Change Of Reel Villain

গালে ব্রণর দাগ, ঝাঁকড়া চুল অতীত? পর্দায় দাপট ‘সুন্দর’ খলনায়কদের! টলিউড কি বদলে গেল?

ঝাঁ চকচকে চেহারা তাঁদের। দেখলেই প্রেমে পড়ছেন এই প্রজন্ম! তাঁরাই নাকি ‘দুষ্টু লোক’? ওঁদের কীর্তিকাণ্ড দেখে শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৯
নবনীতা মালাকার, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায়।

নবনীতা মালাকার, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।

মোটেই তাঁদের গালে ব্রণের ক্ষত নেই। চেহারাও দশাসই নয়! রীতিমতো চর্চা করা চাবুকের মতো ধারালো শরীর। চোখে রিমলেস চশমা। ঝাঁকড়া চুলে আধুনিক ‘ডিজ়াইনার’ ছাঁট। কেতাদুরস্ত পোশাকআশাক। এঁদের দেখে প্রেমে পড়ে যাচ্ছেন এই প্রজন্ম।

Advertisement

আর তাঁরা? ভাল-মন্দ বোঝার আগেই হাসতে হাসতে পিছন থেকে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছেন!

এঁরা নায়ক না খলনায়ক? বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এঁরাই এখন বাংলা বিনোদনদুনিয়ায় হাড়হিম ‘ভিলেন’! নায়কের থেকেও সুদর্শন। দর্শক ছবি, সিরিজ় বা ধারাবাহিকে এঁদের দেখার পর ভয় করবেন না আকৃষ্ট হবেন— বুঝতে পারছেন না! কিছু দর্শক রীতিমতো মানসিক আঘাত পাচ্ছেন। যাঁকে এত দিন ‘হিরো’ দেখেছেন, তিনি ‘খলনায়ক’ হতেই ধিক্কার জানাচ্ছেন। মুখোমুখি হলে কৈফিয়তও চাইছেন, “কেন এই ধরনের চরিত্রে আপনি? সাহিত্যধর্মী গল্পের নায়ক হতে পারেন না!”

এঁরা সাহেব চট্টোপাধ্যায়, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌম্য মুখোপাধ্যায়, নবনীতা মালাকার, শ্বেতা মিশ্র। এঁরা নায়ক বা নায়িকা হননি, এমন কিন্তু নয়! শ্বেতাই তো এখন ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের নায়িকা ‘কুইন’। এই চরিত্রে পা গলানোর আগে তিনি কিন্তু ‘সেরা খলনায়িকা’র সম্মান ঝুলিতে পুরেছেন।

টলিউডে ‘খলনায়ক’-এর খোলনলচে কি বদলে গেল? কেতাদুরস্ত ‘ভিলেন’ই কি এখন ট্রেন্ড?

আনন্দবাজার ডট কম কথা বলেছিল সাহেব, দুই সৌম্য, নবনীতা, শ্বেতার সঙ্গে। সাহেব এই মুহূর্তে নায়ক হিসাবে যত না জনপ্রিয়, খলনায়ক হিসাবে তার চেয়েও বেশি! হতেই পারে সেটি ‘মিতিন: একটি খুনির সন্ধানে’, ‘সরলাক্ষ হোমস’-এর মতো ছবি। হতেই পারে সেটি ‘বিজয়া’ বা ‘অনুসন্ধান’-এর মতো সিরিজ়। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তিনি ‘বুদ্ধিজীবী শয়তান’। প্রসঙ্গ তুলতেই ফোনের ও পারে দরাজ হাসি। সাহেব ব্যাখ্যা দিলেন, “আগে গল্পে অনেক অবাস্তব ব্যাপার দেখানো হত। যেমন, একজনই চোদ্দ জনকে পিটিয়ে পাট পাট করে দিচ্ছে! সেটা তো বাস্তবে ঘটে না। এখনকার গল্পে তাই বাস্তবতার ছোঁয়া। ফলে, ভিলেনিতেও পালাবদল ঘটেছে।” স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের বিপরীতে সাহেব যখন পুরোদস্তুর ‘ভিলেন’ দর্শক আঁতকে উঠেছেন। একই ভাবে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় বা কোয়েল মল্লিকের সঙ্গে তাঁকে এ ভাবে দেখেও প্রতিক্রিয়া। অভিনেতাকে ডেকে দর্শক বলেছেন, “অত সুন্দর দেখতে একজন মানুষ এত খারাপ হতে পারে!” সাহেবের দাবি, “বাস্তবে সেটাই হয়! আমরা যাঁদের দেখে খুব ভাল মনে করি, তাঁরাই আসল কালপ্রিট।”

সৌম্য মুখোপাধ্যায়। তিনি মানেই যেন ‘প্রেমটেম’ বা ‘চিনি ২’-এর মায়াবি ভালবাসা। প্রেমিকের চোখে তাঁর ‘আস্পদ’-এর প্রতি একাধারে গভীর প্রেম আর আকণ্ঠ তৃষ্ণা! “পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘পারিয়া’ ছবিতে আমার এই চোখ দুটোই চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বাস্তবে প্রেমিক আর খুনির চোখের দৃষ্টিতে কোনও পার্থক্য নেই’!” তাই ‘পারিয়া’য় হাড়হিম কষাইয়ের ভূমিকায় অভিনয়ের পরেও তিনি পরের ছবিতে দিব্য রোম্যান্টিক।

শ্বেতা মিশ্র, সৌম্য মুখোপাধ্যায়।

শ্বেতা মিশ্র, সৌম্য মুখোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।

খলনায়কের ভোলবদল নিয়ে সৌম্যের হাসতে হাসতে আরও দাবি, “সমাজে এখন ‘অ্যারিস্টোক্র্যাট শয়তান’দের ভিড়। তাঁরা অভিজাত, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত, সুপুরুষ। যাঁদের গালে ব্রণের দাগ, দশাদশই চেহারা— তাঁরাই আদতে ‘ভালমানুষ’। সমাজের ছবিটাই যদি বদলে যায়, পর্দায় তো তার ছায়া পড়বেই! সিনেমা তো সমাজের আয়না।”

এই ধারার তৃতীয় ব্যক্তি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় একই অঙ্গে মঞ্চের ‘ফেলুদা’, ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ সিরিজ়ে কৌশানী মুখোপাধ্যায়ের চূড়ান্ত ‘দুষ্টু বস’! যিনি প্রতি মুহূর্তে সুন্দরী সহকর্মীকে চোখ দিয়ে ভোগ করার চেষ্টা করেন। কেমন লাগে এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে? সৌম্যের যুক্তি, “আমি অভিনেতা। আমি সব ধরনের চরিত্রই উপভোগ করি। ভাল-মন্দ আমার কাছে আপেক্ষিক। দুই ধরনের চরিত্রে নিজের অভিনয়সত্তাকে খুঁজে পাই।” তাঁর আরও মত, ধূসর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ বেশি থাকে। নিজেকে প্রমাণ করার জায়গা থাকে। দর্শক এই ধরনের ‘চরিত্র’ ইদানীং পছন্দও করছেন। কারণ, বাস্তবে এই ধরনের মানুষদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

একই সঙ্গে সৌম্য এটাও উপলব্ধি করেছেন, কৌনও সৌম্যদর্শন ব্যক্তি যখন ‘খলনায়ক’ হন, তখন বাস্তবেও তাঁর চারপাশের মানুষেরা বেশি আঘাত পান। কারণ, চেহারাটা তাঁর ‘প্লাস পয়েন্ট’। পর্দাতেও একই ঘটনা ঘটে। এই ধরনের কোনও অভিনেতা ধূসর চরিত্রে অভিনয় করলে দর্শক আতঙ্কিত বা আঘাত পান বেশি। কারণ, এখনকার খলনায়কেরা কিন্তু শুরু থেকেই খারাপ চোখে তাকান না। হা হা হাসেন না। নারী শরীরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন না। অথচ সবটাই করেন অত্যন্ত পরিশীলিত ভঙ্গিমায়।

এই কথার রেশ নবনীতার কণ্ঠেও। তিনি এই মুহূর্তে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ধারাবাহিকের ‘রোশনি এস রায়’। ধারালো সুন্দরী এই খলনায়িকা নায়কের সর্বস্ব গ্রাস করতে এসেছে। তাঁর কথায়, “জানেন, সম্প্রতি ভারী মজার একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে। সমাজমাধ্যমে এক দর্শক মন্তব্য করেছেন, ‘নবনীতাদিকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি পর্দায় এত দুষ্টুমি করতে পারেন!’ আর একজন পাল্টা রসিকতা করেছেন, “হ্যাঁ, নবনীতা যা করেন, হাসতে হাসতে করেন’!” তাঁর যুক্তি, বইয়ের পাতার লেখা ‘হাসতে হাসতে ছুরি মারা’কে জীবন্ত করেছেন তিনি। নিজেকে নিয়ে পরীক্ষানীরিক্ষা করতে গিয়ে ‘খলনায়িকা’র চেনা ভঙ্গি বদলে দিয়েছেন। দর্শক এখন তাঁর ‘হাসতে হাসতে করা দুষ্টুমি’গুলোই উপভোগ করেন বেশি!

শ্বেতাও একই ভাবনায় বিশ্বাসী। তিনিও উপলব্ধি করেছেন, ধূসর চরিত্রের মধ্যেও দর্শক বাস্তবতা খুঁজছে। ফলে, আর পাঁচ জনের মতো স্বাভাবিক আচরণও আশা করছে তাঁর থেকে! যে অভিনেত্রী বা অভিনেতা সেটা দিতে পারছেন, তাঁর অভিনয় প্রশংসিত। তিনি জীবন্ত করতে পারছেন ‘খলনায়ক’কে। বদলে যাওয়া সমাজে, বদলে যাওয়া খলনায়কের সংজ্ঞা আত্মস্থ করতে পারলেই বাজিমাত। নায়ককে ছাপিয়ে হিট খলনায়ক!

ঠিক যে ভাবে ‘বাজিগর’ বা ‘ডর’ ছবিতে শাহরুখ খান গুনে গুনে গোল দিয়েছিলেন নায়কদের।

Advertisement
আরও পড়ুন