Teddy Bear

শিশুদের খেলনা আবার বড়দেরও আদরের! নরমসরম ভালুকছানা ‘টেডি’ বিশ্বযুদ্ধের মনখারাপও সামলেছে

টেডি বিয়ারের আবেদন যতটা শিশুদের খেলনা হিসাবে, ততটাই বড়দের মন ভাল করার ঠিকানা হিসাবেও। কিন্তু জঙ্গলের এক হিংস্র জন্তু এমন মন ভাল করা খেলনা হয়ে উঠল কী ভাবে?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫১
পুতুল শুধু পুতুল নয়! টেডি বিয়ারের গল্প।

পুতুল শুধু পুতুল নয়! টেডি বিয়ারের গল্প। ছবি : শাটারস্টক।

মনখারাপ কাটাতে একখানা ‘জাদু কী ঝপ্পি’ই যথেষ্ট— বলেছিল মুন্নাভাই। ‘ঝপ্পি’ মানে জড়িয়ে ধরা। তবে তাতে ‘জাদু’ তখনই হবে, যখন জড়িয়ে ধরার পাশাপাশি তা দেবে ভরসা, নিরাপত্তার অনুভূতি, আগলে রাখার বোধ। শুধু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলে সেই অনুভব আসা মুশকিল। জড়িয়ে ধরতে হবে সর্বাঙ্গে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘বিয়ার হাগ’। কিন্তু যখন-তখন তো তেমন ‘বিয়ার হাগ’ করার মানুষ হাতের নাগালে মেলে না। তখন সম্বল হয় নরমসরম ফুলোফুলো টেডি বিয়ার। তাকে বুকের কাছে টেনেই মেলে মনের শান্তি আর আরাম। টেডি বিয়ারের আবেদন তাই যতটা শিশুদের খেলনা হিসাবে, ততটাই বড়দের মন ভাল করার ঠিকানা হিসাবেও।

Advertisement

কিন্তু জঙ্গলের এক হিংস্র জন্তু এমন মন ভাল করা খেলনা হয়ে উঠল কী ভাবে?

১০ ফেব্রুয়ারি গোটা দুনিয়া ‘টেডি ডে’ হিসাবে পালন করে। সেই টেডি আসলে এল কোথা থেকে? কোনও খেলনা প্রস্তুতকারী সংস্থা বা মার্কেটিং গিমিক নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে এক প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, এক রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রী আর এক ক্যান্ডিবিক্রেতা দম্পতির গল্প।

ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত কার্টুনে ভালুকছানার ছবি।

ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত কার্টুনে ভালুকছানার ছবি। ছবি: সংগৃহীত।

ঘটনার শুরু ১৯০২ সালের নভেম্বরে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তখন থিয়োডোর রুজ়ভেল্ট। সেই নভেম্বর মাসেই তিনি ভালুক শিকার করতে গেলেন মিসিসিপিতে। সঙ্গী হলেন পার্ষদ এবং অন্য শিকারিরা। অনেক খুঁজেও যখন ভালুক মারা গেল না, তখন সঙ্গী শিকারিরা একটি ভালুকশিশুকে বেঁধে হাজির করলেন প্রেসিডেন্টের সামনে, যাতে তিনি সেটি তাক করে মারতে পারেন। কিন্তু রুজ়ভেল্ট সেই বেঁধে রাখা শিশু ভালুককে মারতে মোটেই রাজি হলেন না। সঙ্গীদের জানিয়ে দিলেন, তিনি শিকারে বেরিয়েছেন, এ ভাবে ভালুকশিশুকে হত্যা করা হলে তাকে আর যা-ই হোক, শিকার বলা চলে না। শিকার করতে অস্বীকার করা রুজ়ভেল্টের ঘটনাটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রী ক্লিফোর্ড বেরিম্যান একটি কার্টুনও এঁকে ফেললেন রুজ়ভেল্ট আর ওই শিশুভালুককে নিয়ে। কার্টুনটি ছেপে বেরোল ওয়াশিংটন পোস্টে। কে জানত ১২৪ বছর আগে আঁকা সেই ছবিই আগামী দিনে টেডি বিয়ারের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে দেবে।

ওয়াশিংটন পোস্টে বেরোনো সেই কার্টুনে ভালুকশাবকের মিষ্টি ছবি দেখে সেটির মতো পুতুল বানানোর ভাবনা আসে ব্রুকলিনের এক মিষ্টিবিক্রেতা মরিস মিসটম এবং তাঁর স্ত্রী রোজ়-এর মাথায়। দোকানে সাজানোর জন্য পশম, তুলো এবং কাপড় দিয়ে একটি ভালুকশাবকের পুতুল তৈরি করেন মিসটমদম্পতি। কাচের শো-কেসে সেই পুতুল সাজিয়ে তার সঙ্গে লাগিয়ে দেন একটি সাইন বোর্ড। তাতে লেখা ‘টেডি’জ় বিয়ার’। কারণ, ‘টেডি’ প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজ়ভেল্ট-এরই ডাকনাম।

মিস্টার বিনের টিভি শো-এ তার টেডির জনপ্রিয়তাও কম ছিল না।

মিস্টার বিনের টিভি শো-এ তার টেডির জনপ্রিয়তাও কম ছিল না। ছবি: সংগৃহীত।

সেই পুতুল ক্যান্ডিশপের শো-কেসে দেখে মানুষ আপ্লুত হলেন। পুতুলটির জনপ্রিয়তা দেখে কিছু দিনের মধ্যেই ক্যান্ডিবিক্রেতা মরিস টেডি বিয়ার তৈরি করা শুরু করলেন। বাড়তে লাগল বিক্রি। শেষে খুলে ফেললেন একটি খেলনা তৈরির কোম্পানিও, যারা শুধুই ভালুকশাবকের নরম পুতুল বানাবে।

খানিকটা একই সময়ে জার্মানির এক ব্যবসায়ী মার্গারেট শেরিফের সংস্থাও একই ধরনের নরম ভালুকশাবকের পুতুল তৈরি করতে শুরু করে, যা ইউরোপের পাশাপাশি আমেরিকাতেও খ্যাতি পায়।

এই ভাবেই সম্পূর্ণ অদ্ভুত কয়েকটি ঘটনা থেকে জন্ম নেয় টেডি বিয়ার, যার জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। ১৯২০ সালের মধ্যে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির শিশুদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় খেলনা ভালুক। জন্মদিন, বড়দিনের উপহার বা যে কোনও উৎসবের উপহারেও দেখা যেতে থাকে টেডি বিয়ার।

ঘরের কথা মনে করার জন্য বিশ্বযুদ্ধে যাওয়া সেনাদের সঙ্গী হত টেডি।

ঘরের কথা মনে করার জন্য বিশ্বযুদ্ধে যাওয়া সেনাদের সঙ্গী হত টেডি। ছবি: সংগৃহীত।

সেই বিপুল জনপ্রিয়তার প্রভাব পড়ে বিনোদনজগতেও। মিস্টার বিনের টেডি, উইনি দ্য পু, মাপেট শো-এর ফ্রজি বিয়ার-এর মতো চরিত্র দেখা যেতে শুরু করে টিভিতে। ১৯৫৭ সালে টেডি বিয়ার নিয়ে গানও গেয়ে ফেলেন খোদ এলভিস প্রেসলি। ১৯৬০ সালের মধ্যে ছোট্ট শিশুদের বিছানা থেকে শুরু করে বড়দের কোলেও দেখা যেতে থাকে ছোট-বড় টেডি। সে তখন আর নিছক খেলনা নয়। অনেক আবেগ, অনেক ভাললাগার সঙ্গী। বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনারা সঙ্গে টেডি বিয়ার নিয়ে যেতেন বাড়ির কথা এবং বাড়িতে ফেলে আসা সুখপ্রদ সময়ের কথা মনে রাখার জন্য।

পেটে তুলো ভরা লোমশ এবং নরমসরম ভালুক পুতুল! প্রথম দিন থেকে এর রূপ নানা সময়ে নানা ভাবে বদলেছে। ছোট থেকে বড় এমনকি, দৈত্যাকারও হয়েছে। প্রথমে বোতাম দিয়ে তৈরি করা হত টেডি বিয়ারের চোখ। পরবর্তী কালে সেই চোখ আলাদা ভাবে বানানো হয়েছে। বদল এসেছে রঙে এবং সাজসজ্জাতেও। কিন্তু এর আবেদন বদলায়নি। ডিজিটাল, স্মার্টফোনের জগতেও এই খেলনার আবেদন কমেনি এক চিলতে।

বরং সমীক্ষা বলছে, মন ভাল করার ওষুধ হিসাবে এটি ক্রমেই ভরসার জায়গা তৈরি করেছে নিজের। একা থাকে যে শিশুরা তাদের সর্ব ক্ষণের সঙ্গীর অভাব মিটিয়েছে টেডি। আবার বড়রাও অনেকে ছোটবেলার টেডি বিয়ারকে ছাড়তে পারেননি, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ আর কিছু প্রিয় স্মৃতির জন্য। কারণ টেডি তাঁদের কাছে বিভিন্ন সময়ে অভাব পূরণের জায়গা হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে মন ভাল করা ‘জাদু কী ঝপ্পি’ পাওয়ার একমাত্র আশ্রয়।

Advertisement
আরও পড়ুন