(বাঁ দিকে) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের রদবদল অব্যাহত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। একের পর এক আমলা এবং আইপিএস আধিকারিককে অপসারণ করা হচ্ছে। বলে দেওয়া হচ্ছে, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে তাঁদের আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না। তাঁরা ভোটের কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত থাকতেই পারবেন না। পরিবর্তে নতুন আধিকারিকদের নাম ঘোষণা করছে কমিশন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এই ঢালাও পরিবর্তন বুধবারও অব্যাহত। পাঁচ ডিআইজি এবং এক ঝাঁক জেলাশাসককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশন রায়গঞ্জ রেঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, জলপাইগুড়ি এবং প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের ডিআইজি পদে নতুন আধিকারিকদের নাম জানিয়ে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকেই তাঁদের দায়িত্ব নিতে হবে। নতুন জেলাশাসক নিয়োগ করা হয়েছে ১১টি জেলায়। বুধবার রাতে বিধাননগর এবং শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনারকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুরলিধর শর্মা এবং শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার ওয়াকার রাজ়াকে তামিলনাড়ুর পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হচ্ছে। অবিলম্বে তাঁদের নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক আইপিএস অফিসারকে ভিন্রাজ্যে ভোটের দায়িত্বে পাঠিয়েছে কমিশন। গত রবিবার বিকেলে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশন পশ্চিমবঙ্গ-সহ চার রাজ্য এবং এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে। এ রাজ্যের ২৯৪টি আসনে আগামী ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল দু’দফায় ভোট হবে। ভোটের ফল জানা যাবে ৪ মে। ভোটের সূচি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই কমিশনের রদবদল শুরু হয়েছে।
বুধবার একসঙ্গে রাজ্য পুলিশের পাঁচ জন ডিআইজি-কে অপসারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। রায়গঞ্জ রেঞ্জের ডিআইজি করা হয়েছে রাঠৌর ২০১৯ ব্যাচের আইপিএস অমিতকুমার ভরতকে। এই দায়িত্বে ছিলেন নিম্বালকর সন্তোষ উত্তমরাও। মুর্শিদাবাদের ডিআইজি পদে আনা হয়েছে ২০১১ ব্যাচের আইপিএস অজিত সিংহ যাদবকে। এত দিন মুর্শিদাবাদের ডিআইজি পদে ছিলেন সুধীরকুমার নীলাকান্তম। দিন কয়েক আগেই রায়গঞ্জ রেঞ্জের ডিআইজি পদ থেকে বদলি করে নিয়ে আসা হয়েছিল তাঁকে। এ বার কমিশন তাঁকে সরিয়ে দিল। জলপাইগুড়ির ডিআইজি ভোলানাথ পাণ্ডেকে সরিয়ে আনা হয়েছে ২০০৯ ব্যাচের আইপিএস অঞ্জলি সিংহকে। বর্ধমানের ডিআইজি পদে অলোক রাজোরিয়াকে সরিয়ে ২০১১ ব্যাচের আইপিএস শ্রীহরি পাণ্ডেকে আনা হয়েছে। প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের ডিআইজি-কেও বদলে দিয়েছে কমিশন। প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং তার আশপাশের অঞ্চল নিয়ে গঠিত। সেই রেঞ্জে নতুন ডিআইজি করা হল ২০০৭ ব্যাচের আইপিএস কঙ্করপ্রসাদ বারুইকে। এই রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন ভাস্কর মুখোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার মধ্যে নবনিযুক্ত আধিকারিকদের দায়িত্ব নিতে হবে।
১১টি জেলার জেলাশাসককে অপসারণ করেছে কমিশন। বুধবার নির্দেশিকা জারি করে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, দুই ২৪ পরগনা, দার্জিলিং এবং আলিপুরদুয়ারের নতুন জেলাশাসকের নাম জানানো হয়েছে। কোচবিহারে জিতেন যাদব, জলপাইগুড়িতে সন্দীপ ঘোষ, উত্তর দিনাজপুরে বিবেক কুমার, মালদহে রাজনবীর সিংহ কপূর, মুর্শিদাবাদে আর অর্জুন, নদিয়ায় শ্রীকান্ত পাল্লি, পূর্ব বর্ধমানে শ্বেতা আগরওয়াল, উত্তর ২৪ পরগনায় শিল্পা গৌরিসারিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অভিষেক কুমার তিওয়ারি, দার্জিলিঙে হরিচন্দ্র পানিকর এবং আলিপুরদুয়ারে টি বালাসুব্রহ্মণ্যমকে জেলাশাসক নিযুক্ত করা হয়েছে। এই জেলাগুলিতে যাঁরা জেলাশাসক পদে ছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকে জেলার নির্বাচনী আধিকারিকের দায়িত্বও পালন করছিলেন। নবনিযুক্তদের দায়িত্ব নিতে হবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টের মধ্যে।
কলকাতার দুই নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও)-কে বদল করেছে কমিশন। দিনকয়েক আগেই উত্তর কলকাতার ডিইও হিসাবে পুরসভার কমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ডিইও হিসাবে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসককে নিয়োগ করে কমিশন। তবে কলকাতার ক্ষেত্রে নিয়মটা আলাদা। কলকাতায় জেলাশাসক না-থাকায় কোনও দফতরের আইএএস পদমর্যাদার আধিকারিককে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনও পদাধিকারীর উপর দায়িত্ব থাকত না। তবে কমিশন জানায়, এ বার থেকে পুরসভার কমিশনারই উত্তর কলকাতার ডিইও নিযুক্ত হবেন। বুধবার পুর কমিশনার অংশুল গুপ্তের জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হল স্মিতা পাণ্ডেকে। আর দক্ষিণ কলকাতায় নতুন ডিইও করা হয়েছে রণধীর কুমারকে। তাঁদেরও বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টের মধ্যে দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে।
ভোটঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মীনাকে সরিয়ে দেয় কমিশন। বলা হয়, ভোটের কোনও কাজ তাঁরা করতে পারবেন না। পরিবর্তে রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব করা হয় দুষ্মন্ত নারিওয়ালাকে। স্বরাষ্ট্রসচিব পদে নিযুক্ত হন সংঘমিত্রা ঘোষ। ভোটের আগে পুলিশ ও প্রশাসনে রদবদল খুব বিরল না হলেও ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিবের মতো পদে পরিবর্তন সচরাচর দেখা যায় না। মধ্যরাতের এই অপসারণ নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। পরের দিন সংসদে তৃণমূলের তরফে কমিশনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। সেই সঙ্গে ধেয়ে আসে একের পর এক কটাক্ষবাণ। এর পর একে একে রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে সরানো হয়। ডিজিপি পদে পীযূষ পাণ্ডের পরিবর্তে আনা হয় সিদ্ধনাথ গুপ্তকে। কলকাতার সিপি পদে সুপ্রতিম সরকারকে সরিয়ে আনা হয় অজয় নন্দকে। রাজ্য পুলিশের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) এবং ডিজি (কারা) পদেও পরিবর্তন করা হয়েছে। এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) পদে ছিলেন বিনীত গোয়েল। তাঁকে সরিয়ে নতুন এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) করা হয়েছে অজয় মুকুন্দ রানাডেকে। ডিজি (কারা) পদে নিয়োগ করা হয়েছে নটরাজন রমেশ বাবুকে। পুলিশে আরও রদবদল হয়েছে। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে অপসারিত অফিসারদের অন্যত্র নিয়োগ করেছে নবান্ন।
মঙ্গলবার একধাক্কায় রাজ্যের ১২ জন পুলিশ সুপারকে বদল করে দেয় কমিশন। সরানো হয় কলকাতার ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কেও। এ ছাড়া চার পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার, এডিজি পদমর্যাদার দু’জন কর্তাকেও সরিয়েছে কমিশন। ইন্দিরার জায়গায় আনা হয়েছে ইয়েলওয়াড় শ্রীকান্ত জগন্নাথরাওকে। বীরভূম, ডায়মন্ড হারবার, পূর্ব মেদিনীপুর, কোচবিহার, মালদহ, পশ্চিম মেদিনীপুর, বারাসত, জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ, হুগলি (গ্রামীণ), ইসলামপুর, বসিরহাটের পুলিশ সুপারকে অপসারণ করা হয়েছে। বুধবার তাঁদের নতুন দায়িত্ব দিয়েছে নবান্ন। বুধবার রাতে বিধাননগর এবং শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনারকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুরলিধর শর্মা এবং শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার ওয়াকার রাজ়াকে তামিলনাড়ুর পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হচ্ছে। অবিলম্বে তাঁদের নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
ডিজিপি পদ থেকে সরানো পীযূষকে ডিজি (নিরাপত্তা অধিকর্তা) করা হয়েছে। কলকাতার সিপি সুপ্রতিমকে রাজ্যের এডিজি (সিআইডি) করা হয়েছে। কলকাতার এডিজি (আইবি) হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) পদ থেকে অপসারিত বিনীতকে রাজ্য আইবি-র ডিজি করা হয়েছে। এডিজি (সিআইডি) পদে থাকা লক্ষ্মীনারায়ণ মীনাকে এডিজি (কারা) হয়েছে। কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে। তাঁকে পাঠানো হয়েছে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (সিআইডি) স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট (এসএস) পদে। এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) পদ থেকে অপসারিত রাজীব মিশ্রকে পাঠানো হয়েছে এডিজি (সংস্কার ও সমন্বয়) করে। ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার ছিলেন প্রবীণকুমার ত্রিপাঠী। তাঁকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ-এর আইজি করা হয়েছে। একই দায়িত্ব পেয়েছেন আসানসোল-দুর্গাপুরের অপসারিত পুলিশ কমিশনার সুনীল কুমার চৌধরিকে। আইজি (উত্তরবঙ্গ) পদ থেকে অপসারিত সুকেশকুমার জৈনকে রাজ্য পুলিশের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) আইজি করা হয়েছে। আইবির ডিআইজি হচ্ছেন হাওড়ার অপসারিত পুলিশ কমিশনার আকাশ মাঘারিয়া এবং চন্দননগরের অপসারিত পুলিশ কমিশনার কোটেশ্বর রাওকে। আইবির স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে নিয়োগ করা হয়েছে ছ’জন অপসারিত আধিকারিককে। সেই তালিকায় রয়েছেন ইসলামপুরের অপসারিত পুলিশ সুপার জোবি থমাস, মালদহের অপসারিত পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরভূমের অপসারিত পুলিশ সুপার আমনদীপ, হুগলি (গ্রামীণ)-এর অপসারিত পুলিশ সুপার কামনাশিস সেন, মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার অপসারিত সুপার ধৃতিমান সরকার এবং জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার অপসারিত সুপার হোসেন মেহেদি রহমান। পূর্ব মেদিনীপুরের অপসারিত পুলিশ সুপার পারিজাত বিশ্বাস, ডায়মন্ড হারবারের অপসারিত পুলিশ সুপার বিশপ সরকার, কোচবিহারের অপসারিত পুলিশ সুপার সন্দীপ কাররা, বসিরহাটের অপসারিত পুলিশ সুপার আরিশ বিলাল এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের অপসারিত পুলিশ সুপার পলাশচন্দ্র ঢালিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ-এর পুলিশ সুপার করা হয়েছে। এ ছাড়া, বারাসতের অপসারিত পুলিশ সুপার প্রিয়ব্রত রায়কে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের ডিসি করা হয়েছে।