(বাঁ দিকে) দ্রৌপদী মুর্মু এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। (পিছনে) পুরুলিয়ার সভায় স্থানীয় তৃণমূল নেতা হংসেশ্বর মাহাতো ‘ভুল’ শুধরাতে যান মমতার কাছে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
অলচিকি ‘ভাষা’ নয়, লিপি। ভুল শোধরাতে গিয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধমক খেলেন পুরুলিয়ার দলীয় নেতা! সেই ঘটনার ভিডিয়ো পোস্ট করে এ বার আসরে নামল বিজেপি। মমতাকে আদিবাসী বিরোধী, সাঁওতাল বিরোধী বলে কটাক্ষ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে বিজেপির অমিত মালবীয়। দিন কয়েক আগে রাজ্যে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শিলিগুড়িতে তাঁর অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতিকে অপমানের অভিযোগ তুলেছিল বিজেপি। দ্রৌপদী নিজে আদিবাসী সমাজের মানুষ। তাই তৃণমূলকে আদিবাসী-তিরে বিদ্ধ করে বিজেপি। এ বার মমতার অলচিকি ‘ভুলকে’ হাতিয়ার করে সরব হল তারা।
শনিবার পুরুলিয়ার কাশীপুরে তৃণমূল প্রার্থী নির্মল টুডুর সমর্থনে জনসভা করেছিলেন মমতা। সেই সভায় মমতার আগে বক্তৃতা করেন নির্মল। তাঁর বক্তৃতার বড় অংশ ছিল সাঁওতালি ভাষায়। তার পরে মঞ্চে উঠে মমতা বলেন, ‘‘আমার আদিবাসী ভাই নির্মল টুডু এত সুন্দর করে অলচিকি ভাষায় তাঁর কথা বলে গেলেন। অলচিকি ভাষাটা একটু শক্ত আছে। আমি বুঝি, কিন্তু সবটা হয়তো বুঝতে পারি না। তবে অনেকটাই বুঝি। অলচিকি ভাষাতে এখন তো অভিধান বেরিয়ে গিয়েছে।’’ ঠিক তার পরই ছন্দপতন ঘটে।
মঞ্চে থাকা স্থানীয় তৃণমূল নেতা হংসেশ্বর মাহাতো মমতার কাছে এগিয়ে আসেন। এবং কিছু বলার চেষ্টা করেন। অনেকের দাবি, তিনি মমতার ‘ভুল’ শুধরে দিতে চেয়েছিলেন। অলচিকি ভাষা নয়, লিপি — সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বক্তৃতার মাঝে থামাতে যাওয়ায় ‘রেগে’ যান মমতা। কিছুটা পিছনে হটে ওই তৃণমূল নেতার উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘কথা বলবেন না, আমি যখন বলব। আমি জানি, আপনি বসুন, অলচিকি লিপি!’’ বিজেপি মমতার বক্তৃতার ওই অংশ সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে।
শুভেন্দু তাঁর পোস্টে মমতার বিরুদ্ধে আদিবাসী সমাজকে অপমান করার অভিযোগ তোলেন। তিনি লেখেন, ‘আদিবাসী সমাজের মানুষদের ডেকে এনে, তাদের সামনেই আপনি অলচিকি লিপির অপমান করে গেলেন। এটা সত্যিই ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়।’ একই সুরে পোস্ট করেন মালবীয়। হংসেশ্বরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘‘জঙ্গলমহলের কণ্ঠস্বরদের সঙ্গে কি এ ভাবে আচরণ করা যায়?’’
তবে বিজেপির এই ‘আক্রমণে’ আমল দিতে নারাজ পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল। তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘যিনি টুইট করেছেন, তিনিই বলেছিলেন বাংলা বলে কোনও ভাষা নেই। যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে সান্যাল বলেন, রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান শান্তিনিকেতন বলেন, যাঁদের নেতা মোদী সংসদে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বঙ্কিমদা বলেন, তাঁদের কাছে এসব নিয়ে কোনও কথা বাংলার মানুষ শুনবে না।’’
উল্লেখ্য, চলতি মাসের ৭ তারিখ আন্তর্জাতিক আদিবাসী সম্মেলনে যোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন মুর্মু। শিলিগুড়ির বিধাননগরে যেখানে তাঁর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেই স্থান পরিবর্তন করা হয়। নিরাপত্তার কারণে বাগডোগরার কাছে গোঁসাইপুরে রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। এই স্থান পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি পরে বিধাননগরে পৌঁছে সেখান থেকে রাজ্য প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। কেন মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভার কোনও সদস্য বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে যাননি, সেই প্রশ্নও তোলেন। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ভাবে রাষ্ট্রপতিকে অপমানের অভিযোগ তোলে বিজেপি। সরব হন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ কেন্দ্রীয় নেতা-মন্ত্রীরা। পশ্চিমবঙ্গের জনজাতি কল্যাণ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলায় সে সময় গর্জে উঠেছিলেন মমতা। অভিযোগ করেন, বিজেপির কথায় চলছেন রাষ্ট্রপতি। এই বিষয় নিয়ে চাপানউতর এখনও অব্যাহত। তার মধ্যেই মমতার ‘ভুল’ নিয়ে আবার সরব হল বিজেপি।