Competition of Raising Children

ইঁদুরদৌড়ে শামিল অভিভাবকেরাও

সন্তানকে বড় করতে গিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন বাবা-মায়েরা। কোন পথে সমাধান?

সায়নী ঘটক
শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১০

বাচ্চাদের স্কুলের সামনে মা-বাবাদের জটলা। আলোচনা চলছে নানা বিষয় নিয়ে। অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বন্ধুত্ব। সঙ্গে কারও কারও মধ্যে রেষারেষি, চাপা প্রতিযোগিতাও। এখন সশরীর উপস্থিত না থাকলেও ওয়টস্যাপ গ্রুপগুলিই যথেষ্ট এই ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তোলার জন্য। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিশুদের উপরে। না বুঝেই তারাও বন্ধুকে প্রতিযোগী ভাবতে শুরু করছে, দাগিয়ে দিচ্ছে ক্লাসে কারা ‘ভাল’ আর কারা ‘খারাপ’, তৈরি করে নিচ্ছে দল। সর্বোপরি, পড়াশোনা ও তার বাইরেও সারাক্ষণ নানা ব্যাপারে নিজের সঙ্গে পাশের জনের তুল্যমূল্য বিচার করে চলেছে তারা।

নম্বরে যায় চেনা

পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বললেন, “বাচ্চারা পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, সাধারণত বাবারা এতে তেমন মাথা ঘামান না। কর্মরতা বা গৃহবধূ মায়েরা বেশির ভাগ সময়েই পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামান। সম্প্রতি আমার কাছে এক মা-মেয়ে এসেছিল, যেখানে মেয়েটি তাদের ক্লাসের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর কমিয়ে বলেছে মাকে। ভাল ফল করতেই হবে, এ ব্যাপারে কতটা চাপে থাকলে বাচ্চারা এটা করতে পারে,” বললেন পায়েল। তাঁর কথায়, অনেক মা-বাবাই বলেন, তাঁরা বাচ্চাকে চাপ দেন না, কিন্তু আসলে দেন। ভাল রেজ়াল্ট করলে, পুরস্কার পেলে ফলাও করে তা ছবিসহ পরিবার বা বন্ধুদের ওয়টস্যাপ গ্রুপে পোস্ট করেন। অতিরিক্ত শাসন বা স্তুতি, দুটোই যেমন বাচ্চাটির পক্ষে ক্ষতিকর, তেমনই গ্রুপে থাকা অন্য মা-বাবাদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার কারণও এটি। সন্তানের কৃতিত্ব অবশ্যই গর্ববোধ করার মতো। তার উদ্‌যাপনও অন্যায় নয়। কিন্তু সেই উদ্‌যাপন যদি তারই সন্তানের মতো আর দশটি বাচ্চার হীনম্মন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা কখনওই কাম্য নয়। অনেক অভিভাবক অন্যের সন্তানের অগ্রগতি নিয়ে নানা মন্তব্য করেন, যা তাঁর সন্তানের মনোবল ভেঙে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এগুলো নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে স্রেফ এড়িয়ে চলুন।

বিষয়-আশয়

একটি ক্লাসে ৫০-৬০জনের মধ্যে বিভিন্ন আর্থিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে আসা শিশুরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। সেখানে তারা সকলেই এক। কিন্তু কে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছে, কে কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পরছে, তা নিয়ে যদি সমাজমাধ্যম বা তার বাইরে অতিরিক্ত ‘শো-অফ’ করেন বাবা-মায়েরা, তার প্রভাব সরাসরি পড়ে শিশুদের উপরে। দামি রেস্তরাঁ বা শপিংমলে গিয়ে, কিংবা দুর্দান্ত কোনও জায়গায় বেড়াতে গিয়ে কেউ ছবি পোস্ট করতেই পারেন। তবে সেই ছবির কারণে মনে মনে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লে মুশকিল। পায়েল বললেন, “আপনার সন্তান যদি কোনও দিন স্কুল থেকে ফিরে বলে, ‘মা, গরমের ছুটিতে ঋষভ আর ও মা-বাবা মলদ্বীপ বেড়াতে যাচ্ছে, আমরাও যাব’, তখন আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে কেন এই অনর্থক প্রতিযোগিতা করা অনুচিত। সন্তানের ইচ্ছেকে সম্মান করেই তাকে বোঝান। ‘আমরাও একদিন ঠিক যাব’ গোছের স্তোকবাক্য বলবেন না। আপনারা আপনাদের সাধ্য অনুযায়ী বেড়াতে যাবেন, আর তাতে আনন্দ এতটুকুও কম পড়বে না, সে কথা ভাল ভাবে সন্তানকে বোঝান।”

সন্তানের সহপাঠীর অভিভাবক যদি দামি ব্যাঙ্কোয়েটে বাচ্চার জন্মদিন পালন করেন ও আপনাদের নিমন্ত্রণ করেন, তাঁর সমকক্ষ হতে গিয়ে আপনাকেও একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে, না হলে সামাজিক ভাবে মুখরক্ষা হবে না— এই ভাবনা থেকে বেরোতে হবে। পায়েল বললেন, “আমি এমন লোককেও দেখেছি, যাঁরা ধার করে ধুমধাম করে জন্মদিন পালন করছেন। অনেক অভিভাবকই এই সামাজিক চাপ সামলাতে পারেন না।” তাঁর পরামর্শ— আপনি যদি মনে করেন, বাচ্চার বন্ধুদের বাড়িতে ডেকে লুচি-মাংস রেঁধে খাওয়াবেন, তা-ই করুন। আবার যদি ব্যাঙ্কোয়েট ভাড়া করে উদ্‌যাপন করতে ইচ্ছে হয়, তা-ই করুন। অর্থাৎ নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিন। কাউকে কিছু দেখাতে যাবেন না। বাচ্চাকেও সেই মতোই বোঝান, যাতে বন্ধুদের সামনে ও হীনম্মন্যতায় না ভোগে। তবে বাচ্চাকে বোঝানোর আগে নিজেকে সে কথায় বিশ্বাস করতে হবে। কে কত দামি পোশাক পরল বা গাড়ি চড়ল... বৈভবের প্রদর্শন যে মানুষকে বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না, সে শিক্ষা অভিভাবকদের কাছ থেকেই পায় ছোটরা। তবে সেই শিক্ষা যেন সৎ হয়, দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে বোঝাবেন না। কোনও কিছু না পাওয়ার দুঃখটাও যে যাপন করতে হয়, তা-ও ছোটদের শেখানো জরুরি।

কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে

কে কোথায় চাকরি করেন, কার সামাজিক প্রতিপত্তি কতখানি— অভিভাবকদের মধ্যে এই নিয়েও রেষারেষি চলতে থাকে। এই করতে গিয়ে অনেক সময়ে অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যে গ্রুপ তৈরি হয়, তারা একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এ দিকে দেখা যাচ্ছে, তাদের সন্তানদের বন্ধুর দল হয়তো আলাদা। মায়ের বন্ধুর দল যে ভাবে তৈরি হল, বাচ্চাটিও সেই অনুযায়ী বন্ধুর দলে শামিল হতে বাধ্য হল। অথচ ক্লাসে হয়তো অন্য কারও পাশে বসে সে। অভিভাবকেরা নিজেদের মধ্যেবন্ধুত্ব করতেই পারেন, কিন্তুবাচ্চাটির পছন্দ-অপছন্দকেওপ্রাধান্য দিতে হবে।

এই অনর্থক প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার সেরা উপায় হল, শুধু প্রয়োজনের ওয়টস্যাপ গ্রুপগুলিতে থাকুন। স্কুল সংক্রান্ত তথ্য জানা ছাড়া আর কোনও আলোচনায় শামিল না হওয়াই ভাল। যে আলোচনা থেকে আপনার মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে, তা নিজেদেরই চিহ্নিত করে সরে আসতে হবে। বাচ্চার কাছে মা-বাবার মান্যতা পাওয়াই শেষ কথা। তাই কে কী বলল, তা নিয়ে বিচলিত হবেন না।


মডেল: দীপশ্বেতা মিত্র, সঞ্চারী মণ্ডল, নিকিকেতা ঘোড়ুই,আরাধ্যা নন্দী

হেয়ার: সুজয় বণিক

ছবি: সর্বজিৎ সেন, অমিত দাস

লোকেশন: অঞ্জলি কুঞ্জ, বারুইপুর

আরও পড়ুন