দেব-স্বরূপ বিশ্বাস বিভাজন কি স্পষ্ট? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
টলিউডের টেকনিশিয়ানদের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পকে ঘিরে শনিবার শুরু থেকেই দেব যেন বিস্ফোরক। এ দিন এই প্রকল্প চালু করা নিয়ে অভিনেতার একাধিক বক্তব্যে ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর ‘দ্বন্দ্ব’ ধরা পড়েছে। পাশাপাশি এ দিন দেবের বক্তব্যে উঠে এসেছে টলিউডের বহু আলোচিত ‘থ্রেট কালচার’ বা হুমকি সংস্কৃতি ও ‘ব্যান কালচার’ বা নিষেধাজ্ঞার সংস্কৃতির প্রসঙ্গও। অভিনেতা প্রশ্ন তোলেন, ‘‘এই ধরনের সংস্কৃতিতে কারা লাভবান হন? কারাই বা ক্ষতিগ্রস্ত হন?”
এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিয়ে দেব বলেন, “অনির্বাণ ভট্টাচাৰ্যকে ‘ব্যান’ করে কী হয়েছে? অনির্বাণ গান গাইছে, মঞ্চাভিনয় করছে। অর্থাৎ, সে চুপ করে বসে নেই। কিছু না কিছু করে যাচ্ছে। কিন্তু ও অভিনয় করলে ওর সঙ্গে বাকি টেকনিশিয়ানদেরও উপার্জন হত। সেটা সিরিজ় হোক বা সিনেমা। কিংবা অনির্বাণ পরিচালনার কাজ করতে পারলেও সেখানে কাজের সুযোগ পেতেন টেকনিশিয়ানরা। ফেডারেশন দায়িত্ব নিয়ে সেই রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে, টেকনিশিয়ানদের উপার্জনের রাস্তাও বন্ধ।’’ অভিনেতা-সাংসদের দাবি, এতে আদতে ক্ষতি হচ্ছে টেকনিশিয়ানদেরই।
দেবের আরও বক্তব্য, প্রত্যেক বছর ধারাবাহিক, ছবি তৈরির সংখ্যা কমছে। গত বছর ছবি মুক্তি পেয়েছে মাত্র ৩০টি! ছবিমুক্তির এই সংখ্যা ২০২৪-এ ছিল ১২৩টি। একই ভাবে আগে প্রতি বছর কমবেশি ৩০-৪০টি ধারাবাহিক তৈরি হত। সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ২৫! তাঁর উদ্বেগ, ‘‘এমনিতেই কাজ কমছে। তার উপর কাজ কেড়ে নিয়ে, সদস্যপদ কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে যদি টেকনিশিয়ানদের দাবিয়ে রাখা হয়, তা হলে ওঁরা বাঁচবেন কী করে?’’ তিনি জানিয়েছেন, তাঁর কাছে খবর আছে, এমনিতেই টেকনিশিয়ানদের সবাই যে নিয়মিত কাজ পান এমনও নয়। দেবের দাবি, ভাল করে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সাড়ে সাত হাজার টেকনিশিয়ানের মধ্যে নিয়মিত কাজ পান বড় জোর আড়াই হাজার জন। বাকি পাঁচ হাজার জন এই আওতায় পড়েন না।
এখানেই শেষ নয়। এ দিন দেব তুলে আনেন পরিচালক তথা বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীর ধারাবাহিকের শুটিং আটকে দেওয়ার প্রসঙ্গও। সাংসদ-অভিনেতা দেবের কথায়, “ফেডারেশনের নতুন নিয়ম, ৭২ ঘণ্টা আগে সংগঠনের কাছে অভিনেতা এবং টেকনিশিয়ানদের তালিকা জমা দিতে হবে। না হলে শুটিং করতে দেওয়া যাবে না। ফেডারেশন এটা বোঝে না, শেষ মুহূর্তে শুটিংয়ের অনেক কিছু বদলে যায়। অভিনেতা বদলাতে পারেন, টেকনিশিয়ানরাও। যদিও টেকনিশিয়ান বাছার স্বাধীনতাও ইদানীং সংগঠন খর্ব করে দিয়েছে।” দেব জানান, সম্ভবত এ রকম কিছু রদবদলের কারণেই রাজ ৭২ ঘণ্টার বদলে ৪৮ ঘণ্টা আগে নামের তালিকা ফেডারেশনে জমা দিয়েছিলেন। তাতেই নাকি বিপত্তি। প্রযোজক-পরিচালক-বিধায়কের নতুন ধারাবাহিকের শুটিং আটকে দেওয়া হয়। পরে ধারাবাহিকের পরিচালক অমিত দাস আনন্দবাজার ডট কম-কে জানান, ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনার পর ৯ মার্চ থেকে শুটিং শুরু করতে পেরেছেন তাঁরা।
এ দিন দেব উপস্থিত টেকনিশিয়ানদের আশ্বাস দিয়ে জানান, বাংলায় যতক্ষণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন, ততক্ষণ কাউকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না। রসিকতা করেন সাংবাদিকদের সঙ্গেও। তাঁদের কাছে তিনি জানতে চান, ‘‘আপনারাও কি স্বরূপদাকে ভয় পান?’’
ফেডারেশন সভাপতির বিরুদ্ধে এই দুই অভিযোগ নতুন নয়। কয়েক বছর ধরে বার বার অভিনেতা, টেকনিশিয়ানরা কখনও প্রকাশ্যে, কখনও নামপ্রকাশ না করে অভিযোগ জানিয়েছেন। এ দিন দেবও বিষয়টি নিয়ে সরব হন। সাংসদ-অভিনেতার যাবতীয় বক্তব্য এবং সকলের সমস্ত অভিযোগ কি মেনে নেবেন স্বরূপ? প্রশ্ন করেছিল আনন্দবাজার ডট কম। স্বরূপ প্রথমে ‘দেবস্তুতি’ করেছেন। তাঁর অভিনয়প্রতিভা সম্বন্ধে প্রশংসাও করেন। বলেন, “দেব অধিকারী অত্যন্ত প্রতিভাবান অভিনেতা। তিনি প্রথম সারির প্রযোজকও।” তার পরেই বলেন, “সেই কারণেই ওঁর মুখ থেকে ‘থ্রেট কালচার’ বা ‘ব্যান সংস্কৃতি’ নিয়ে বক্তব্য শুনে আঘাত পেয়েছি। দেববাবু কি জানেন, ‘থ্রেট কালচার’ কাকে বলে? বিষয়টি তখনই ‘থ্রেট’ বা হুমকির পর্যায়ে পৌঁছোয়, যখন হুলিগানইজ়ম হয়। উনি টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে গিয়েছিলেন। টেকনিশিয়ানরা যে কাজ করেন সেটাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। টেকনিশিয়ানদের পারিশ্রমিক নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন। দেববাবুকে অনুরোধ জানাব, হাই কোর্টে গিয়ে দয়া করে যেন দেখে আসেন মামলার কাগজপত্র। তা হলেই জানতে পারবেন সেখানে টেকনিশিয়ানদের কাজকে খর্ব করার জন্য, তাঁদের অসুবিধায় ফেলার জন্য কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছিল!” স্বরূপের আক্ষেপ, সে দিন দেব যদি এগিয়ে এসে পরিচালকদের বলতেন, এ ভাবে মামলা দায়ের করা ঠিক হচ্ছে না, তা হলে টেকনিশিয়ানরা খুশি হতেন।
স্বরূপের আরও দাবি, “আজ দেববাবু ‘থ্রেট কালচার’-এর কথা বলছেন। এটা আমরা করিনি, ওঁরাই আমাদের থ্রেট করেছিলেন এবং ভয় দেখিয়েছিলেন, টেকনিশিয়ানদের সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হবে। তাঁদের পথে বসানো হবে। সে ভাবেই কিন্তু মামলা সাজানো হয়েছিল।”
গত বছর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে পরিচালকেরা হাই কোর্টে যে মামলা দায়ের করেছিলেন তাতে তো ফেডারেশনের অনৈতিক পদক্ষেপ, সংগঠনের তৈরি আইন বা নিয়ম এবং পরিচালকদের স্বাধীনতায় অযথা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধে কোথায় মামলা দায়ের হয়েছিল? ফেডারেশন সভাপতির কাছে পাল্টা প্রশ্ন রাখতেই তাঁর ব্যাখ্যা, “ফেডারেশনের নিজস্ব কোনও অস্তিত্ব নেই। টেকনিশিয়ানদের প্রতিনিধি বলুন বা মুখপাত্র হল এই সংগঠন। সেই সংগঠনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা মানে আদতে টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ।” সেই সঙ্গে স্বরূপ জবাব দেন দেবের করা তাঁর ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ড প্রসঙ্গেও। স্বরূপের পাল্টা প্রশ্ন, “আমি এক বারও ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পকে খারাপ বলিনি। আমি বা আমাদের সংগঠন রাজ্য সরকারের বিরোধী নই। বরং ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পের প্রচারের সময় আমরা বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে গিয়ে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে রাজ্যবাসীর নাম নথিভুক্ত করেছি। তবু দেববাবুর কথার প্রেক্ষিতেই জানতে চাইছি, আমার না হয় স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের প্রয়োজন নেই। তাই তার মর্মও বুঝি না। কিন্তু ওঁর কি এই কার্ডের প্রয়োজন আছে?”
দেব কখনও ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে নাম তোলার জন্য কোনও দিন লাইনে দাঁড়াবেন কি না, সেটাও জানতে চান স্বরূপ।