কোন শাড়িতে কোন গয়না কথা বলবে? — নিজস্ব চিত্র।
কিছু দিন আগেই দেখলাম, রানি মুখোপাধ্যায় ডিজ়াইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়ের নকশা করা পান্না-সবুজ সিল্ক শাড়ির সঙ্গে গলায়, কানে পরেছেন সব্যসাচীরই ডিজ়াইন করা হিরে, মুক্তো খচিত সোনার গয়না। মুক্তোয় গাঁথা বেশ বড় পেন্ডেন্ট। কানের দুলও বেশ বড়। বিয়েবাড়ির সাজ। নজরকাড়া চওড়া জরি পাড়, শাড়ির জমি জুড়ে ফুলের বুটি, সঙ্গে গোল্ডেন ব্লাউজ়ে রাজকীয় মেজাজ। ঘাড়ের কাছে ছোট খোঁপা। চোখে কাজল আর কপালে ছোট্ট টিপ। সব্যসাচীর অল টাইম ফেভারিট। সব্যসাচীর স্টেটমেন্ট পিসের ধারণায় ‘মোর ইজ মোর’। এলাহি, ভরভরন্ত একটা ব্যাপার। সব্যসাচীর এই ধারণা নিয়ে আলাদা কলাম লিখব কোনও সময়ে। এখন চলুন, সাজপোশাকে গয়নার ভূমিকা কতখানি, তাই নিয়ে দু-চার কথা বলা যাক।
সাজগোজ ব্যাপারটা অনেকাংশেই ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের উপর নির্ভরশীল। কোন শাড়ি বা কোন পোশাকের সঙ্গে কেমন গয়না মানাবে, তার যেমন একটা ব্যাকরণ আছে, তেমনই আছে ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। তার পর আছে ফ্যাশনের হিড়িক, সিনেমার প্রভাব। কেউ সোনার গয়নাই শুধু পছন্দ করেন, কেউ আবার রুপো ছাড়া কিছুই ভালবাসেন না। এমনকি, বিয়েবাড়িতেও রুপোর গয়না জিন্দাবাদ। আমি নিজেও বেজায় পছন্দ করি রুপোর গয়না। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ফ্যাশন সাম্রাজ্যে রুপোর গয়না বেশ মধ্যমণি হয়ে বসেছিলেন। এখনও আছেন, তবে রমরমা যেন কিঞ্চিৎ ম্লান। রুপোর আকাশছোঁয়া দামের মোকাবিলায় জন্ম নিল অক্সিডাইজ়ড মেটালের গয়না। এই গয়না আগেও ছিল, কিন্তু এখন ডিজ়াইনের মুনশিয়ানায় অনেকটা এগিয়ে।
কোন শাড়ি বা কোন পোশাকের সঙ্গে কেমন গয়না মানাবে, তার যেমন একটা ব্যাকরণ আছে, তেমনই আছে ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। — নিজস্ব চিত্র।
একটা সময় ছিল যখন বিয়ে বা অনুষ্ঠান বাড়িতে কোন দিন কোন সেট পরা হবে, তা নিয়ে বিস্তর ভাবনাচিন্তা চলত অনুষ্ঠানের মাসখানেক আগে থেকে। এক দিন হিরে পান্নার সেট, তো আরেক দিন নবরত্ন। এক দিন সীতাহার, মানতাসা, তো আরেক দিন মুক্তো, পলা। তা ছাড়া সারা বছরের জন্য বারোমেসে হার, কানের ফুল, হাতে দু’গাছা চুড়ি। সময় বদলায়, বদলায় জীবনযাপনের ধারা। তার প্রভাব পড়ে সাজপোশাকেও। এই সব গয়নার চল আজ যে নেই তা নয়, কিন্তু পাশাপাশি উঠে এসেছে আভরণের নব বিবরণ। সোনা, রুপো ছাড়াও আরও নানা ধরনের গয়নার চল হয়েছে ইদানীং।
সোনা, রুপো ছাড়াও আরও নানা ধরনের গয়নার চল হয়েছে ইদানীং। — নিজস্ব চিত্র।
তামা, পিতল, চামড়া, সুতো, কাঠ, পুঁতি, তার, সেরামিকস— হরেক উপকরণে হরেক রকম সম্ভার। কত গুণী ছেলেমেয়ে কি দারুণ দারুণ কাজ করছেন আজকাল! সেই সব খোঁজ করতে গিয়েই দেখা হল মেঘনা মিত্রের সঙ্গে। শান্তিনিকেতনের কলাভাবনে তাঁর পাঠ শুরু। সব সময় নতুন কিছু করার তাগিদে মন তাঁর অস্থির। পিতল, তামা, সেরামিক, ন্যাচারাল বিডস— হরেক রকম উপকরণে টইটম্বুর মেঘনার গয়নার বাক্স। নিতান্তই ফেলাছড়ার তামা-পিতলে নান্দনিক গল্প লেখেন তিনি। “কলাভবন থেকে পাশ করার পর এনআইএফটি-তে কাজ শুরু করি। নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়। শান্তিনিকেতনের কেয়া সরকারের উৎসাহে তামা, পিতলের গয়না বানাতে শুরু করি। কেয়াদির স্টোর ‘আলচা’-য় আমার বানানো গয়না বেশ বিক্রি হতে শুরু করে। সেই শুরু। কাজটা করে খুব আনন্দ পাই”, হাসতে হাসতে বলেন মেঘনা। আজ তাঁর বাড়ি থেকেই চলছে এই গয়নার ব্যবসা। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর কাজের সুনাম।
পোশাক এবং গয়নার পারস্পরিক সংলাপে একটা নিটোল গল্প যেন তৈরি হয়। — নিজস্ব চিত্র।
শাড়ি বা অন্য যে কোনও পোশাকের সঙ্গে আমরা যখন গয়না পরি, তখন উদ্দেশ্য একটাই। পোশাক এবং গয়নার পারস্পরিক সংলাপে একটা নিটোল গল্প যেন তৈরি হয়। সেই গল্পে কখনও গয়না একাই একশো, কখনও আবার সঙ্গী-সাথী জুটিয়ে গৌরবে বহুবচন। মেঘনার কালেকশন থেকে তেমন গয়নাই বেছেছিলাম, যা স্টেটমেন্ট পিস হিসেবে কাজ করবে। আর তখনই মনে পড়ল শাশ্বতীর কথা। বিশিষ্ট ওড়িশি নৃত্শিল্পী শাশ্বতী গড়াই ঘোষ। নাচই তাঁর নেশা এবং পেশা। গড়ে তুলেছেন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘অঙ্গশুদ্ধি’। উৎসাহী ছাত্রছাত্রীদের তালিম দেন একান্ত যত্নে। এই নান্দনিক পরিসরেই শাশ্বতীকে সাজানো হল মেঘনার গয়নায়।
(মডেল: শাশ্বতী গড়াই ঘোষ, ছবি: সহেলী দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও পরিকল্পনা: শর্মিলা বসুঠাকুর।)