Biophilic or Microclimate Interior Design

ঘরে বন্দি এক টুকরো অরণ্য, প্রকৃতির স্পর্শে ফিরছে শান্তি, অন্দরসাজে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘বায়োফিলিক’

আলো, হাওয়া, সবুজে মাখামাখি এ অন্দরসাজে ভরা রয়েছে প্রাণশক্তি। ঘরের কোনায় আসবাবের সঙ্গে মিলেমিশে যাক সবুজ প্রকৃতি। ‘বায়োফিলিক’ বা ‘মাইক্রো ক্লাইমেট’ কেবল ঘর সাজানোর ধরন নয়, বরং ঘরের ভিতরে নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পছন্দের বাস্তুতন্ত্র তৈরির এক বিশেষ পদ্ধতিও।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ০৯:০২
Why Nature-Inspired Homes Are Becoming Popular

ঘরের ভিতর প্রকৃতি, আবহাওয়াকেও নিয়ন্ত্রণ করুন নিজের রুচি মতো। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মন কিসে ভাল হবে, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন, রান্না করলে মনের চাপ কমে যায়। কারও মতে, বই পড়লে মন ভাল হতে পারে। যদি কোনও কিছুতেই মন না বসে, তা হলে ঘর সাজিয়ে দেখতে পারেন। যেমন তেমন সাজানো নয়। কেবল আসবাব বা গাছ দিয়ে ঘর সাজানোর ধারণা এখন সেকেলে। নতুন ধারা ‘বায়োফিলিক’ বা ‘মাইক্রো ক্লাইমেট’। ঘরের ভিতরেই বন্দি করে ফেলা যাবে প্রকৃতিকে। আবহাওয়াও হবে আপনারই মর্জিমতো। সোজা কথায়, নিজের ঘরে নিজের মনের মতো বাস্তুতন্ত্র তৈরি করে ফেলার এক বিশেষ পদ্ধতিই হল ‘বায়োফিলিক’। ঘরের যে দিকে তাকাবেন, মনে হবে, ছায়ানিবিড় এক শান্তির নীড়। বিষণ্ণতা কোনও ঠাঁই নেই যেখানে।

Advertisement

বায়োফিলিকের ধারণা পুরনো, উপস্থাপনের কৌশলটি নতুন

অন্দরসজ্জার পরিবেশ ও জীবনযাপনের সঙ্গে প্রকৃতিকে মিশিয়ে দেওয়াই হল বায়োফিলিক। শব্দটি এসেছে ‘বায়োফিলিয়া’ থেকে যার অর্থ প্রকৃতিপ্রেম। ঘরের আনাচকানাচকে সাজিয়ে তোলা প্রকৃতির স্পর্শে। সেখানে শুধু গাছ দিয়ে ঘর সাজালে হবে না, দেওয়ালের রং, আসবাবের ধরন, আলো— সবই হতে হবে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অন্দরসাজ এমন হবে, যেখানে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির স্পর্শ পাওয়া যাবে। বাঙালি বাড়িতে বায়োফিলিকের ধারণা কিন্তু আজকের নয়। ঘরের সঙ্গে নিকোনো দালান, উঠোনে তুলসীমঞ্চ, একচিলতে বাগানে পুঁইমাচা বা খড়খড়ি দেওয়া জানলার শীতল স্পর্শ বহু প্রাচীন। অলস দুপুরে উঠোনে মাদুর বিছিয়ে বসে আলো-ছায়ার খেলা দেখার অভ্যাসকে আরও এক বার ফিরিয়ে আনার চেষ্টাই হচ্ছে বায়োফিলিকে। দু’কামরার ফ্ল্যাটকে বাড়ির গড়ন দেওয়ার চেষ্টা হবে নানা ভাবে। চিলতে বারান্দায় ফুল গাছ লাগিয়ে, টবে ক্যাকটাস-অর্কিড বসিয়ে, ব্যালকনির রেলিং থেকে লতানে ফুলগাছ ঝুলিয়ে দিয়ে আবাসকে মনের মতো করে সাজানোর প্রয়াস করবে বায়োফিলিক।

ঘরের ভিতরেই থাক প্রকৃতির পরশ।

ঘরের ভিতরেই থাক প্রকৃতির পরশ।

এর সঙ্গেই জুড়ে গিয়েছে ‘মাইক্রো-ক্লাইমেট’ শব্দটি। ইংরেজিতে ‘ক্লাইমেট’ বলতে জলবায়ু বোঝানো হয়, যা পরিবর্তনশীল। অন্দরসজ্জায় এর অর্থ হল পুরো ঘরের সাজসজ্জার ধরন এক রেখে, ঘরের যে কোনও একটি কোণ বা কর্নারকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে সাজিয়ে তোলা। সে জায়গাটি দেখতে ঘরের বাকি অংশের চেয়ে আলাদা হবে। আবহাওয়ার পরিবর্তনে সাজও বদলে ফেলা যাবে। যেমন প্রচণ্ড গরমের সময়ে ঘরের কোণটিকে এমন ভাবে সাজালেন, যা ঘরের বাকি অংশের চেয়ে ঠান্ডা থাকবে। ঠিক উল্টোটা হবে শীতের সময়ে। ঘরের একটি অংশে সম্পূর্ণ আলাদা বাস্তুতন্ত্র তৈরি হবে। চাইলে সেখানে কৃত্রিম ঝর্না ও চারপাশে গাছ বসিয়ে ঠিক অরণ্যের মতো রূপও দেওয়া যাবে।

বায়োফিলিকে ঘর সাজানোর নানা ধরন

জানলা-দরজায় হালকা রঙের পর্দা লাগান। জানলার বাইরে পাখিদের ঘর বানিয়ে দিন। জানলায় থাকবে নানা রকম গাছ। সকালে চায়ের কাপটি নিয়ে জানলার ধারে বসলে যাতে গাছগাছালির গন্ধ ও পাখির কলতান শুনতে পান সে ব্যবস্থা করতে হবে। ছোট টেবিল ও আরামদায়ক বেতের মোড়া দিয়ে জানালার পাশে তৈরি করে নিতে পারেন ব্রেকফাস্ট জ়োন।

সিলিং সজ্জাতেও থাকবে গাছগাছালি।

সিলিং সজ্জাতেও থাকবে গাছগাছালি।

পুরো ঘরে হয়তো উজ্জ্বল সাদা আলো রয়েছে, কিন্তু মাইক্রো-ক্লাইমেট কর্নারের জন্য ব্যবহার করতে পারেন ওয়ার্ম লাইট। সুন্দর ফ্লোর ল্যাম্প, ফেয়ারি লাইট বা সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘরের কোণটিতে একটি শান্ত এবং মায়াবী আবহ তৈরি করে ফেলুন।

যে অন্দরসজ্জার মূল উপজীব্য প্রকৃতিপ্রেম, তাতে গাছের ভূমিকা যে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং, বাড়ির আকার, আসবাবপত্রের অবস্থান অনুসারে পছন্দসই গাছ কিনে ফেলুন। বিছানার পাশে একটা লম্বা পাম গাছ রাখতে পারেন। জানলার ধারে থাক স্নেক প্ল্যান্ট, জ়েড প্ল্যান্ট, মানিপ্ল্যান্ট, পিস লিলি। ইদানীং ওয়ার্ক ফ্রম হোমের যুগে বাড়িতে তৈরি করতে হয়েছে অফিস স্পেসও। সেখানে অবশ্যই রাখুন ছোট ছোট নানা রকম গাছ।

অন্দরে প্রকৃতিকে ডেকে আনতে আরও বেশি করে প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করতে হবে।

অন্দরে প্রকৃতিকে ডেকে আনতে আরও বেশি করে প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করতে হবে।

ঘরের লাগোয়া খোলা বড় বারান্দা থাকলে সেখানে তৈরি করে ফেলুন কৃত্রিম ঘাসজমি। সেখানেও থাকবে নানা প্রকার গাছ। সম্ভব হলে তৈরি করুন তুলসীমঞ্চ। ছাদ-বাগান করার সুবিধা থাকলে ভাল। ছাদে বাগান করা যদিও খুব একটা সহজ কাজ নয়। বেশ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে আগে ছাদটিকে গাছ লাগানো কিংবা বাগান করার মতো উপযোগী করে নেওয়া দরকার। ছাদে বাগান করার সময় সবচেয়ে আগে রুফ ট্রিটমেন্ট করিয়ে নেওয়াও জরুরি। ছাদের মধ্যে বেশ কয়েক ভাবে বাগান করা যায়। ছোট টবগুলোয় একটু সমস্যা হয়, কারণ গাছ খুব একটা বাড়ে না। তাই সিমেন্টের বড় টব কিনে বা বানিয়ে নেওয়া যায়। এ ছাড়াও বড় প্লাস্টিকের ড্রামেও লাগানো যায় গাছ। তবে যেখানেই গাছ লাগান না কেন, এগুলোর মধ্যে একেবারে নীচে কয়েকটা ছিদ্র করে নিতে হবে। যাতে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যায়। এ বার কিছু পাথরের টুকরো টবের একেবারে নীচে দিতে হবে। তার পর এক ধাপ মাটি। মাটির উপরে সার। জৈব সার হলেই সবচেয়ে ভাল। তার পর আবার মাটি। এ ভাবেই টব প্রস্তুত করতে হবে। বড় গাছের বনসাই, কলমের ফল কিংবা ফুলের গাছ লাগানোই সবচেয়ে ভাল।

অন্দরে প্রকৃতিকে ডেকে আনতে আরও বেশি করে প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করতে হবে। কাঠ, পাট, বাঁশ, পাথর ইত্যাদি দিয়ে তৈরি সামগ্রী দিয়ে ঘর সাজালে ভাল। ঘরের রংও হতে হবে সেই অনুযায়ী। বেছে নিতে পারেন প্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলানো ফ্লোরাল ওয়ালপেপারও। বিশেষ করে, হালকা সবুজ, হালকা নীল, বাদামির নানা শেড, লেমন ইয়ালো, ক্রিম, বেজ প্রভৃতি রং আপনার ঘরকে দেবে আলাদা মাত্রা।

বায়োফিলিক অন্দরসাজে জলের শব্দ থাকা খুব জরুরি। ফ্ল্যাটবাড়িতে ছোট জলাশয় তৈরি করা কঠিন। তাই ইনডোর ফাউন্টেন বসাতে পারেন। তবে তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে সঠিক উপায়ে।

Advertisement
আরও পড়ুন