Modi’s Brigade Rally LIVE

শুধু ‘পরিবর্তন’ নয়, তার পরে খুঁজে খুঁজে হিসাব নেওয়া হবে! ব্রিগেডের সমাবেশ থেকে বিরল হুঁশিয়ারির স্বর প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে

মিনিট পঁয়তাল্লিশের ভাষণের সাত মিনিটের মাথাতেই মোদীর কণ্ঠে প্রথম বার হুঁশিয়ারির সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, ‘‘সেই দিন দূরে নয়, যখন পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন হবে।’’ তার পরেই বলেন, ‘‘কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না।’’

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ২০:২১
Will settle score with everyone: PM Modi hints at taking steps against all those who are atrocious against BJP from Brigade Rally

ব্রিগেডের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত।

তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণগুলির প্রতিটিতেই ‘পরিবর্তন’-এর আহ্বান ছিল, তৃণমূলের ‘মহাজঙ্গলরাজ’ উৎখাত করার ডাক ছিল। তৃণমূলের কারণে পশ্চিমবঙ্গে কী কী থমকে রয়েছে, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী কী বদলে যাবে, সে সব কথাও বার বার শুনিয়েছেন শেষ ছ’টি জনসভায়। কিন্তু শনিবার ব্রিগেড সমাবেশে তার সঙ্গে জুড়ে গেল বিরল হুঁশিয়ারির সুর। শুধু ক্ষমতার অলিন্দে ‘বদল’ নয়, বদলের পরে অনেকের ‘হিসাব’-ও নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একবার নয়। অন্তত তিন বার সেই হুঁশিয়ারি শোনা গেল মোদীর ভাষণে।

Advertisement

যা থেকে স্পষ্ট যে, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার অব্যবহিত আগে বিজেপির ‘রাজনৈতিক ভাষ্য’ কিছুটা বদলে গেল। যার ফলে রাজ্যে রাজনীতির পারদ আরও চড়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হল। প্রসঙ্গত, শনিবারের ব্রিগেড সমাবেশ রাজ্য বিজেপির এ যাবত ‘সফলতম’ সমাবেশ বলে মনে করা হচ্ছে। ভিড় হয়েছিল বিপুল। এবং সে ভিড় ছিল সংগঠিত। বাসে করে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে লোক নিয়ে আসা হয়েছিল। পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গ থেকে ১৬টি ট্রেন ভাড়া করে তাতে করে লোক আনা হয়েছিল। এই ভিড় যদি রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাপকাঠি হিসাবে ধরা হয়, তা হলে সে কাজে নেতারা সফল হয়েছেন। তবে ব্রিগেড ভরানো ভিড় হলেই যে তা ভোট বাক্সে যায়, তা নয়। অতীতে সিপিএম আমলে বিপুল ভিড়ের ব্রিগেড সমাবেশ করেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটে জেতেননি। আবার ব্রিগেড ভরানো সমাবেশ করেও ভোটের হালে পানি পায়নি সিপিএম। তবে শনিবার দুপুরের পর থেকে ময়দান-কেন্দ্রিক এলাকা দৃশ্যতই ভিড়বাহী বাস এবং ভিড়ের দখলে চলে গিয়েছিল।

রাজ্য জুড়ে বিজেপি যে ‘পরিবর্তন যাত্রা’র ডাক দিয়েছিল, শনিবার তারই আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি পর্ব ছিল ব্রিগেডে। ১ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১০ মার্চ পর্যন্ত ‘যাত্রা’ চলেছে জেলায় জেলায়। তার পরে কলকাতায় ফিরে এসে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব মনোনিবেশ করেছিলেন ব্রিগেড সমাবেশের প্রস্তুতিতে। সেই সমাবেশ তথা ‘যাত্রা’র পরিসমাপ্তিতে এসে মোদী প্রথমেই দরাজ প্রশংসা করলেন জমায়েতের। ভাষণের শুরুতেই বললেন, ‘‘যত দূর চোখ যাচ্ছে, শুধু মানুষ আর মানুষ।’’ বললেন, ‘‘এই সমাবেশ আটকাতে তৃণমূল সব রকম অস্ত্র বার করেছে। সেতু আটকেছে, রাস্তা বন্ধ করেছে, ট্র্যাফিক জ্যাম করে দিয়েছে, গাড়ি আটকেছে, পোস্টার ছিঁড়েছে, পতাকা খুলে দিয়েছে। কিন্তু নির্মম সরকার দেখে নাও, তোমরা কাউকে দমিয়ে রাখতে পারোনি। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে।’’

বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত। শনিবার বিগ্রেডে।

বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত। শনিবার বিগ্রেডে। ছবি: সংগৃহীত।

মিনিট পঁয়তাল্লিশের ভাষণের সাত মিনিটের মাথাতেই মোদীর কণ্ঠে প্রথম বার হুঁশিয়ারির সুর শোনা গেল। তিনি বললেন, ‘‘সেই দিন দূরে নয়, যখন পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন হবে।’’ তার পরেই বলেন, ‘‘কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না। খুঁজে খুঁজে হিসাব নেওয়া হবে।’’ অর্থাৎ, রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে বদল যদি হয়, তা হলে ‘অত্যাচার’-এর ‘বদলা’-ও যে হবে, সে বার্তা স্পষ্ট ভাবেই দিয়ে দিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।

মোদীর ভাষণের আধ ঘণ্টার মাথায় আরও একবার ‘অপরাধী’দের জেলে পাঠানোর ‘গ্যারান্টি’ দেন মোদী। ‘অপরাধী’ বলতে যে তৃণমূলকেই বোঝাচ্ছেন, তা হুঁশিয়ারির আগে ব্যাখ্যাও করে দেন। পিএম বিশ্বকর্মা, পিএম সূর্ষঘর, আয়ুষ্মান ভারত এবং চা-বাগান শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে না-দেওয়া নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নির্মম সরকার’কে (মমতার নাম না করে) আক্রমণ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার নাম বদলে দেওয়া এবং প্রাপক তালিকায় ‘গড়বড়’ করার অভিযোগ তুলে ধরে তোপ দাগেন। জলজীবন মিশনে অন্য রাজ্যগুলিতে ঘরে ঘরে নলবাহিত জল পৌঁছোলেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এখনও সে সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘তৃণমূলের একটাই লক্ষ্য— কোনও কাজ করবে না, করতেও দেবে না। যতক্ষণ না এদের কাটমানি জুটবে, ততক্ষণ কোনও প্রকল্পের সুবিধা গ্রামে বা গরিবের কাছে পৌঁছোতে দেবে না।’’ এরই পাশাপাশি মোদী সরব হন কর্মসংস্থানের বিষয়ে এবং নারীসুরক্ষা নিয়ে। দুই প্রসঙ্গেই একটি করে বাংলা বাক্য বলেন। পশ্চিমবঙ্গের যুবক-যুবতীরা পড়াশোনা শেষে পশ্চিমবঙ্গেই কাজ পাবেন, সে ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিতে গিয়ে বাংলায় মোদী বলেন, ‘‘এই স্বপ্ন আপনার। আর এই স্বপ্ন পূরণ করা মোদীর গ্যারান্টি।’’ মেয়ের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মোদী বলেন, ‘‘বাবা-মায়ের মেয়েদের এখন বলেন— বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে (বাক্যের শেষাংশ বাংলায়)।’’ সেই মন্তব্যের সূত্র ধরেই প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ‘‘বিজেপির সরকার হলে অপরাধীরা জেলে থাকবে। এটা মোদীর গ্যারান্টি।’’

তৃতীয় বার মোদীর মুখে হুঁশিয়ারি শোনা গিয়েছে ভাষণের ৩৭ মিনিটের মাথায়। তিনি বলেছেন, ‘‘তৃণমূল সরকারের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। এখানে বিজেপির সরকার গঠিত হওয়ার পরে আমরা এক দিকে ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’ নীতি নিয়ে চলব। অন্য দিকে প্রত্যেকের হিসাব নেওয়া হবে।’’ এখানেই থামেননি প্রধানমন্ত্রী। ব্রিগেডে ভরা জমায়েতের উদ্দেশে বলেছেন, ‘‘যারা আপনাদের ভয় দেখায়, তাদের ভয়ের দিন শুরু হতে চলেছে। যারা অপরাধী, যারা অনুপ্রবেশকারী, যারা তোষণের রাজনীতিকারী, তাদের একটাই জায়গা— জেল!’’

পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বা তৃণমূলকে লাগাতার আক্রমণ করলেও মমতার নাম বা ‘দিদি’ শব্দ একবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি মোদী। বার বার বলেছেন ‘নির্মম সরকার’ (‘মমতা’ শব্দের বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে)। তবে মমতার একটি সাম্প্রতিক মন্তব্য তুলে ধরে আক্রমণ শানাতে ছাড়েননি। ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা সেই মন্তব্যটি করেছিলেন। মোদী সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘‘কোন সম্প্রদায় কোটি কোটি লোককে শেষ করে দেবে? আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, সেই সম্প্রদায় কারা, যারা তৃণমূলের কথায় কোটি কোটি লোককে শেষ করবে?’’ নাম না-করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের একটি মন্তব্যের বিরুদ্ধেও তোপ দাগেন মোদী। ঘটনাচক্রে, মহুয়াও সেই মন্তব্য মমতার ধর্নামঞ্চ থেকেই করেছিলেন। মোদী বলেন, ‘‘এঁরা বলছেন, কেউ তৃণমূলকে ভোট না-দিলে তিনি নাকি বাঙালি নন! কিন্তু তৃণমূলের গুন্ডামির দিন এ বার শেষ হতে চলেছে।’’

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ প্রসঙ্গে আগেও মুখ খুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রত্যাশিত ভাবেই শনিবার ব্রিগেডের মঞ্চে দাঁড়িয়েও আবার সে প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন তিনি। ঘটনাটিকে আদিবাসীদের, দেশের সর্বোচ্চ চেয়ারের, সংবিধানের এবং বাবাসাহেব অম্বেডকরের ‘অপমান’ বলে বর্ণনা করেছেন। দেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজ্য সরকার তথা তৃণমূলের সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনেও মোদী তোপ দেগেছেন। দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও তৃণমূল এই ধরনের আচরণ করে বলে দাবি করে মোদী বলেছেন, ‘‘২০১৯ সালে ভারতীয় বায়ুসেনা যখন বালাকোটে এয়ারস্ট্রাইক করেছিল, তখন তৃণমূল তার প্রমাণ চেয়েছিল!’’ তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে যে ‘অরাজক’ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, দিল্লি পর্যন্ত তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন মোদী। উদাহরণ হিসাবে সংসদে তৃণমূলের ভূমিকার কথা মনে করিয়েছেন। সব শেষে ফের ব্রিগেডের জমায়েত নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘‘এই জনস্রোত পশ্চিমবঙ্গে জাগতে থাকা চেতনার প্রমাণ। অনেক বছর এর অপেক্ষা চলছিল। এ বার পরিবর্তন হবেই।’’ প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘‘এ বারের নির্বাচন শুধু সরকার বদলানোর নির্বাচন নয়। এ বারের নির্বাচন বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর নির্বাচন। ভয় কাটানোর নির্বাচন। ব্যবস্থা বদলানোর নির্বাচন।’’

Advertisement
আরও পড়ুন