Schools of West Bengal

মেধামানের অবনমন সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে! কোন পথে সম্ভব হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার?

পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন। আর সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে সে সব ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বত্রই সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন বলে জানাচ্ছেন শিক্ষকেরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১১:০৭

— প্রতীকী চিত্র।

রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলি এক সময় মেধার আঁতুড়ঘর হিসাবে গণ্য হত। সরকার পোষিত স্কুলগুলি থেকেও পড়ুয়ারা প্রতিষ্ঠিত হতেন সমাজের নানা স্তরে। গত দু’দশকে সেই প্রবণতায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষত শহরাঞ্চলের স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার অভাবে দেখা যাচ্ছে। কমছে মেধামান, ভাল ফলের নিরিখে পিছিয়ে পড়ছে সরকারি স্কুলগুলি। ঠিক তার বিপ্রতীপে বেসরকারি স্কুলগুলির প্রতি বাড়ছে আকর্ষণ। অতিকষ্টেও সন্তানের পড়াশোনার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে মধ্যবিত্ত বাঙালি।

Advertisement

কিন্তু কেন এমন পিছিয়ে পড়ছে রাজ্যের সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলি?

শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, গত কয়েক বছরে নানা কারণে সরকারি বা সরকার পোষিত স্কুলগুলি পিছিয়ে পড়ছে। পরিকাঠামো বা পঠনপাঠনের মানের অবনমন ঘটছে। এমনকি সামাজিক অবস্থান জাহির করতে অভিভাবকেরা বেসরকারি স্কুলে পাঠাচ্ছেন সন্তানদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতার এক স্কুলশিক্ষক বলেন, “এখন সকলেই মনে করেন, ভাল স্কুল মানেই বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল। সরকারি স্কুলের গায়ে লেগে গিয়েছে ‘নিম্নমানে’র তকমা। তবে এর নেপথ্যে যেমন সরকারি নীতির দায় রয়েছে, তেমনই দায় এক শ্রেণির শিক্ষক-অভিভাবকের।”

ইংরেজিতে জোর

শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, সমাজ-অর্থনীতির দাবি মেনে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। সেখানেই এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি স্কুলগুলি। খাস কলকাতাতেও সরকারি এবং সরকার পোষিত ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের সংখ্যা হাতে গোনা। যে সব স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে পঠনপাঠন হয়, সেখানেও শিক্ষকের অভাব। তার উপর গত দশ বছরে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।

তবে, কলকাতা থেকে জেলা— অনেক স্কুলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কলকাতার যাদবপুর বিদ্যাপীঠ বা কল্যাণীর পান্নালাল ইনস্টিটিউশন, পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহারাজা হাইস্কুল থেকে হাওড়ার বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশন এখনও ধরে রেখেছে আভিজাত্য। শিক্ষকেরা বলছেন, এ সব স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে এখনও স্বচ্ছন্দ অভিভাবকেরা।

ঠিক এই জায়গাতেই সরকারি উদাসীনতার প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, শুধু সরকারি বা সরকার পোষিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল তৈরি নয়, বাংলা মাধ্যম স্কুলে ইংরেজির উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সময়োপযোগী পাঠ্যক্রম

শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন মধ্যশিক্ষা পর্ষদ বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অবিলম্বে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের কথা ভাবা উচিত। সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে রাজ্য বোর্ডের পাঠ্যক্রম আদৌ উপযোগী কি না, তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছিল প্রায় দু’দশক আগেই।

তাই পাঠ্যক্রমের খোলনলচে বদলানোর পাশাপাশি সে বিষয়ে রাজ্যবাসীকে সচেতন করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগীরা। উত্তর কলকাতার এক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা বলেন, “বর্তমান পাঠ্যক্রম মোটেও সন্তোষজনক নয়। অভিভাবকেরা তা ঠিকই বুঝতে পারেন।”

নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষায় শিক্ষকদের দায়

পাশাপাশি উঠে এসেছে নিয়মশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গও। গত কয়েক বছরে হাওড়ার শ্যামপুর থেকে কাকদ্বীপ— সংবাদমাধ্যম উঠে এসেছে শিক্ষক নিগ্রহের খবর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, পড়ুয়াদের শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ তুলে স্কুল ঢুকে শিক্ষকদের উপর চড়াও হয়েছে দুর্বৃত্ত। ওই প্রধানশিক্ষিকা বলেন, “স্কুলে নিয়মশৃঙ্খলা কড়া না হলে, পড়ুয়াদের মেধামান বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। সকলে সমান মেধা নিয়ে জন্মায় না। সে জন্য অনুশীলন প্রয়োজন। স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলায় কড়া হতে গেলে সরকারের তরফ থেকেও সদর্থক বার্তার প্রয়োজন। শিক্ষকদের নিরাপত্তা প্রয়োজন।”

পঠনপাঠনের গুরুত্ব বোঝাতে পাশ-ফেল

শিক্ষার মান বাঁচাতে পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার কথাও বলছেন শিক্ষকেরা। উত্তর কলকাতার প্রাচীন এক স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা বলেন, “পাশ-ফেল প্রথা না ফিরিয়ে আনলে সরকারি বা সরকার পোষিত স্কুলের মান আর ফেরানো সম্ভব নয়।”

পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সরকারি সদিচ্ছা

এরই পাশে রয়েছে পরিকাঠামোর উন্নতির প্রসঙ্গও। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন। আর সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে সে সব ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বত্রই সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন বলে জানাচ্ছেন শিক্ষকেরা। উত্তরবঙ্গের এক স্কুলশিক্ষক বলেন, “রাতারাতি এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে এখনই পদক্ষেপ করা হলে, আগামী কয়েক বছরে সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলির হৃতগৌরব খানিক ফেরানো সম্ভব।”

Advertisement
আরও পড়ুন