Digital Heart

হৃৎপিণ্ডের অবিকল নকল, তাতেই হবে পরীক্ষা, ‘ডিজিটাল হার্ট’ বানিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি কমালেন গবেষকেরা

দেখতে হবে, অবিকল আসল হৃদ্‌যন্ত্রের মতো। তা ধুকপুকও করবে। শিরায়-উপশিরায় বইবে ইলেকট্রিক্যাল ইম্পাল্‌স। এমন হৃদয় হবে আসল হৃদয়েরই যমজ। যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা তার উপরেই হবে। হার্টেরও ডিজিটাল রূপ বার করে ফেললেন গবেষকেরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১২
A digital heart twin, can successfully identify problem areas deep in the heart muscle of people

হার্টেরও ডিজিটাল রূপ এল, কোন কাজে লাগবে তা? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আসল হৃৎপিণ্ড নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করতে গেলেই বিপদ। পান থেকে চুল খসার মতো, সামান্য ভুলত্রুটি হলেই হৃদ্‌যন্ত্র পুরোপুরি বিগড়ে যাবে। আর বিকল হৃদয়কে স্বাভাবিক করে তোলার প্রক্রিয়া কষ্টসাধ্যই শুধু নয়, ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তা হলে আর বুকের হাড়-চামড়া কেটে হার্টের উপর কাটাছেঁড়ার করার দরকার কী। সে কাজ তো করতে পারবে নকল হার্টই। হার্টেরও প্রতিরূপ তৈরি করে ফেলেছেন গবেষকেরা। তা-ও আবার ডিজিটাল। যখন সব কিছুরই ডিজিটাল রূপ তৈরি হচ্ছে, তখন হার্টেরই বা হবে না কেন! আসল হৃদয়ের জায়গায় ডিজিটাল হৃদয়ের উপরেই যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা চলবে। দেখা হবে, তা কতটা সচল বা কোথায় তার ত্রুটি, তা সারানোর উপায়ই বা কী।

Advertisement

হার্টের নিত্যনতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে খবর হয়ই। তবে ডিজিটাল হার্ট বিষয়টি একেবারেই নতুন। এর কার্যপদ্ধতি নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়েছে। তাই ডিজিটাল হার্টের খবর গবেষণাপত্রে ছাপা হওয়া মাত্রই সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জিনিসটি আসলে কী?

মানুষের আসল হৃৎপিণ্ডের ভার্চুয়াল প্রতিলিপি। পুরোটাই কম্পিউটারে ডিজিটাল মডেলে ফেলে তৈরি করা। এমন হার্ট ত্রিমাত্রিক, তাতে শিরা-উপশিরার জাল রয়েছে, রক্ত চলাচলের পথও দৃশ্যমান, এমনকি হার্টের প্রকোষ্ঠগুলিতে যে ভাবে বিদ্যুতের তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, ডিজিটাল হার্টেও তা হবে। অর্থাৎ, এটি হল আসল হৃৎপিণ্ডের ডিজিটাল যমজ, যাতে কেবল জীবন্ত কোষ থাকবে না। কিন্তু আকারে-গঠনে, কার্যকারিতায় পুরোটাই হবে এক রকম।

ডিজিটাল হার্টের মতিগতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নকল হার্ট কোনও রোগীর হার্টের অবিকল প্রতিরূপ। এটি কেবল একটি ছবি নয়, বরং এটি রোগীর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন, রক্ত সঞ্চালন এবং ইলেকট্রিক্যাল ইম্পাল্‌স-কে হুবহু নকল করতে পারে। এটি আসল হৃদ্‌যন্ত্রের মতো ধুকপুকও করবে। এমন হার্টের উপরেই ওষুধপত্রের যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন গবেষকেরা। এর জন্য ইঁদুরের উপর নির্যাতন করার প্রয়োজন হবে না। মানুষের উপর পরীক্ষার ঝুঁকিও থাকবে না। ইতিমধ্যেই আমেরিকার জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, লন্ডনের কিংস কলেজের বিজ্ঞানীরা ডিজিটাল হার্ট তৈরি করে ফেলেছেন বলে জানা গিয়েছে।

কৃত্রিম হার্ট তৈরির জন্য এত দিন নানা রকম ধাতুর মিশ্রণ ব্যবহার করা হত। ধাতব হার্ট প্রতিস্থাপনের যোগ্য ঠিকই, কিন্তু তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ ওষুধ ঠিকমতো হার্টের কোষে কোষে পৌঁছোচ্ছে কি না বা ওষুধের প্রভাবে হৃৎস্পন্দনের উন্নতি হচ্ছে কি না, তা জানতে আসল হৃদয়েরই প্রয়োজন। সে জন্য ইঁদুর বা ওই জাতীয় প্রাণীর উপরেই পরীক্ষা হত। সে পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল এলে তবে ঝুঁকি নিয়ে মানুষের উপরেও পরীক্ষা হত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি একই রকম নকল হার্ট তৈরি করা যায়, তা হলে এত ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

কী কী কাজ করবে?

ব্লকেজ হলে বা রক্তচাপ বাড়লে হৃৎপিণ্ড কী ভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়, কী ভাবে সেই জটিলতা দূর করা যাবে, তার পরীক্ষা হবে ডিজিটাল হার্টে।

কোনও রোগীর আগামী ৫ বা ১০ বছর পর হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি কতটা, তা এই মডেলটি বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই জানিয়ে দিতে পারবে।

হৃৎস্পন্দনের গতি অনিয়মিত হয়ে গিয়েছে কি না, তা বোঝার সবচেয়ে ভল পদ্ধতি হল এই ডিজিটাল হার্ট। অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া বলা হয়। অ্যারিদমিয়া হার্টের উপরের প্রকোষ্ঠ অলিন্দ বা নীচের প্রকোষ্ঠ নিলয়ে দেখা দিতে পারে। অনেক সময়েই এই রোগের কোনও উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে বুক ধড়ফড়, মাথা ঝিমঝিম করা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। যখন হৃদ্‌গতি অনেকটা কমে যায়, তখন তা থেকে হার্ট ব্লক হতে পারে, তাকে বলে ব্র্যাডিঅ্যারিদমিয়া। এ ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দন ৬০-এর নীচে চলে যায়। আর যখন হৃদ্‌গতি ১০০-র উপরে চলে যায়, তখন তাকে বলে ট্যাকিঅ্যারিদমিয়া। হার্টের ভিতরে যেখানে ইলেকট্রিক্যাল ইম্পাল্‌স তৈরি হয়, সেখানে গোলমাল হলেই হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে যায় আর তা থেকেই হার্টের জটিল সব অসুখ দেখা দিতে থাকে। ডিজিটাল হার্ট এই গোলমালটাই ধরতে পারবে সঠিক ভাবে। হার্টের যে সব পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়, তাতে এই গন্ডগোলটা গোড়া থেকে ধরা পড়ে না। হার্টের ঠিক কোন প্রকোষ্ঠে ত্রুটি রয়েছে, কোথায় রয়েছে আসল গলদ, তা ধরা জন্যও ব্যবহার করা হবে ডিজিটাল হার্টকে।

গবেষকেরা আশা রাখছেন, ডিজিটাল হার্ট ঠিকমতো কাজ করতে পারলে হার্টের অনেক দুরারোগ্য ব্যাধিও সারানো যাবে সহজে। এতে রোগীর প্রাণসংশয়ও থাকবে না।

Advertisement
আরও পড়ুন