গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রবিবার বিকালে বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় ভোটগ্রহণ হবে বলে জানিয়েছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ হবে রাজ্যের ১৬টি জেলার মোট ১৫২টি আসনে। দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন হবে দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলার মোট ১৪২টি আসনে। দফাওয়াড়ি আসনভিত্তিক হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে, প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হবে, সেখানে গত তিনটি ভোটেই তৃণমূলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। আবার দ্বিতীয় দফার ভোট হবে গত দেড় দশক ধরে তৈরি হওয়া তৃণমূলের ‘দুর্গে’।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে রাজ্যে বিজেপির উত্থান ঘটেছিল। সেই থেকেই উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলকে বিজেপি-র গড় হিসাবে ধরা হয়। গত তিনটি বড় ভোটেই (২০১৯ সালের লোকসভা, ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট) তারা সেখানে সাফল্য পেয়েছে। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর ব্রিগেড সমাবেশেও উত্তরবঙ্গ থেকে ১৬টি ট্রেন ভাড়া করে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে এসেছিল বিজেপি। লোক এসেছিল জঙ্গলমহল থেকেও। আবার এ-ও ঠিক ২০১৯ সালের লোকসভার (১ নম্বর সারণি) পরে ২০২১ সালের বিধানসভা (২ নম্বর সারণি) এবং ২০২৪ সালের লোকসভা (৩ নম্বর সারণি) ভোটে উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলে শক্তি বৃদ্ধি করেছে তৃণমূল। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার এবং পশ্চিমাঞ্চলের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রাম লোকসভা আসন বিজেপির থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে জোড়াফুল শিবির।
গত তিনটি বড় ভোটের ফলাফলে একটি বিষয় স্পষ্ট, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলে পদ্মশিবির বেশ কিছুটা এগিয়ে। তবে দুই দিনাজপুরে তৃণমূল এবং বিজেপির কড়া টক্কর হয়েছে শেষ তিনটি ভোটেই। আবার যে দক্ষিণবঙ্গকে তৃণমূলের ‘পোক্ত জমি’ হিসাবে দেখা হয়, সেখানকার মতুয়া অধ্যুষিত নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার আসনগুলিতে পদ্মশিবিরের শক্তি মজবুত। এ-ও প্রণিধানযোগ্য যে, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে রয়েছে বীরভূমের ১১টি আসন। যে জেলা গত ১৭ বছর ধরে তৃণমূলের সাংগঠনিক প্রতাপ কার্যত অবিসংবাদী পর্যায়ে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, এই বীরভূমেই অনুব্রত মণ্ডলকে ভোট করানোর মুখ্য নেতা হিসাবে ধরা হত। গরুপাচার মামলার কারণে গত লোকসভা ভোটে সেই অনুব্রত জেলবন্দি ছিলেন। তা সত্ত্বেও তৃণমূল ব্যবধান বাড়িয়ে জেলার দু’টি লোকসভা আসনই জিতেছিল। বিজেপি শেষ দু’টি ভোটে শক্তি বাড়িয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরেও। সৌজন্যে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তেমনই মালদহ এবং মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়েছে ভোটের ফলাফলে। ২০১৯ সাল এবং ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বাম-কংগ্রেস যে কয়েকটি আসনে এগিয়ে থাকতে পেরেছিল, তা-ও তিনটি জেলাতেই সীমাবদ্ধ— উত্তর দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ।
প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হবে, ২০১৯ সালের লোকসভার নিরিখে তার মধ্যে ৮৪টি আসনে এগিয়ে ছিল বিজেপি। তৃণমূল এগিয়ে ছিল ৫৯টি আসনে। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভায় বিজেপি অনেকটা নেমে চলে আসে ৫৯টিতে। তৃণমূল বেড়ে হয় ৯২টি। আবার ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি এগিয়ে ছিল ৫৭টিতে। তৃণমূল দখলে রেখেছিল ৮৩টি আসন। অর্থাৎ, ২০২১ সালের তুলনায় তৃণমূলের আসন কমেছিল। প্রথম দফায় ভোট হবে যে ১৫২টি আসনে, সেখানে গত তিনটি ভোটের ফলাফল দেখলে স্পষ্ট, বিজেপি সবচেয়ে বেশি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল ২০১৯ সালের লোকসভায়— ৮৪টিতে। তার পরের দু’টি বড় ভোটের একটিতেও পদ্মশিবির নিজেদের গড়ে ৬০-এর উপর উঠতে পারেনি। এর মধ্যে দু’টি লোকসভাতেই বাম-কংগ্রেস এগিয়ে থেকেছে ১০-১২টি আসনে।
আবার দ্বিতীয় দফায় যে ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে, সেখানে তৃণমূল শেষ তিনটি বড় ভোটের সবকটিতেই ১০০-র উপর আসন পেয়েছে। ওই আসনগুলির মধ্যে ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৪ সালে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১০৫, ১২৩ এবং ১১৫টি। বিজেপি ২০১৯ সালে এগিয়ে ছিল ৩৭টিতে। ২০২১ সালে তারা জিতেছিল ১৮টি আসলে এবং ২০২৪ সালে এগিয়ে ছিল ২৭টিতে।
দফাওয়াড়ি আসনভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০১৯ সালেই রাজ্যে নিজেদের সেরা ফল করেছিল বিজেপি। তার পর ক্রমশ তারা কমেছে। আর তৃণমূল তাদের শক্তিশালী দুর্গে আসন বাড়িয়েছে। ২০২১ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে প্রথম দফার নির্বাচনের জন্য ঘোষিত ১৫২টি আসনের মধ্যে বেশিরভাগ আসনে এগিয়ে ছিল তৃণমূলই। রেখাচিত্র আঁকলে স্পষ্ট, নিজেদের গড়ে পতন হয়েছে বিজেপি-র। সেখানে মাথা তুলেছে তৃণমূল। অন্য দিকে, দক্ষিণবঙ্গে নিজেদের গড়ে জোড়াফুল শিবির আসনসংখ্যা প্রায় একই ভাবে ধরে রেখেছে। কখনও তা বেড়েছে। কখনও সামান্য কমেছে।
তবে এ-ও ঠিক যে, পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক নির্বাচন হয়েছে, যার ফলাফলের সঙ্গে অব্যবহিত আগের ভোটগুলির ফলাফলের কোনও মিল ছিল না। ১৯৭৭ সালের যে নির্বাচনে বামেরা প্রথম সরকারে এসেছিল, তার আগের ভোটগুলির ফলাফল দেখলে আন্দাজ করা মুশকিল যে, কংগ্রেস সরকার থেকে চলে যেতে পারে। যদিও বামেরা সরকারে আসার সেই ভোটের আগেই দেশে জরুরি অবস্থার মতো পর্যায় ঘটে গিয়েছিল। আবার বামেরা যখন ক্ষমতার মধ্য গগনে, তখন ১৯৯৮ সালে তৃণমূল তৈরি হওয়ার পরে অল্পদিনের ব্যবধানে হওয়া কয়েকটি লোকসভা এবং ২০০১ সালের বিধানসভা ভোটে বামেদের ঝাঁকুনি দিয়েছিল। ২০০৪ সালের লোকসভা এবং ২০০৬ সালের বিধানসভায় বামেরা যে ঐতিহাসিক ফলাফল করেছিল, তার সঙ্গে ২০০৯ সালের লোকসভার ফলের কোনও মিল ছিল না। পরিস্থিতি বদলের সঙ্কেত মিলেছিল ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটেই। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে ৩৪ বছরের ক্ষমতার সৌধ ভেঙে পড়ে। এ বারে তৃণমূলকেও নির্বাচনে যেতে হচ্ছে ১৫ বছরের স্থিতাবস্থা বিরোধিতাকে কাঁধে নিয়ে। একই সঙ্গে এ-ও বাস্তব, এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকায় সংস্কার হওযার পর প্রথম নির্বাচন হতে চলেছে।