‘ডিজিটাল বার্নআউট’ কী, আপনিও এর শিকার নন তো? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও অন্য সমাজমাধ্যমগুলি গোড়ার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আনন্দের উৎস ছিল। কিন্তু ক্রমেই বিষাদের কারণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সমাজমাধ্যমে অন্যের আনন্দ-ফুর্তির পোস্ট দেখে বিষণ্ণ বোধ করা, ভার্চুয়াল ঈর্ষা মনোজগতকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত ও বিষাদগ্রস্ত করে তুলছে। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের গবেষণা বলছেন, এখনকার প্রজন্ম মারাত্মক ভাবে ডিজিটাল বার্নআউটের শিকার। এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে সব সময়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ভয় কাজ করে। মানসিক ক্লান্তি এতটাই যে, তা অবসাদের দিকে নিয়ে যায় চুপিসাড়ে।
কয়েক হাজার সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীকে নিয়ে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, স্কুল বা কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল বার্নআউটের শিকার। তবে তালিকায় প্রাপ্তমনস্কেরাও রয়েছেন। গবেষণা বলছে, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের মানসিক চাপের কারণ বিভিন্ন সমাজমাধ্যম। সেখানে অতিরিক্ত সময় কাটানোয় ৯০ শতাংশ ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। কম ঘুমের জেরে তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ সম্পর্ক হারানো বা সামাজিক সম্মান হারানোর মতো বিভিন্ন আশঙ্কায় ভুগছেন। আবার অনেকে মানসিক চাপ কমাতে নানা রকম নেশায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। রোজের যাপনে, পারিবারিক নানা সম্পর্কে খারাপ প্রভাব ফেলছে সমাজমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি।
মনোরোগ চিকিৎসক শর্মিলা সরকারের মতে, সমাজমাধ্যম আরও বেশি ভোগবিলাসী করে তুলছে। ভার্চুয়াল বন্ধুর বাড়ি, গাড়ি বা দামি জিনিসপত্রের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেখানো বিলাসী জীবনযাত্রা দেখে তার প্রতি ঈর্ষাও তৈরি হচ্ছে। এর থেকে স্নায়বিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছোচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমে দেখা সেই কাল্পনিক জগতের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলাতে না পারার ক্ষোভ অবসাদের জন্ম দিচ্ছে। আত্মঘোষিত ‘সুখী’ গৃহকোণগুলির বিজ্ঞাপন দেখে অন্যের প্রতি বিষাদও বাড়ছে।
এখানেই শেষ নয়। সমাজমাধ্যমে বন্ধুত্ব পাতাতে গিয়েও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সমীক্ষার রিপোর্ট জানাচ্ছে, কমবয়সিদের অনেকেই বলছেন, অচেনা ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ এলে আতঙ্ক হয়। কারণ অনুরোধকারীর উদ্দেশ্য কী, এঁরা পরে কী আচরণ করবেন, সেটা বলা মুশকিল। আবার অনেকে জানিয়েছেন, সমাদমাধ্যমের বন্ধুত্ব ও সেখানে বিচ্ছেদ হলে হতাশা আরও বাড়ছে। নিজের পোস্টে যথাযথ ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’ না পেলেও তীব্র মনোকষ্ট তৈরি হচ্ছে, যা বিষাদের কারণ হয়ে উঠছে।
এর থেকে রেহাই পাওয়ার পথটা কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। শর্মিলা জানাচ্ছেন, সমাজমাধ্যমের কুফলগুলি নিয়ে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করলে হয়তো বিষয়টা অনেক সহজ হবে। তা ছাড়া পাঠ্যক্রম বহির্ভূত নানা কাজে ব্যস্ত থাকা জরুরি। ভার্চুয়ালের জায়গায় মুখোমুখি আদানপ্রদানের বন্ধুত্ব ফিরে আসা জরুরি। নিয়মিত বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ভার্চুয়াল জগতের নেশা ছাড়াতে সাহায্য করবে। এর পরেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে রেহাই না পেলে মনোবিদের সাহায্য নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।