অধীররঞ্জন চৌধুরী। —নিজস্ব চিত্র।
দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁকে অস্থির দেখিয়েছিল। ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনে মেজাজ হারিয়েছিলেন। তেড়ে গিয়েছিলেন। কষিয়ে দিয়েছিলেন চড়ও।
দু’বছর পর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই তিনিই ছিলেন খোলামেলা, হাসিখুশি। ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনেছেন। তবে মেজাজ হারাননি। গোটা প্রচারপর্বেও তিনি ছিলেন ধীরস্থির। প্রবল দাবদাহের মধ্যেও ‘কুল’।
দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। অতঃপর ৩০ বছর পরে তিনি আবার বিধানসভার লড়াইয়ে। সেই লড়াইয়ের আসল দিনে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রচারপর্বের মতোই ধীরস্থির রইলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। যদিও শেষবেলায় একাধিক বুথে কংগ্রেস কর্মীদের উপর হামলার খবর পেয়ে তাঁকে ছুটতে হল বহরমপুরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। ভোটের দিন সকাল থেকে অধীরকে যে মেজাজে দেখা গিয়েছিল, বিকালের পর তাতে কিছুটা তাল কাটে। যদিও লোকসভা ভোটের মতো মেজাজ হারাননি অধীর। কখনও কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মেজাজেই ছিলেন মুর্শিদাবাদের ‘রবিনহুড’।
সকাল সকাল কাশিমবাজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহরমপুরে নিজের বুথে গিয়ে ভোট দেন অধীর। তার পরে চলে যান বহরমপুর সংশোধনাগার লাগোয়া জেলা কংগ্রেসের দফতরে। তিনতলায় নিজের ঘরে কিছু ক্ষণ বসে ফের বেরিয়ে পড়েন ভোট দেখতে। পরনে গাঢ় হলুদ ফুলহাতা শার্ট, কালো ট্রাউজার্স, পায়ে কালো চামড়ার জুতো। বুথ থেকে বুথ ঘুরতে থাকেন। তার মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আবেদন করেন, ‘‘আপনারা সংবাদসংগ্রহ করুন। কিন্তু দয়া করে আমার সঙ্গে বুথে বুথে ঢুকে প়ড়বেন না। ততে সাধারণ ভোটারদের অসুবিধা হচ্ছে!’’ দুপুর গড়াতেই ভোট দেখে অধীরের কথায় তৃপ্তি ঝরে পড়ছিল। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার দরাজ প্রশংসা করেন প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা প্রাক্তন সাংসদ। অধীর বলেন, ‘‘এ বারে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনার জন্যই তৃণমূল বুথে বুথে আগের মতো ঝামেলা করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় বাহিনীও ভাল ভূমিকা পালন করছে। মানুষ নিশ্চিন্তে ভোট দিচ্ছেন।’’
কিন্তু বিকাল হতেই বহরমপুরের একাধিক জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করে, কোথাও ভোট খুব ধীরগতিতে হচ্ছে, কোথাও শেষবেলায় কংগ্রেসের পোলিং এজেন্টকে মেরে বার করে দেওয়া হয়েছে। খবর পাওয়া মাত্র কংগ্রেস অফিস থেকে গাড়ি ছুটিয়ে পৌঁছে যান অধীর। বহরমপুর বিধানসভার ১ নম্বর বুথ এলাকায় এক আক্রান্ত কংগ্রেস কর্মীর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেন। যান বুথেও। অভিযোগ করেন, অন্যত্র যখন প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছে তখন ওই বুথটিতে ভোট পড়েছে ৬৫ শতাংশ। অধীর বলেন, ‘‘তৃণমূল শেষবেলায় কিছু বুথ দখল করার চেষ্টা করছে। পুরোটা পুলিশ করাচ্ছে। আমরাও নজর রাখছি।’’
১৯৯৬ সালে প্রথমবার নবগ্রাম বিধানসভা আসন থেকে লড়েছিলেন অধীর। সেই পর্বে এক সিপিএম কর্মীকে খুনের মামলায় অধীরকে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল কলকাতায়। তাঁর কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে ক্যাসেটে বাজানো হয়েছিল নবগ্রামের মহল্লায় মহল্লায়। তার পর ১৯৯৯ সালে প্রথম লোকসভায় যেতেন। সেই থেকে টানা পাঁচ বার সাংসদ হন অধীর। কিন্তু গত লোকসভা ভোটে তিনি হেরে যান তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে। বহরমপুরের ভোটে অধীরের ভরসা তাঁর নিজস্ব ভাবমূর্তি, সহানুভূতির ভোট এবং স্থানীয় স্তরের সিপিএমের সমর্থন।
তিন দশক পর কি অধীর আবার বিধানসভায় যাবেন? শেষবেলায় কিছুটা ঝক্কি পোহাতে হলেও বৃহস্পতিবার দিনভর তাঁকে ধীরস্থিরই দেখিয়েছে। শেষকথা অবশ্য বলবে ৪ মে। ভোটগণনার দিন।