আশা ভোসলেকে নিয়ে সুদেশের স্মৃতিচারণ! ছবি: সংগৃহীত।
আমি বাক্রুদ্ধ। এক সপ্তাহ আগেও কথা হয়েছিল। তখনই জানিয়েছিলেন, ওঁর শরীর ভাল নেই। শুনে শুধু বলেছিলাম, “চিন্তা করবেন না। মুম্বই ফিরেই দেখা করব আপনার সঙ্গে।” শনিবার আমি নাগপুরে ছিলাম। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেই নানা জায়গা থেকে ফোন আসতে থাকে। জানতে পারি, ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি মুম্বইয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। রবিবার মুম্বই পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গেই খবরটা পেলাম।
সারা দেশের কাছে উনি মা সরস্বতী ছিলেন। আমাকে তো নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করতেন। আমি যেটুকু পরিচিতি পেয়েছি, তার সবটাই ওঁর জন্যই। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আমাকে নিয়ে যেতেন। ওঁকে জিজ্ঞাসা করতাম, “আমি তো গান গাইতে পারি না। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এত বড় বড় শিল্পী রয়েছেন। তাও আমাকেই কেন নিয়ে যান?” হেসে একটাই কথা বলেছিলেন, “তুই ভাল গাস। মানুষও ভাল। আর আমি জানি, রাত ২টোর সময়েও কোনও প্রয়োজনে ডাকলে, তুই দৌড়ে আসবি।” উনি আমার জন্য সঙ্গীতশিল্পী নন। দ্বিতীয় মাকে আমি হারালাম। আমাদের দেশের কাছে যে অমূল্য সম্পদ ছিল, তা আজ আর রইল না। এ এমন ক্ষতি, যা কখনও পূরণ হবে না।
ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ, ওঁর সঙ্গে রেকর্ড করা গান রয়েছে। ওঁর সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। ওঁর সঙ্গে প্রথম দেখা আজও স্পষ্ট। প্রথম দিন স্টুডিয়োয় আমাকে শচীন দেব বর্মণের গান গাইতে বলেছিলেন। চোখ বুজে সেই দিন ‘অমর প্রেম’ ছবির গান গেয়েছিলাম। চোখ খুলে দেখি, আশাজি দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে আছেন। হাত সরালেন যখন, দেখলাম ওঁর দু’চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। তার পরেই তিনি আমাকে পঞ্চমদার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।
স্মৃতির পাতা থেকে— আশা ভোসলের সঙ্গে সুদেশ। ছবি: সংগৃহীত।
আমার পরিবারের সঙ্গেও ওঁর সুসম্পর্ক ছিল। প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়ি। আমার স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে গল্প করতেন। আমি অবাক হয়ে যেতাম, কী ভাবে এত বড় মাপের শিল্পী আমার বাড়িতে। নিশ্চয়ই কোনও যোগাযোগ ছিল। আশাজি একটা কথা বলেছিলেন, ‘তোর গ্রামের কুলদেবী কামাক্ষী। জানিস, জন্মের পরে আমার নামও কামাক্ষীই রাখা হয়েছিল। আমি একই সঙ্গে লক্ষ্মী, কালী ও সরস্বতী। আমার আশীর্বাদ তোর সঙ্গে থাকবে।”
অনেকেই মনে করতেন, আমি আশাজিরই পুত্র। মঞ্চে সব সময়ে নিজের ছেলে হিসাবেই আমাকে পরিচয় করাতেন। আমাদের পদবি এক বলে, অনেকে আমাদের মা-ছেলে ভাবেন আজও। আমি যদি কোথাও বলতাম, উনি আমার মা নয়, রেগে যেতেন আশাজি। নিজেই বলতেন, “আমি তো তোকে নিজের ছেলে বলেই মানি।”
একসময় পারিবারিক কারণে একটু চিন্তায় ছিলাম। আমার গলা শুনেই তিনি বুঝে যান। আমার ঘরের মন্দিরের জন্য সোনায় মোড়়া একটি গণেশমূর্তি নিয়ে এসে বলেছিলেন, “এ বার তোর সব চিন্তা দূর হয়ে যাবে।” আমার অসুস্থতাতেও নিয়মিত খবর নিতেন। আমাকে রেঁধেও খাইয়েছেন বহু বার। ওঁর মনের জোর থেকে শেখার আছে। ৯২ বছর হয়সেও ভোর ৫টায় উঠে রেওয়াজ করতেন, নয়তো রান্না করতেন।
মঞ্চে আশাজি আর কিশোরদার গানই গেয়ে থাকি আমি। জানি না, এ বার থেকে আমি কী ভাবে গাইব। আর তো আমার কাছে কিছুই রইল না। প্রার্থনা করি, উনি যেন পুনর্জন্ম নেন এই দেশেই।
(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)