ব্রিগেডের মঞ্চে দিলীপ ঘোষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সহাস্য কথোপকথন। ছবি: ভিডিয়ো থেকে নেওয়া।
তিনি ব্রিগেড সমাবেশের মঞ্চে ওঠামাত্রই সঞ্চালক তথা রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় ‘বিশেষ গুরুত্ব’ সহকারে ঘোষণা করেছিলেন তাঁর আগমনবার্তা। জমায়েত হইহই রবে সাড়া দিয়েছিল। তাঁর নাম বক্তা হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পরেও আবার সেই একই উল্লাস দেখা গিয়েছিল। তৃতীয় বার তার চেয়েও বড় হর্ষধ্বনির অবকাশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সে বার কথাগুলো মাইকে শোনা যায়নি। তাই রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা মেদিনীপুরের প্রাক্তন সাংসদ দিলীপ ঘোষকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শনিবার ব্রিগেডের সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে কী বলেছেন, সে কথা জনতা শুনতে পায়নি। কিন্তু যাঁরা সামনে দাঁড়িয়ে সে সংলাপ শুনেছেন, তাঁরা আপ্লুত।
ভাষণ শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার আগে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই অল্পবিস্তর কথা বলতে বলতে এবং সৌজন্য বিনিময় করতে করতে এগোচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। দিলীপের সামনে এসে তিনি একটু থমকে দাঁড়ান। এক মিনিটের মতো কথোপকথন হয়। মোদীর কথা শুনে দিলীপের আশেপাশে প্রত্যেকে যে আহ্লাদিত, তা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। কৌতূহল তৈরি হয় তখনই। বিষয়টি বিজেপি নেতারাও পরে গোপন না-করায় সে কথোপকথন প্রকাশ্যে এসেছে। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতোর কথায়, ‘‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে অনেক দিন পরে দেখা হলে যে ভাবে কথা হয়, দিলীপদার সঙ্গে মোদীজি ঠিক সে ভাবেই কথা বলেছেন।’’
‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ না-হলেও মোদী এবং দিলীপ উভয়েই আরএসএসে দীর্ঘ প্রচারক জীবন কাটিয়ে বিজেপিতে এসেছেন। মোদী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে দিলীপ সাংসদও ছিলেন। এ হেন দিলীপকে করবদ্ধ অবস্থায় সামনে পেয়ে শনিবার মোদী তাঁর হাত ধরেন। তার পরে বলেন, ‘‘বিয়ে করলে লোকে মিষ্টি অন্তত খাওয়ায়। তুমি তো সেটুকুও খাওয়ালে না।’’ এ কথা শুনে বাকিরা হেসে উঠলেও দিলীপ দৃশ্যতই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েন। পাশ থেকে জ্যোতির্ময় বলে ওঠেন, ‘‘আমাদেরও দিলীপদা মিষ্টি খাওয়াননি।’’ তবে গোটা পর্ব শেষে দিলীপও আপ্লুত। আনন্দবাজার ডট কমকে তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, নির্বাচন মিটে গেলে দিল্লি গিয়ে মিষ্টি খাইয়ে আসব।’’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিলীপের এই সংলাপ সংক্ষিপ্ত হলেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে অনেকের মত। দিলীপের বিবাহের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরএসএস এবং বিজেপির একাংশের বিরূপ মতামত ছিল বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। সে বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। তবে বিয়ের অব্যবহিত পরে মুখ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দিলীপ সস্ত্রীক দিঘায় গিয়ে জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন পর্বে শামিল হওয়ায় দল দিলীপের বিরুদ্ধে মুখ খোলে। তার পরে অন্তত আট মাস দলীয় কর্মসূচিতে দিলীপ ডাক পাচ্ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছিল না। শনিবারের ব্রিগেড সমাবেশে সে গ্লানি মুছে গেল। প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশমঞ্চে দিলীপ শুধু স্থানই পেলেন না, ভাষণও দিলেন। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে দিলীপের বিবাহ সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই মধুর সংলাপ রেখে গেলেন।
তথ্যাভিজ্ঞ মহল বলছে, গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক জমায়েতে মোদীর যে সব কথোপকথন বা সৌজন্য বিনিময় চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে, সেগুলির প্রত্যেকটিই ‘সচেতন’ ভাবে ঘটানো হয়। অর্থাৎ মোদী ‘সচেতন’ ভাবেই ওই সব দৃশ্যপট তৈরি করেন, কোনওটিই বেখেয়ালে তৈরি হয়ে যাওয়া দৃশ্য নয়। শনিবার ব্রিগেডে মোদী অন্তত পাঁচ বার তেমন দৃশ্য তৈরি করেছেন। প্রথমেই মঞ্চে বসে থাকাকালীন মিঠুন চক্রবর্তীকে নিজের পাশের চেয়ারে ডেকে নিয়ে আলাদা করে কিছু ক্ষণ কথা বলেন। ভাষণ শেষ করার পরে শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার এবং শমীক ভট্টাচার্যের সামনে দাঁড়িয়ে মিনিটখানেক কথাবার্তা চালান। কী কথোপকথন, সে বিষয়ে তিন জনের কেউই মুখ খোলেননি। এর পরে মোদী দিলীপের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তার পরে তথাগত রায় এবং অশোক লাহিড়ির সঙ্গেও চোখে পড়ার মতো করে কথা বলতে দেখা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে।
রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা মেঘালয় ও ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত ছিলেন শনিবারের মঞ্চে প্রবীণতম বিজেপি নেতা। মোদীর সঙ্গে কথাপোকথন প্রসঙ্গে তথাগত মুখ খুলতে চাননি। তিনি বলেন, ‘‘কিছু ব্যক্তিগত আলোচনা হয়েছে। তা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করব না।’’ তথাগতের কথায়, ‘‘যে কথাগুলো হয়েছে, তা একেবারেই রাজনৈতিক নয়, এমন কথা বলছি না। তবে কথাগুলো ব্যক্তিগতই।’’ অর্থনীতিবিদ তথা বালুরঘাটের বিধায়ক অশোক অবশ্য বলছেন, তাঁর সঙ্গে মোদীর কোনও রাজনৈতিক কথা হয়নি। অশোকের কথায়, ‘‘আমার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর আলাপ তো দু’আড়াই দশক আগে। একসঙ্গে কাজও করেছি। এত দিনের পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে আলাদা করে কথা বলাটাই ভদ্রলোকেদের সৌজন্য। নরেন্দ্র মোদী সেটাই করেছেন। কুশল বিনিময় হয়েছে। তবে ওখানে কোনও রাজনৈতিক কথা হয়নি।’’