বাজেট পেশের আগে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। — নিজস্ব চিত্র। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
কেন্দ্রের বাজেটে আর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাজেটের মধ্যে দৃশ্যগত তফাত আছে। কেন্দ্রে যিনিই অর্থমন্ত্রী হোন, তিনি তাঁর বাজেটের নথিপত্র একটি বিশেষ ব্যাগে ভরে সেই ব্যাগ হাতে এসে দাঁড়ান সংসদ ভবনের সামনে। তাঁর ছবিও ওঠে। কে কী ব্যাগ নিয়ে এলেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। রাজ্য বাজেটে সেই আলোচনা বিরল ছিল এত দিন। তবে এ বার সেই আলোচনা হল। সোমবার পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের বাজেট পেশ করলেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। আর তিনি বাজেটের নথিপত্র বিধানসভায় নিয়ে এলেন একটি বিশেষ ফাইলে ভরে। সেই ফাইল নিয়েই এখন জোর আলোচনা।
অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত এই ফাইল নিয়েই হাজির হয়েছেন বাজেট পেশ করতে। — নিজস্ব চিত্র।
চটের তৈরি ফাইলে মাদুরকাঠির অর্ধচন্দ্রাকৃতি নকশা। ডান দিকের উপরের কোণে রুপোলি ধাতব অশোকস্তম্ভ। বাহুল্য বর্জিত ওই ফাইল দেখে অনেকেই তার স্মার্টনেস নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আবার বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের পাটশিল্পের নবজন্মের বার্তা রয়েছে ওই ফাইলে। সে অনুমান ভুল না-ও হতে পারে।
নির্মলা সীতারামনের খেরোর খাতার কায়দায় লাল শালুতে মোড়ানো বাজেটের নথি। ছবি: সংগৃহীত।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যেমন চামড়ার ব্যাগের বাজেটকে খেরোর খাতার মতো লাল শালুতে মুড়ে এনে সনাতনী সংস্কৃতির বার্তা দিয়েছিলেন। পরে আবার তিনিই বাজেটকে বানান ‘পেপারলেস’ অর্থাৎ কাগজহীন। পুরো নথিই থাকে ট্যাবে। সেই ট্যাব খেরোর খাতার মতোই উজ্জ্বল লাল মোড়কে। যার উপরে অশোকস্তম্ভের ছাপ। এ বার রাজ্য বাজেটেও সেই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা গেল।
তবে বঙ্গে বাজেটে অমন ফাইল প্রথম স্বপনই আনলেন তা নয়। সংস্কৃতিটি প্রথম চালু হয়েছিল তৃণমূল জমানাতেই।
২০২৫ সালের বাজেট বক্তৃতার আগে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। সে বছর প্রথম বাজেটের ফাইলে ছিল শীতলপাটি আর চটের মোড়ক। ছবি: সংগৃহীত।
২০২৫ সালের রাজ্য বাজেটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও এমনই একটি ফাইলে এনেছিলেন বাজেটের নথি। সেই ফাইলটি তৈরি করা হয়েছিল শীতলপাটি আর চট দিয়ে। শীতলপাটিও এ রাজ্যের পুরনো শিল্পের মধ্যে একটি।
বাঁধানো খাতার মতো ফাইলে বাজেট পেশ করেছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমাও। ছবি: সংগৃহীত।
তার আগে যদিও বাজেট কোনও বিশেষ মোড়কে মুড়ে আনার চল ছিল না এ রাজ্যে। বাজেট ছিল আক্ষরিক অর্থে খোলা খাতার মতোই। চন্দ্রিমা ২০২৩, ২০২৪ সালে তেমনই বাজেটের খাতা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিধানসভায় বাজেট পেশ করতে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে বাজেটির ফাইল তুলে দিচ্ছেন তৃণমূল জমানার অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। ছবি: আনন্দবাজারের আর্কাইভ থেকে।
তৃণমূল সরকারের তার আগের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রও একই রকমের স্পাইরাল বাইন্ডিং করা খাতায় বাজেট পেশ করেছেন।
বাম জমানার অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তের হাতে বাজেটের দিনে কখনও সখনও থেকেছে চামড়ার অফিস পোর্টফোলিও ব্যাগ। আবার কখনও সখনও তিনিও হাতে করে মোটা বাজেটের খাতাই নিয়ে এসেছেন বিধানসভায়।
১৯৯৬ সালে বাজেট পেশের আগে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত। হাতে চামড়ার পোর্টফোলিও ব্যাগ। ছবি: আনন্দবাজারের আর্কাইভ থেকে।
স্বপন তাঁর নিজস্বতা তৈরি করলেন। চট এবং মাদুরকাঠির শিল্প যে এ রাজ্যে কাঙ্খিত উড়ান পায়নি, সে অভিযোগ বহু কালের। অথচ চট বা মাদুরের তৈরি জিনিসের চাহিদা নেই তা নয়। স্মার্ট দেখতে চটের ব্যাগ অধিক দাম দিয়েও কিনে আনেন শহরাঞ্চলের শৌখিনীরা। চট-মাদুরের তৈরি ক্লাচ ব্যাগ, টোট ব্যাগ, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, কুশন কভার, টেবিল রানার, ফটো ফ্রেম এমনকি গয়নাগাটিরও চাহিদা রয়েছে। মেলায়, বুটিকে গিয়ে সেই সমস্ত জিনিস কিনে এনে ঘর সাজান শহরের মানুষজন।
অর্থমন্ত্রী স্বপনের বাজেটের ফাইল দেখে যদি চট এবং মাদুরকাঠির শিল্প উৎসাহিত হয় তবে সাধারণ মানুষের লাভই হবে।