এইচআইভি নির্মূল হয়েছে, অসাধ্যসাধন করলেন চিকিৎসকেরা। ফাইল চিত্র।
মারণ রোগকেও তা হলে জয় করা যায়! এডসের কবল থেকেও সুস্থ জীবনে ফেরানো যায় রোগীকে! এডস নির্মূল করে রোগীদের নবজীবন দেওয়ার দিশা দেখালেন নরওয়ের অসলো ইউনিভার্সিটির চিকিৎসকেরা। স্টেম কোষ থেরাপিতে এমন অসাধ্যসাধন করলেন চিকিৎসকেরা।
এর আগে বার্লিন এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুরূপ ঘটনা ঘটে। সে বারেও স্টেম কোষ থেরাপি নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করছিলেন গবেষকেরা। এ বার নরওয়েতে এডস আক্রান্তের চিকিৎসায় স্টেম কোষ থেরাপি সফল হল। সম্পূর্ণ ভাবে রোগমুক্তি ঘটল ৬৩ বছরের এক ব্যক্তির। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ২০০৬ সাল থেকে এডস আক্রান্ত ছিলেন ব্যক্তি। নানা চিকিৎসায় কেবল রোগের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন চিকিৎসকেরা। ২০২০ সালে স্টেম কোষ থেরাপি করা হয় তাঁর। এর পরেই ধীরে ধীরে বদল আসতে থাকে ব্যক্তির শরীরে। ভাইরাসের বাড়বৃদ্ধি বন্ধ হতে থাকে। একটা সময়ে ওষুধ দেওয়াও বন্ধ করে দেন চিকিৎসকেরা। বছর কয়েক বাদে পরীক্ষা করে দেখা যায় ওই ব্যক্তির শরীরে আর একটিও ভাইরাস নেই। অসুখও নির্মূল হয়েছে চিরতরে।
স্টেম কোষ থেরাপিতে কী চমক ঘটছে?
এডস নির্মূল করতে যে ধরনের চিকিৎসা হচ্ছে তার নাম হেমাটোপোয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন। এটি এক ধরনের অ্যান্টি-রেট্রোভিয়াল থেরাপি, যেখানে ভাইরাসের বিভাজন থামিয়ে দেওয়া যায়। ভাইরাস যদি সংখ্যায় বাড়তেই না পারে, তা হলে রোগও দ্রুত ছড়াবে না। রোগীর সেরে ওঠার সম্ভাবনা থাকবে।
কোষে ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া ঢুকতে গেলে তাদের কোনও বাহক বা রিসেপটরের দরকার হয়। মানুষের শরীরে এমনই বাহক কোষ খুঁজে নেয় ভাইরাস। তার পর ঢুকে পড়ে কোষের ভিতরে। সেখানে বংশবিস্তার করে সংখ্যায় বাড়তে শুরু করে। আক্রান্ত হতে থাকে একের পর এক কোষ। এ ভাবেই ধীরে ধীরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। এইচআইভি-১ ভাইরাস মানব শরীরে ঢোকার জন্য যে বাহক খুঁজে নেয়, তার নাম সিসিআর-৫। ভাইরাসকে যদি ঠেকাতে হয়, তা হলে এই বাহক কোষটির জিনগত বদল ঘটানো জরুরি। এমন ভাবে বাহককে বদলে দিতে হবে যাতে ভাইরাস আর তাকে চিনে উঠতে না পারে। ফলে কোষে ঢোকার রাস্তাও বন্ধ হয়ে যাবে। এই বদলের প্রক্রিয়াটি ঘটে স্টেম কোষ থেরাপিতে।
দাতার অস্থিমজ্জা থেকে নেওয়া স্টেম কোষ আক্রান্তের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। স্টেম কোষ হল শরীরের এমন এক কোষ, যা থেকে অন্যান্য বহুবিধ কোষ তৈরি করা সম্ভব। যেমন, মজ্জা থেকে নেওয়া স্টেম কোষকে স্নায়ুর কোষে বদলে দেওয়া সম্ভব। আবার এর থেকে হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্কের কোষও তৈরি করা যায়। একই ভাবে স্টেম কোষকে সিসিআর-৫ এর মতো বাহক কোষেও বদলে দেওয়া সম্ভব। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। দাতার শরীর থেকে নেওয়া সুস্থ স্টেম কোষকে গবেষণাগারে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে, যার নাম ‘ইনডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল’ (আইপিএস)। এই আইপিএস কোষকে যে কোনও কোষে বদলে দেওয়া সম্ভব। এ ভাবেই নতুন কোষ প্রতিস্থাপন করে ভাইরাসের শরীরে ঢোকার বা ছড়িয়ে পড়ার পথটাই অবরুদ্ধ করে দিচ্ছেন গবেষকেরা। রোগও সারছে এ ভাবেই।
স্টেম কোষ থেরাপি সব ক্ষেত্রে কার্যকর হলে, আগামী সময়ে এডসের মতো মারণ রোগকেও চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে বলেই আশা রাখা হচ্ছে।