Amit Shah in Bengal

অমিত মুখে অধিকারী-নাম! ‘চার্জশিট’ প্রকাশের মঞ্চে তিন বার এল শুভেন্দুর কথা, উল্লেখ পুস্তিকাতেও, কিসের ইঙ্গিত?

চার্জশিটে লেখা হয়েছে, ‘২০১৬ থেকে ৩০০ জন বিজেপি কর্মী নির্বাচনী হিংসার বলি হয়েছেন। গত জানুয়ারি মাসে পশ্চিম মেদিনীপুরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল কর্মীদের হাতে আক্রান্ত হন।’

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ২০:৫৭
Amit Shah mentions Suvendu’s name three times from dais of launching Chare Sheet against Mamata

‘জনগণের চার্জশিট প্রকাশ’ কর্মসূচিতে (বাঁ দিকে) অমিত শাহ এবং শুভেন্দু অধিকারী (ডান দিকে)। শনিবার নিউ টাউনের হোটেলে। ছবি: সংগৃহীত।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করলেন না। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষিত হওয়ার পর প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গে এসে অমিত শাহ যে বার্তা দিলেন, তাতে এ বারের ভোট ময়দানে বিজেপির ‘প্রধান মুখ’ হিসাবে শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্ব সম্ভবত স্পষ্ট হয়ে গেল।

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনকাল সম্পর্কে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করতে গিয়ে তিন বার শুভেন্দু অধিকারীর ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন বিজেপির অন্যতম সর্বোচ্চ নেতা। এমনকি, ‘চার্জশিট’ তথা অভিযোগপত্রেও শুভেন্দুর উপরে ‘তৃণমূলের হামলা’র কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হল। দল ক্ষমতায় এলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তা বিজেপি এখন ঘোষণা করবে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কোন নেতাকে আপাতত সবচেয়ে ‘ওজনদার’ মনে করা হচ্ছে, তা বুঝিয়ে দিতেও শাহ দ্বিধা করলেন না বলে অনেকে মনে করছেন।

শনিবার যে ‘চার্জশিট’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন, তাকে বিজেপির তরফ থেকে ‘জনতার চার্জশিট’ নাম দেওয়া হয়েছে। ১৫টি ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে মমতার ১৫ বছরের রাজত্বকালকে আক্রমণ করা হয়েছে। অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি, অরাজকতা এবং অপশাসন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, গণতন্ত্রে আঘাত, নারীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, শিল্পের শ্মশান, অবহেলিত কৃষি, স্বাস্থ্য পরিষেবায় উদাসীনতা, শিক্ষার অবনতি, আক্রান্ত সংস্কৃতি, চা শিল্পে অবহেলা, উত্তরবঙ্গের প্রতি বঞ্চনা, সিন্ডিকেটের মুক্তাঞ্চল রাঢ়বঙ্গ, জরাজীর্ণ কলকাতা মহানগর— এমন নানা শীর্ষকে আলাদা আলাদা অধ্যায় রয়েছে মলাট-সহ ৪০ পৃষ্ঠার ‘চার্জশিট’-এ। শাহ সে পুস্তিকার আনুষ্ঠানিক উন্মোচনের পরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোলা বিভিন্ন অভিযোগ উদাহরণ-সহ পড়ে শোনান। বিজেপির ‘চার্জশিট’-এ ‘গণতন্ত্রের উপরে আঘাত’ নামক অধ্যায়টিতে শুভেন্দুর উপরে ‘হামলা’র কথা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘২০১৬ থেকে ৩০০ জন বিজেপি কর্মী নির্বাচনী হিংসার বলি হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে পশ্চিম মেদিনীপুরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল কর্মীদের হাতে আক্রান্ত হন।’

শাহ নিজে যখন পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা ব্যাখ্যা করছিলেন, তখনও তিনি শুভেন্দুর উপর ‘হামলা’র কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটে গিয়েছে। ৩০০-র বেশি রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপর পশ্চিম মেদিনীপুরে হামলা করা হয়েছে। আমাদের তৎকালীন সভাপতি জেপি নড্ডার গাড়ির উপরেও হামলা করা হয়েছে।’ রাজনৈতিক হিংসার মুখে রাজ্য বিজেপির প্রথম সারিতে থাকা অন্য কয়েক জন নেতাও বিভিন্ন সময়ে পড়েছেন। তাঁদের কথা আলাদা করে ‘চার্জশিট’-এ উল্লেখ করা হয়নি বা শাহের মুখেও শোনা যায়নি। তাই রাজ্য বিজেপির একাংশের মতে, শাহের কথায় এবং ‘চার্জশিট’-এর পাতায় শুভেন্দুর উপরে ‘হামলা’-র বিশেষ উল্লেখ শুভেন্দুর ‘বিশেষ গুরুত্ব’ বুঝিয়ে দিয়েছে।

শাহের মঞ্চে শুভেন্দু ছাড়াও ছিলেন রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির আরও দুই নেতা শমীক ভট্টাচার্য এবং সুকান্ত মজুমদার। নিজের বক্তব্যের শুরুতে শাহ ‘রাজ্য সভাপতির ভূমিকা’ একবার উল্লেখ করেন। কিন্তু নাম উচ্চারণ করেননি। বলেন, ‘‘আমাদের দলের প্রত্যেক কর্মী রাজ্য সভাপতির নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার তৈরির লক্ষ্যে খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নির্বাচনের ময়দানে নেমেছেন।’’ তার পরেই শুভেন্দু-প্রসঙ্গ। শাহের কথায়, ‘‘রাজ্যে চলতে থাকা অব্যবস্থা, অরাজকতা, বেহাল আর্থিক অবস্থা আর অনুপ্রবেশের সঙ্কটের কথা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনের আগেই পুরো পশ্চিমবঙ্গ সফর করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।’’

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ধীরে ধীরে কী ভাবে ভোট বাড়িয়েছে, সে হিসাব দিতে গিয়ে শাহ আবার শুভেন্দুর নাম নেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ১০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপি ২০২১ সালে কী ভাবে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছিল, সে হিসাবও মনে করিয়েছেন শাহ। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘৭৭ আসন নিয়ে শুভেন্দুজি আমাদের বিধায়ক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’’

অতএব, শাহের ‘চার্জশিট’ প্রকাশ কর্মসূচি শেষ হতেই শুভেন্দুর গুরুত্ব ‘বৃদ্ধি’ সম্পর্কে বিজেপির ভিতরে-বাইরে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এ বারের নির্বাচনে টিকিট পেয়েছেন, এমন এক পুরনো নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘শুভেন্দু অধিকারীকে যখন নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও টিকিট দেওয়া হয়েছে, তখনই স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক ওজন কতটা।’’ ওই নেতার কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক ইঞ্চি জমিও বিনা যুদ্ধে ছাড়া হবে না— এই হল দলের বার্তা। আর সেই বার্তার রূপায়ণ ঘটাতে গিয়ে যদি দল শুভেন্দুকে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী করে, তা হলে বুঝতে হবে, শুভেন্দুর চেয়ে ওজনদার প্রার্থী কেউ হতে পারেন বলে দল মনে করছে না।’’

বিজেপি সূত্রের খবর, এ বারের প্রার্থিতালিকাতেও শুভেন্দুর প্রভাব অন্য দুই প্রথম সারির নেতার (শমীক, সুকান্ত) চেয়ে বেশি। শতাধিক আসনে প্রার্থীর নাম শুভেন্দুর সুপারিশ বা দাবি মেনেই চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে রাজ্য বিজেপির একাধিক সূত্রের দাবি। ভূপেন্দ্র যাদব বা সুনীল বনসলদের মতো যে কেন্দ্রীয় নেতারা দিল্লির প্রতিনি‌ধি হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ সামলাচ্ছেন, তাঁদের কাছে সে বিষয়ে শাহের ‘স্পষ্ট বার্তা’ ছিল বলেও কারও কারও দাবি।

গত পাঁচ-সাত বছরে প্রায় কোনও রাজ্যেই ‘মুখ্যমন্ত্রীর মুখ’ ঘোষণা করে বিজেপি ভোটে যাচ্ছে না। জয় পেলে ভোটের পরে মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে ভোট ঘোষণার পরে পশ্চিমবঙ্গে শাহের প্রথম কর্মসূচিতেই শুভেন্দুর নাম যে ‘বিশেষ উল্লেখ’ পেল, তা ‘বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে বিজেপি-তেই অনেকের অভিমত।

Advertisement
আরও পড়ুন