেন। দলকে সংযত করার দায়িত্ব শীর্ষ নেতৃত্বকে নিতেই হবে। তাঁরা বুধবার রাতের ঘটনায় আদালতের পর্যবেক্ষণে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু, সেটুকুই যথেষ্ট নয়, রাজ্যের শান্তিরক্ষার দায়িত্ব তাঁদেরও নিতে হবে। ফলপ্রকাশের পালা সাঙ্গ হতেই কলকাতা থেকে গ্রাম, শহরতলি, মফস্‌সল, জেলায় জেলায় শুরু হয়ে গিয়েছে হিংসা— ভাঙচুর, মারধর, গালাগালি ও গুলিগোলা, লাঠিসোঁটা-অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োগ, অগ্নিসংযোগ। বিভিন্ন অফিস ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া ও দখল করা, পরাস্ত প্রার্থী, নেতা ও সাধারণ সমর্থকদের বাড়িতে হামলা, পরিবারের সদস্যদের হেনস্থা ও নির্যাতন, নারীদের লাঞ্ছনা, হুমকি, সব কিছুই চলছে। বিজেপির গুন্ডাবাহিনী থেকে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ কর্মী সমর্থক দুষ্কৃতী, নানা রঙে এই হিংসাঘূর্ণি রাঙানো। শুরু হয়েছে সংখ্যালঘুর প্রতি হিংসাও। লেনিনের মূর্তিও রেহাই পায়নি।

তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে সংযত থাকার কোনও বার্তা দেওয়া না-হলেও বিজয়ী দল বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্টাক্ষরে সমস্ত রকম হিংসা থামানোর নির্দেশ দিয়েছেন; পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কোনও রং না দেখে তাণ্ডবকারীদের দমন করতে বলেছেন। তাঁর এই দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ কিন্তু এখনও সর্বত্র মান্য করার চিহ্ন নেই। এখানেই গুরুতর প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সন্ত্রাস এখন দেশময় চর্চিত বিষয়— এবং এ বারের বিধানসভা ভোটে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, যে কোনও মূল্যে হিংসা না-হতে দেওয়া। অন্তত আপাত ভাবে, সেই কারণেই এত উচ্চপদস্থ কর্তা ও আধিকারিকের অদলবদল, স্থানান্তর, এবং বিপুল পরিমাণ আধা-সামরিক বাহিনী প্রেরণ করা হয়েছে। ভোট শান্তিপূর্ণ ভাবে ঘটেছে, তার জন্য কমিশন প্রশংসার্হ। কিন্তু ভোটের পর কি সেই বাহিনীর কর্মদক্ষতা হ্রাস পেল, উৎসাহ কমল? রাস্তাঘাটের এই হিংসা-তাণ্ডব থামাতে পারা— এ কি এতই কঠিন কাজ এত বড় বাহিনীর জন্য? তৃণমূলও অতীতে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তৎকালীন বিরোধীদের উপরে এমনই হিংসা চালিয়েছিল, এখন কর্মবিপাক সইতেই হবে, এই ‘যুক্তি’ নিশ্চয়ই প্রশাসনের হতে পারে না— যে প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের অধীন। অথচ প্রচারমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অজস্র ছবি-ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে বহু তাণ্ডব ঘটছে পুলিশ ও প্রহরারত সিএপিএফ-এর উপস্থিতি সত্ত্বেও। এই পরিস্থিতি কি সাধারণ মানুষের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য?

পশ্চিমবঙ্গ এ বার বিপুল ভাবে পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই ‘অ-পরিবর্তন’ এই রাজ্যের প্রাপ্য নয়। রাজনৈতিক পালাবদলে একটি দলের প্রবেশ ও আর একটির প্রস্থান, এর মধ্যবর্তী ক্ষণে ‘প্রশাসন’ বস্তুটি যাতে অন্তর্হিত হয়ে না যায়, তা দেখা কর্তব্য। বিজয়ী দলের দায়িত্ব অনেক, বিশেষ করে এত বড় জয়ের পর। তাদের নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনও ভাবে রাজ্যের সংখ্যালঘু বা অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীদের বিপন্ন করার মতো কথা কেউ না বলেন। দলের কর্মী-সমর্থকদের নির্দেশ দিতে হবে, যেন কোনও ধর্মবর্ণশ্রেণিগোষ্ঠী না দেখে সকলকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, রাজ্যে শান্তিশৃঙ্খলা ফেরানোর প্রয়াস করা হয়। চন্দ্রনাথ রথের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতেও যাতে প্রতিহিংসায় উস্কানি না দেওয়া হয়, দলীয় নেতৃত্বকে তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গকে শান্ত করার দায়িত্বটি অনস্বীকার্য।

আরও পড়ুন