ভোট দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার নন্দীগ্রামে। ছবি: পিটিআই।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এতদিন তিনি ‘আগ্রাসী নেতা’ হিসাবেই পরিচিতি পেয়ে এসেছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম দেখল তাঁর ভিন্ন রূপ। ভোটের গোটা দিন শুভেন্দু অধিকারীর মাথা ঠান্ডা রইল। আচরণ রইল সংযত।
বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৭টা নাগাদ কাঁথির ‘শান্তিকুঞ্জ’ থেকে নিজের কেন্দ্রে রওনা দেন বিরোধী দলনেতা। নন্দীগ্রামে পৌঁছে নন্দনায়কবাড় এলাকার একটি বুথে ভোট দেন তিনি। এরপর দিনভর বুথে বুথে ঘুরে ভোটগ্রহণ খতিয়ে দেখেন। সাধারণত নিজের এসইউভি-র মাঝখানের আসনে বসে সফর করলেও নন্দীগ্রামে পৌঁছে তিনি গাড়ি বদলে একটি ছোট গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসে এলাকা পরিদর্শন করেন। অনেকের মতে, এতে শুভেন্দুর ‘গ্রাউন্ড কানেক্ট’ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ভোট পরিদর্শনের ফাঁকে ফাঁকে শুভেন্দু বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে ক্যাম্প অফিসে গিয়ে কথা বলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে পরিস্থিতির খোঁজখবর নিয়েছেন। পাশাপাশিই মোবাইলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটগ্রহণের খবরও সংগ্রহ করেছেন। একাধিক বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দুকে ফোন করে নিজেদের এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। গোপালচক এলাকায় গিয়ে বিজেপি কর্মীদের অনুরোধে ত্রিপলের উপর বসেই মুড়ি এবং ঝুরিভাজা খান শুভেন্দু।
দিনভর তাঁকে শান্ত দেখিয়েছে। যাকে বিজেপির স্থানীয় কর্মীরা ‘আত্মবিশ্বাস’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার নন্দীগ্রামের বিরোধী তৃণমূল যে আচরণকে ব্যাখ্যা করেছে ‘হতাশা’ বলে। বিজেপির বক্তব্য, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে অধিকাংশ আসনেই বিজেপি জিতবে বলে শুভেন্দুকে আত্মবিশ্বাসী এবং নিশ্চিন্ত দেখিয়েছে। বস্তুত, শুভেন্দু দিনের ভোঠ শেষ হওয়ার ঘন্টাখানেক আগেই ঘোষণা করে দিয়েছেন, ‘‘বিজেপি এই দফায় ১২৫ আসনের কমে পাবে না।তৃণমূলের সরকার চলে গিয়েছে।’’ আবার তৃণমূল শিবিরের বক্তব্য, শুভেন্দু জানেন, তিনি হারছেন। তাই হতাশা থেকে শান্ত হয়ে গিয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, বেসি ‘লাফঝাঁপ’ করে লাভ নেই।
তবে এটা দেখা গিয়েছে যে, উস্কানিমূলক পরিস্থিতিতেও মেজাজ হারাননি শুভেন্দু। যেমন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিল নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করের কনভয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেন্দুর কথোপকথনের সময় তৃণমূল প্রার্থীর কনভয় থেকে জোরালো হর্ন বাজানো হলেও তার কোনও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেননি শুভেন্দু। বরং হাসিমুখে তিনি বলেন, “ওরা ভাবছে, এখান থেকে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলবে। নন্দীগ্রামে ওদের কেউ কাউন্টই করে না!”
দু’টি জায়গায় তৃণমূল কর্মীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মুখে পড়তে হয়েছে শুভেন্দুকে। ভীমকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সাতেঙ্গাবাড়ি শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে শুভেন্দুর কনভয় ঘিরে স্লোগান দেওয়া হয়। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, ভীমকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথ পরিদর্শন করে শুভেন্দু চলে যাওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন তৃণমূল কর্মীরা। আবার সাতেঙ্গাবাড়ি শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে শুভেন্দুর কনভয় ঢুকতে দেখেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া শুরু করেন তৃণমূল কর্মীরা। দ্রুত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় স্লোগান থামে। তবে উত্তেজিনা তৈরি হতে পারত। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শুভেন্দুকে অবশ্য বিচলিত দেখায়নি। শান্ত ভাবেই বুথ পরিদর্শন চালিয়ে যান তিনি।
দিনের শেষে শুভেন্দু যে দাবি করেছেন (১২৫টি আসন পাওয়ার), তাকে অবশ্য অনেকেই দ্বিতীয় দফার ভোটের জন্য দলীয় কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখার কৌশল হিসাবে ব্যাখ্যা করছেন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। অর্থাৎ, শুভেন্দুর দাবি অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় যে ১৪২টি আসনে ভোট, তার মধ্যে মাত্র ২৩টি আসন পেলেই বিজেপি সরকার গঠনের লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। দ্বিতীয় দফার ভোটে বিজেপিকে তুলনামূলক কঠিন আসনে লড়াই করতে হবে। যেগুলি তৃণমূলের ‘শক্ত ঘাঁটি’ হিসাবে পরিচিত। ফলে প্রথম দফায় বড় জয়ের ‘বার্তা’ দিয়ে দলীয় কর্মীদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন বিরোধী দলনেতা। শুভেন্দুর দাবির পাল্টা তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, তাঁরাও ১৫২টির মধ্যে ১৩২টি আসনে জয়ী হবেন।
অনেকের মতে, ভোটের দিন শুভেন্দুর ‘সংযত আচরণ’ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের ভূমি আন্দোলনের সময় থেকেই তাঁর আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধেও শুভেন্দুর আগ্রাসী চেহারাই দেখা গিয়েছিল। তার পরে গত পাঁচ বছরে বিধানসভায় তাঁর ‘আক্রমণাত্মক’ নেতৃত্বের জন্য একাধিক বার স্পিকার তাঁকে সাসপেন্ডও করেছেন।
সেই সূত্রেই ‘শান্ত’ শুভেন্দু অনেককে বিস্মিত করেছে। অনেকের মতে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চাপের কারণে তিনি কৌশলী হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে তেখালি এলাকার একটি বুথ পরিদর্শনে গিয়ে ভবানীপুর নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন শুভেন্দু। জবাবে তিনি বলেন, “এসআইআরের পর ভবানীপুর আমার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। তবে নন্দীগ্রামের ভোটের সময় আমি ৩০-৪০টি আসনে প্রচার করেছি। দ্বিতীয় দফায় এত জায়গায় যেতে পারব না। এখন ভবানীপুরেই বেশি মনোযোগ দিতে চাই।” এর পরেই নন্দীগ্রামের ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব স্থানীয় নেতা-কর্মীদের উপর ছেড়ে ভবানীপুরে রওনা দেন তিনি। আগামী বুধবার ‘মহারণ’।