ডিম্বাণু তৈরি হচ্ছে রক্ত থেকেই, কী সুবিধা হবে আগামী দিনে? ছবি: ফ্রিপিক।
সন্তানজন্মের জন্য কি সত্যিই এবার ফুরিয়ে যাচ্ছে পুরুষ বা নারীর প্রয়োজন? গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়েই তো তৈরি হচ্ছে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু। তা হলে বিজ্ঞানের গতি কি সেই দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? বিষয়টা তেমন নয়। বন্ধ্যাত্বের সমস্যার সমাধানেই গবেষণাগারে কৃত্রিম ভাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছেন গবেষকেরা। এ বার ডিম্বাণু তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। রক্তের কোষ থেকে প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু তৈরি করে ফেলেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকেরা। তাঁরা জানিয়েছেন, ডিম্বাণু উৎপাদন যদি গবেষণাগারে সম্ভব হয়, তা হলে যেমন বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা সহজ হবে, তেমনই বেশি বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে। শারীরিক সমস্যা হোক বা বয়সজনিত কারণ, মা হওয়ার পথে জটিলতা অনেক কমে যাবে।
কী ভাবে তৈরি হল ডিম্বাণু?
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার এক বায়োটেকনোলজি সংস্থা ‘কনসেপশন’ জানিয়েছে, গবেষণাগারে রক্তের কোষ থেকেই প্রাথমিক পর্যায়ের ডিম্বাণু তৈরি করে ফেলেছে তারা। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস’। আর তা সম্ভব হয়েছে রক্তের স্টেম কোষ ব্যবহার করেই। সংস্থার প্রধান ম্যাট ক্রিসিলফ জানিয়েছেন, প্রজনন সম্পর্কিত যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে পারে এই নয়া আবিষ্কার।
বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু।
মানুষের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে গবেষণাগারে তা বিশেষ উপায়ে প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষে বদলে দিয়েছেন গবেষকেরা। স্টেম কোষ হল শরীরের সেই আদি কোষ, যার থেকে অন্যান্য কোষ তৈরি হয়। একে তাই 'মাতৃকোষ'ও বলে। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ থেকে শরীরের অন্যান্য কোষ তৈরি করা সহজ। এই ধরনের প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ বানানো যায় দু’ভাবে— ১) ভ্রূণের থেকে কোষ নিয়ে। যাকে বলে, ‘এমব্রায়োনিক স্টেম সেল’ বা ‘ইএস’। ২) না হলে বয়স্ক মানুষের শরীরের কোষ নিয়ে। এগুলিকে বলা হয়, ‘ইনডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট সেল’ বা ‘আইপিএস’। গবেষকেরা এ ক্ষেত্রে রক্তের নমুনা ব্যবহার করেছেন।
স্টেম কোষগুলিকে নিয়ে গবেষণাগারে নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ‘প্রাইমরডিয়াল জার্ম সেল’ তৈরি করেছেন গবেষকের। এটি এমন কোষ, যা থেকে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব। গবেষকেরা এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের ডিম্বাণু তৈরি করেছেন।
কী লাভ হবে চিকিৎসায়?
২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী কাতসুহিকো হায়াশি এবং তাঁর সতীর্থেরা ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে সফল হয়েছিলেন। তবে মানুষের ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর গঠন ও বিকাশ অনেক বেশি জটিল হওয়ায় এটি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। এ বারে বিজ্ঞানীরা সে পথে অনেকটাই এগিয়েছেন।
আইভিএফে সুবিধা হবে কি?
গবেষকদের মত, বর্তমানে টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ চিকিৎসার জন্য শরীর থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা বেশ কষ্টদায়ক। এর জন্য দিনের পর দিন হরমোন ইঞ্জেকশন দিতে হয়, যার অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। রক্তের কোষ থেকে ডিম্বাণু তৈরি সম্ভব হলে ইঞ্জেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আলাদা করে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন পড়বে না।
বেশি বয়সে মাতৃত্ব
চল্লিশ পেরিয়ে মা হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলেই মনে করেন চিকিৎসকেরা। কারণ, বয়স ত্রিশ পার হওয়ার পর থেকেই ডিম্বাণুর উৎপাদন ও গুণগত মান কমতে থাকে। জরায়ুতে যে ডিম্বাণু তৈরি হয়, তা প্রতি মাসেই নষ্ট হয়ে যায়। বয়স যত বাড়বে, ততই এই ডিম্বাণুগুলির গুণ নষ্ট হতে থাকবে। ডিম্বাণুর গুণমান ভাল না হলে সন্তানজন্মে যেমন জটিলতা আসতে পারে, তেমনই সন্তান হলে তার মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব দেখা দিতে পারে। বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে মায়ের স্বাস্থ্যও। চল্লিশ পার হলে তা ‘হাই রিস্ক প্রেগন্যান্সি’। সে ক্ষেত্রে মায়ের শরীর থেকে রক্ত নিয়েই যদি ডিম্বাণু আলাদা করে তৈরি করা যায়, তা হলে মা হওয়াতে তেমন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
ক্যানসারজয়ীদের জন্য
ক্যানসার চিকিৎসার কেমোথেরাপি বা রেডিয়োথেরাপির কারণে প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান, দুইই কমতে পারে। এই গবেষণার প্রয়োগ হলে, যে মহিলারা ক্যানসার সারিয়ে উঠেছেন বা ক্যানসার চিকিৎসার মধ্যে রয়েছেন, তাঁরাও মাতৃত্বের স্বাদ পেতে পারেন বলে আশা গবেষকদের।
গর্ভপাতের সমাধান
অনেক সময় ডিম্বাণুর ভিতরে থাকা ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে ভ্রূণ ঠিকমতো বড় হতে পারে না এবং বার বার গর্ভপাত হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে রক্তের কোষ থেকে উর্বর ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হলে, গর্ভপাতের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে।
সমকামী দম্পতিদের সন্তান ধারণের সম্ভাবনা
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে এটি সমকামী দম্পতিদের নিজেদের সন্তান লাভের পথ খুলে দিতে পারে। এক জনের রক্তের কোষ থেকে ডিম্বাণু ও অন্য জনের কোষ থেকে শুক্রাণু তৈরি করা গেলে গবেষণাগারেই ভ্রূণ তৈরি করা সম্ভব হবে। তবে গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রক্তের কোষ থেকে যে ডিম্বাণুগুলি তৈরি করেছেন গবেষকেরা, সেগুলি নিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা এবং সুস্থ সন্তানের জন্ম হবে কি না, তা আরও বিশদ গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেই বোঝা যাবে।