ভোট না দেওয়ার অভ্যাস কি সমর্থনযোগ্য? ছবি: সংগৃহীত।
রাজ্য জুড়ে ভোটের আমেজ। গণতান্ত্রিক অধিকারের উৎসবে মেতেছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। প্রথম দফার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে ইতিমধ্যেই। তবে সবাই কি এই ‘উৎসবে’ শামিল হন? কেউ কেউ হয়তো পরিস্থিতির কারণে ভোট দিতে পারেন না। কিন্তু, এমন অনেকেই আছেন যাঁরা, স্বেচ্ছায় ভোটপ্রক্রিয়ায় যোগ দেন না। তার নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সর্বত্রই এমন শিক্ষিত সচেতন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা ভোটদানে বিরত থাকেন। সেই ভাবে দেখতে গেলে, ভোট দেওয়া যেমন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার, তেমনই ভোট না দেওয়াও তো নাগরিকের অধিকার। বাংলার বিভিন্ন ক্ষেত্রের তারকারা ভোট না দেওয়ার এই বিষয়টিকে কী ভাবে দেখেন?
ভোট দেওয়া দেশবাসী হিসাবে অবশ্য কর্তব্য, মনে করেন অভিনেত্রী ইন্দ্রাণী হালদার। তাঁর কথায়, “ভোট দেব না, বাড়িতে বসে থাকব— এই মনোভাবে আমার আপত্তি আছে। সেখানে ছাপ্পা পড়তে পারে, তা হলে কেন এমন করব? আমারও দু’এক জন বন্ধু আছেন, যাঁরা বলেন, ‘ধুর কী হবে! কে যাবে ভোট দিতে?’ আমি একেবারেই এই মনোভাব সমর্থন করি না।” তিনি নিজে আজ পর্যন্ত একটা ভোটও বাদ দেননি। ইন্দ্রাণী বলেন, “কাজের সূত্রে মুম্বইয়েও যখন থাকতাম, ভোটের সময়ে রাজ্যে ফিরতাম। ভোট দিয়ে আবার মুম্বই ফিরে যেতাম।”
একই মত পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর। তাঁর কথায়, “গণতান্ত্রিক দেশে ভোট দেওয়া খুব জরুরি। সরকারে কারা আসবেন, রাজ্য ও দেশ কারা চালাবেন— সব সিদ্ধান্তই তো আমাদের! আমি মনে করি, ভোট দিতে যাওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নৈতিক জায়গা থেকে এর তাৎপর্য আছে। অনেকেই বলেন, ‘ধুর! ভোট দেব না।’ এ ধরনের মন্তব্য আমার দায় এড়ানো বলে মনে হয়। দেশের ভবিষ্যতের জন্য, পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য, নিজেদের জন্য আমাদের ভোট দেওয়া উচিত।” পরিস্থিতির চাপে মাঝে দু’বছর ভোট দিতে পারেননি তিনি। কষ্ট পেয়েছিলেন। তাই পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, ভোট দেওয়া উচিত বলে মনে করেন পরিচালক। তাঁর মতে, “এটা আমাদের কর্তব্য এবং দায়িত্ব।”
কেউ ভোট দিতে না চাইলে, সেটাও তাঁর অধিকার। তবে সেটার চেয়ে ভোট দেওয়ার অধিকারকেই এগিয়ে রাখতে চান অভিনেত্রী-পরিচালক মানসী সিংহ। বন্ধুর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমার এক বন্ধু তো বহু বছর ধরে নোটা চিহ্নে ভোট দেয়। তার কোনও প্রার্থীকেই পছন্দ হয় না। এটাও তার অধিকার। তা সত্ত্বেও, ভোট না দেওয়ার অধিকারের থেকে ভোট দেওয়ার অধিকারকে আমি এগিয়ে রাখব। কারণ, আমি জানি যে সরকারই আসবে, সে আমারই ভাল করার জন্য আসবে। রাজ্যের তো আলাদা অবয়ব নেই, আমাদের নিয়েই রাজ্য তৈরি। তো সেই সরকারকে আমি নির্বাচন করে নিয়ে আসছি, এই ভাবনার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ কাজ করে। কিন্তু যে মানুষটা ভোট দিতে চান না, তিনি তো সরকারের দেওয়া সুবিধা নেওয়া থেকে পিছপা হন না! এই মানসিকতায় আমি বিশ্বাসী নই।” প্রত্যেক বছর নিয়ম করে ভোট দেন মানসী। তাঁর পছন্দের প্রার্থী জিতুন না জিতুন, তাঁর একটা ভোট যেন সেই প্রার্থীর পক্ষেই পড়ে, সেটা নিশ্চিত করেন।
তবে সবাই যে ভোট দেওয়ার পক্ষে, তেমন নয়। এই ইন্ডাস্ট্রিরই অনেকে ভোট দেন না। যেমন, সঙ্গীতশিল্পী শিলাজিৎ। ভোট যদি ‘উৎসব’ হয়, তাতে তিনি যোগ দিতে পছন্দই করেন না। সপাট বলেন, “ভোট দিতে আমি যাই না তো। ভোটের দিনটা যদি আমাদের দিন হয়, তা হলে প্রতিটি নাগরিক যাতে সুস্থ ও সুষ্ঠু ভাবে ভোট দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা উচিত। আমার তো মনে হয়, বাড়ি থেকে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত। ওই কালঘাম ছুটিয়ে ভোট দিতে যাওয়া আমার কোনও দিনই পছন্দ নয়।” তিনি ভোট না দিলে তাঁর নামে যদি ছাপ্পা হয়ে যায়? তাতে অবশ্য বিশেষ মাথাব্যথা নেই শিল্পীর। রসিকতা করে বলেন, “যিনি ঝুঁকি নিয়ে, লোকের চোখ এড়িয়ে এসে ছাপ্পা দিচ্ছেন, তিনি নিশ্চয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, বিপ্লব করতে চাইছেন। ছোটবেলায় ভোট নিয়ে উন্মাদনা ছিল, কাকুর সঙ্গে এক বার ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলাম। বাচ্চা বলে এমনিই আঙুলে দাগ লাগিয়ে দিয়েছিল। বন্ধুদের দেখিয়ে বলেছিলাম, ‘দেখ, ভোট দিয়েছি।’ কিন্তু বড় হওয়ার পরে সেই উন্মাদনা নেই। অন্য লোকে ক্ষমতা নিয়ে ঘুরবে, তার জন্য আমি কেন ভোটে যোগ দেব? জানি না। ভোটের দিনটা আমার কাছে বেশ একটা ছুটির দিন।”
অন্য দিকে, ভোটের দিন বেশ ভয়েই থাকেন অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়! তাই তিনিও ভোট দেওয়া এড়িয়েই চলেন। অভিনেতা বলেন, “আমি এখন আর ভোট দিতে চাই না। কারণ, আমার ভয় লাগে। চারপাশে সেনাবাহিনীর কড়া পাহারা, বন্দুকের নল যেন তাক করা— দেখলেই মনে হয় যেন কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গিয়েছি। সত্যি বলতে চারপাশে শুধু হানাহানি দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত। এই নির্বাচনেও ভোট দেব কি না, ভেবে দেখব। না দেওয়ার ইচ্ছেটাই বেশি। কারণ, ভোট দিতে গিয়ে যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তার দায় কে নেবে? আসলে আমার প্রাণ গেলে আমার পরিবার ছাড়া আর কারও বিশেষ ক্ষতি হবে না। ওদের কে দেখবে?”
তবু প্রতি বার নিয়ম করে ভোট আসে। সরকার তৈরি হয়। কারও তা পছন্দের, কারও নয়। গণতন্ত্রের শর্তই তো তা-ই। বহু মতের সমাহার। পাশাপাশি, ব্যতিক্রমও তো গণতন্ত্রের এক বৈশিষ্ট্য। কিছু কিছু মানুষ সেই অন্য পথেই হাঁটতে ভালবাসেন, মূলধারার মানুষ সেই পথকে যৌক্তিক মনে করুন বা না করুন। গণতন্ত্র তো এই সকলকে নিয়েই পূর্ণতা পায়।