ছবি: সংগৃহীত।
নেই একজনও পড়ুয়া— সারা দেশ এমন স্কুলের সংখ্যার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আবার উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকের শূন্যপদে একেবারে শীর্ষে রয়েছে এই রাজ্য। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক শূন্যতার নিরিখে বিহারের থেকে মাত্র এক ধাপ পিছিয়ে।
সম্প্রতি গোটা দেশের স্কুলশিক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে নীতি আয়োগ। সেখানেই এ রাজ্যের পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে, তা একেবারেই সন্তোষজনক নয়। সার্বিক ভাবেই গোটা দেশের সরকারি স্কুলশিক্ষার পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয় বলেই মনে করছে শিক্ষামহল। এর উপরে আবার রয়েই গিয়েছে স্কুলছুটের মতো সমস্যা।
এক মাসও হয়নি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কেন্দ্রের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা শিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে চাইছে বলে মনে করছেন শিক্ষকদের একাংশ। কিন্তু সেখানেই দেশের সার্বিক চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। বিশেষত, ডবল ইঞ্জিন সরকার থাকা বিহারের পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
ওই রিপোর্টে দেশের সরকারি স্কুলের সার্বিক যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে স্কুলের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষক ও পড়ুয়ার সংখ্যা, এমনকি কোন ক্লাসের পড়ুয়ার দক্ষতা কেমন— তার হিসাবও দেওয়া হয়েছে তথ্যসমৃদ্ধ ভাবে উল্লেখ করেছে নীতি আয়োগ। সেখানে বহু ক্ষেত্রেই সরকারি স্কুলের তুলনায় বেসরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা এগিয়ে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শিক্ষকেরা মনে করছেন, এই প্রবণতা ও পরিসংখ্যান সরকারি স্কুলগুলির পক্ষে মোটেও সুখকর নয়।
দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণির কোনও পড়ুয়া ভাগ করতে পারে কি না, তা নিয়ে এক সমীক্ষা চালানো হয়। দেখা গিয়েছে, বেসরকারি স্কুলের ৫৫.৮০ শতাংশ পড়ুয়া ভাগ করতে পারছে। কিন্তু সরকারি স্কুলের মাত্র ৪১.৯০ শতাংশ পড়ুয়া তা পারছে। সরকারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের ২৭.৬০ শতাংশ বিয়োগ করতে পারে। অথচ, বেসরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে এই হার ৪৭.৫০ শতাংশ।
শুধু তা-ই নয়, রিপোর্টে স্পষ্ট দেখানো হয়েছে, ২০০৫-এ যেখানে সরকারি স্কুলের পড়ুয়া ভর্তির হার ছিল ৭১ শতাংশের কাছাকাছি, ২০২৪-২০২৫ সালে তা নেমেছে ৪৯ শতাংশে। গোটা দেশেই এই পরিস্থিতি। এ রাজ্যের পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৩৩ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য।
নীতি আয়োগের রিপোর্টে স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। এমনকি ১২১ পৃষ্ঠায় এসসিআইআরটি-র মতো অ্যাকাডেমিক বিভাগগুলিকে সচল করার পারমর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্মীর অভাবে এই ধরনের বিভাগগুলি অচল হয়ে পড়লে সেই প্রভাব সরাসরি শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ছে বলে জানানো হয়েছে। পরোক্ষে বহু বার শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাদানের পদ্ধতির উন্নতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্কুলপরিচালন সমিতি, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মতো বিষয়গুলিতে গুরুত্ব দেওয়া হলে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করছে নীতি আয়োগ। এর পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলেও মনে করে নীতি আয়োগ। তবে এর ফলে কি আদৌ ফিরবে শিক্ষার হাল?
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়া এবং শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করার ফলে স্কুলশিক্ষা যে তলানিতে ঠেকছে তা অনেক আগেই আমরা দাবি করেছিলাম। শিক্ষাকেই আগে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।’’
মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সম্পাদক অনিমেষ হালদার বলেন, ‘‘কেরল এবং দিল্লিতে দেখা গিয়েছে বেসরকারি স্কুল ছেড়ে অনেকে সরকারি স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে সরকারের সদিচ্ছা ও শিক্ষানীতি ঠিক থাকলে শিক্ষার হাল ফিরবেই। তবে সেই নীতি কাগজেকলমে থাকলেই হবে না বাস্তবায়িত করতে হবে।’’
শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী বলেন, ‘‘গোটা দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাই নিম্নমুখী। এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট। প্রাথমিক হল বুনিয়াদি শিক্ষা। এই ক্ষেত্রে সবার আগে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অভিভাবকেরা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে ভরসা করতে পারলে তাঁরা বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকবেন না।”