Kashida Handicraft

সুর বুনে যায় চিনার-গুলাবে

কাশ্মীরের উপত্যকা জুড়ে ঝরে যাওয়া চিনার পাতা, আনার বা গোলাপবাগের সৌন্দর্য গাঁথা হয়ে যায় কাশিদাকারির মায়াজালে

নবনীতা দত্ত
শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১২
ছবি: সায়ন্তন দত্ত

ছবি: সায়ন্তন দত্ত

ওয়েসিয়ে গুলান আমে বাহার/ আজ় সাল আন্তান বালেয়া...

বসন্ত এসে গিয়েছে, এই প্রেমের ঋতুতে প্রিয়তমকে গানের সুরে ডাকছে প্রেয়সী। রাজ বেগমের বিখ্যাত গানের সুর এখনও ভেসে বেড়ায় ফিরান, পশমিনা শালের বুকে ফুল-পাতার নকশা ছুঁয়ে। কাশ্মীরের প্রত্যেকটা পেশার সঙ্গে জুড়ে জুড়ে থাকে সুর। ফসল তোলার, পশমিনা বোনার... সবের গান আলাদা। এক একটা ফিরান বা পশমিনা হাতে বুনতে মাসের পর মাস ঘুরে যায়। সময় বয়ে যায় সুরে আর নকশায়। গানের শব্দই যেন ছবি হয়ে ফুটে ওঠে কাপড়ের জমিতে।

রিন্দ পোশ মাল...

কাশ্মীরের যাপনচিত্র জুড়েই কাশিদাকারি। এই উপত্যকায় কোনও নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা যায় না এই শিল্পের জন্য। নিউ মার্কেটের ১০০ বছরের পুরনো দোকান পমপোশের ম্যানেজার কাইয়ুম রোশন বললেন, “সারা কাশ্মীরই যেন কাশিদাকারির কারখানা। প্রত্যেক ঘরে ঘরে পুরুষ-মহিলা জুড়ে আছেন এই পেশার সঙ্গে। সকাল হতেই ঘরকন্নার কাজ সেরে তাঁরা বসে পড়েন কাপড় আর সুচ-সুতো নিয়ে। তবে কোনও একজন নয়, দলবদ্ধ ভাবে একাধিক মানুষের শ্রমেই তৈরি হয়ে ওঠে এক-একটা শাল, ফিরান, শাড়ি, শেরওয়ানি।” এক একটা পোশাক তৈরির পিছনে জুড়ে থাকে এক-একটা গ্রাম বা পাড়া। একই গানের তালে তালে নকশা ওঠে সুচের ফোঁড়ে। ফলে একটা ছন্দ থাকে এই বুননে।

কাশিদাকারির নকশায় বেশির ভাগই কাশ্মীরের পরিবেশ-প্রকৃতি উঠে এসেছে মোটিফে। যেমন গোলাপ, পদ্ম, লিলি, নীলরঙা আইরিশ বা আনার, জাফরান ফুল, ময়ূর বোনা হয়ে যায় রংবেরঙের সুতোয়, পোশাকের জমিতে। অনেক সময়ে আবার মোগল মোটিফও মিশে গিয়েছে এই সূচিশিল্পে। পারসি জ্যামিতিক নকশাও কখনও কখনও দেখা যায়। তবে মানুষের অবয়ব প্রায় নেই এই ধরনের নকশায়, যে ধরনের সেলাই কাঁথা বা মধুবনীতে দেখা যায়। কাশিদাকারির উৎস-সন্ধানে গেলে এর কারণ বোঝা যায়। জনশ্রুতি, সুলতান জ়ায়েন উল-আবিদিনের হাত ধরেই কাশিদাকারির কাজ শুরু হয় কাশ্মীরে। এই শিল্পের সঙ্গে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের পরিচিতি তাঁর সূত্রেই। সুলতান ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক। মূলত পারিপার্শ্বিক ফুল-পাতা, প্রকৃতি নিয়েই কাজ পছন্দ করতেন। ফলে কাশ্মীরের ফ্লোরা-ফনা জায়গা করে নেয় পোশাকের জমিতে। পরে আফগান-মোগল রাজত্বকালে, ক্রমে ক্রমে নতুন মোটিফ তৈরি হয়েছে। আমলি শাল যেমন মোগলদের অবদান। আফগানদের হাত ধরে তৈরি হয়েছে চন্দর বা চাঁদশাল। এই দুই শালের নকশাই বেশ ভরাট।

দিলবারো...

কাশ্মীরের বহুমূল্য শাল আবার বিয়ের উপহার। চন্দর বা চাঁদশাল, আমলি শালও দেওয়া হয় বিয়ের তত্ত্ব বা ভেট-এ। পাড়া-পড়শিদের হাতে বোনা শাল সঙ্গী হয় নববধূর নতুন জীবনের সূচনায়। শ্বশুরবাড়িতেও তা নিজের পরিবেশ, মানুষের উপস্থিতি মনে করায়। তবে এই কাপড়ের বুনন খুব সহজ নয়। শালের পশম বা ফিরানের কাপড় অনুযায়ী বাছা হয় সুচ ও নকশা।

কোথাও সূক্ষ্ম সরু সুচের ব্যবহার, কোথাও আবার বড়শির মতো হুক আকৃতির সুচ। আড়ি কাজে ব্যবহার হয় এই হুক-শেপড সুচ আর সোজ়নির কাজে সূক্ষ্মতা ধরে রাখে সরু সুচ। আড়ি ও সোজ়নিতে সুচ-সুতোর বুননে যে সেলাই ফুটে ওঠে পশমি কাপড়ে, সেটাই পরিচিত কাশিদাকারি নামে। কোনও একটা সেলাই নয়, বরং একাধিক সেলাইয়ের মিশেলেই তৈরি এই সূচিশিল্প। এর আর একটি বৈশিষ্ট্য হল, প্রত্যেকটা ধাপেই কাজ এগোয় বিভিন্ন শিল্পীর তত্ত্বাবধানে। সকলের আগে তৈরি হয় হাতে বোনা ফ্যাব্রিক। সেই ফ্যাব্রিকের রঙের সঙ্গে মানিয়ে কোন কোন রঙের সুতোয় কাজ হবে তা ঠিক করে দেন তরশ-গুরু বা মাস্টার আর্টিজ়ান। ফিরোজ়ি, গুলনার (ক্রিমসন রেড), কেশর, সাদা রঙের ব্যবহারই বেশি দেখা যায়। পরবর্তী কালে কাশ্মীরে শিখদের প্রবেশের পরে গাঢ় নীল, গোলাপি, হলুদের মতো প্রাথমিক রঙের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তৈরি হয় দো-রুখা শাল, যার দু’পিঠেই নকশা। ফলে দু’দিকই গায়ে দেওয়া যায়। ক্রমশ বুননেও বদল আসে, ধরা পড়ে শিকারগড় মোটিফ।

তবে কোন মোটিফ বা নকশা কোন স্টিচে বোনা হবে, সেটা ঠিক করেন সূচিশিল্পী। তিনিই বলে দেন ফুলপাতার নকশায় কোন সেলাই হবে। এর পরে স্থানীয় শিল্পীরা মিলে শুরু করবেন সোজ়নি বোনা। সোজ়নিতে হেরিংবোন, ডার্নিং, ডাবল ডার্নিং বা নট দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। আড়ি কাজে আবার চেন স্টিচ, জ়ালাকদোদোজি বা ডোরিয়া করে ভরানো হয় নকশা। ফিরানের উপরে এই আড়ি কাজই বেশি দেখা যায়। সোজ়নিও করা যায় ফিরানে। তবে পশমিনা বা কানির উপরে শুধু সোজ়নির কাজই দেখা যায়। এই ধরনের কাপড় এত সূক্ষ্ম যে সরু সুচেই ফোঁড় তোলা হয়।

কাইয়ুম রোশন বললেন, “আগে লাদাখে হিমালয়ের বিশেষ প্রজাতির ভেড়ার লোম থেকে তৈরি হত পশমিনা। এখন তা নিষিদ্ধ। ফলে কাশ্মীরের স্থানীয় ভেড়ার গায়ের লোম থেকেই তৈরি করা হয় পশমিনা। কিন্তু সেই লোমও পুরো ব্যবহার করা যায় না। ভেড়ার গায়ের লোমের ৭৫ শতাংশই প্রায় নেওয়া যায় না। একেবারে ভিতরের দিকের সূক্ষ্ম তুলোর মতো লোম দিয়ে তৈরি হয় এই শাল। আর তা বুনতে প্রায় বছর ঘুরে যায়। সেই জন্যই পশমিনার দামও বাড়তে থাকে। তবে যত হালকাই হোক, পশমিনার ওমের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা অন্য শীতবস্ত্রের নেই,” বলে দাবি তাঁর। এই পশমিনা কাপড়েও ফিরান বোনা যায়। কিন্তু তা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ।

বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীর উপত্যকার সৌন্দর্য পোশাকের ক্যানভাসে ধরে রাখেন শিল্পীরা। ভূ-স্বর্গই যেন নেমে আসে কাশিদাকারির কাজে। কলকাতার শীতেও গা ছুঁয়ে সন্ধে নামে আনার, চিনার, গোলাপের বাগিচায়।


মডেল: মধুরিমা চক্রবর্তী; মেকআপ: নব মাইতি; হেয়ার: সুজয় বণিক; স্টাইলিং: প্রলয় দাশগুপ্ত; পোশাক: পমপোশ,
নিউ মার্কেট; গয়না: করিশমাজ়, গোলপার্ক; লোকেশন: ওজ়োরা, অ্যাক্রোপলিস মল

আরও পড়ুন