নাটকের একটি দৃশ্য ছবি: কোয়েলা বাগচি।
গত ১১ মার্চ অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে মঞ্চস্থ হল স্বপ্নসন্ধানী নাট্যদলের নতুন নাটক— ‘ম্যাকবেথ ২.০’। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এই নাটকটি শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ শুধু নয়, এটি ওই নাটকটির ‘অ্যাডভান্সড ভার্শন’। স্কটল্যান্ড নয়, এই নাটকের প্রেক্ষাপট রণবিধ্বস্ত গাজ়া। সেখানে যুদ্ধের সাইরেন বাজছে। মৃত শিশুরা নিজেদের কবর খুঁজছে। মৃত্যুর পারে নিজেদের মধ্যে খেলছে। ডাইনিরা নার্সে পরিণত হয়েছে। তারা আহত পুরুষ-সৈন্যর দেহ নিয়ে টানাটানি করছে। নরকের প্রলম্বিত ছায়ায় ঢেকে আছে চরাচর। এক বিপুল লোকক্ষয়ী ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে শুরু হচ্ছে ‘ম্যাকবেথ’-এর এই নবতম অ্যাডাপটেশন।
একটা যুগের, একটা জাতির মর্মান্তিক বিপন্নতা এসে, এই আপাত-সুসভ্যতার চামড়া তুলে, তার ভিতরের দগদগে ঘা-গুলোর উপরে আলো ফেলে বলছে— এই ভাবে ধ্বংস হচ্ছে মানুষের সাধের জীবন। স্বপনবরণ আচার্য ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকটির মধ্যে সুষ্ঠু ভাবে বুনে দিয়েছেন এ সময়ের রক্তনকশা। ব্যবহার করেছেন অনুরাধা মহাপাত্রর লেখা একটি কবিতা ও তৃষা চক্রবর্তী অনূদিত ব্রেখটের একটি গান, সেটি সুর করেছেন ও গেয়েছেন উজান চট্টোপাধ্যায়। ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকটিতে মিশে আছে বিভিন্ন সময়ের ন্যারেটিভ, রাষ্ট্রনেতাদের হুঙ্কার ও চোখরাঙানি। আসলে এটি একটি রাজনৈতিক নাটক, যা স্বৈরাচারের অন্দরমহলে নিয়ে যায় দর্শককে। বল্গাহীন ক্ষমতার লোভ ও পৃথিবীকে দাবড়ে, শাসিয়ে, ভেঙেচুরে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়ার যে অদম্য স্পৃহা, তারই প্রতীক হয়ে উঠেছে এই নাটকের ম্যাকবেথ।
নাটকটি দেখার পর যা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে, তা হল, কৌশিক সেন ও রেশমি সেনের ক্ষুরধার অভিনয়। নাটকের সিংহভাগ জুড়ে মঞ্চে তাঁদের প্রবল উপস্থিতি এই নাটকটিকে এক স্বাভাবিক গভীরতা প্রদান করেছে। কৌশিক সেনের অভিনয়ের স্বকীয়তার কথা আমরা সকলেই জানি। এই নাটকে দেখার বিষয় ছিল, ম্যাকবেথ চরিত্রটি তিনি কী ভাবে ধারণ করেছেন। তাঁর ম্যাকবেথ কেমন? নাটকটি দেখতে দেখতে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি তাঁর সমস্ত অভিনয়মুদ্রা দিয়েই ম্যাকবেথকে পুনর্নিমাণ করেছেন এবং তাঁর রুদ্ধশ্বাস অভিনয় মুগ্ধ করে। ম্যাকবেথের ক্রমপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে চুরমার করে ভেঙেছেন তিনি। ডানকানের মৃত্যুর পরে তাঁর ভয় পাওয়ার দৃশ্য, ব্যাঙ্কোর প্রেতকে দেখে উন্মত্ত হওয়ার দৃশ্য, মনের তীব্র সংঘাত ফুটিয়ে তোলার সময়ে দু’হাতে দু’টি পুতুল নিয়ে অভিনয় করার দৃশ্য— এমন নানা দৃশ্যে তাঁর অভিনয় যে কোনও নবীন নাট্যাভিনেতার কাছে শিক্ষণীয়। মুখের নানা পেশির উপর অভিনেতার নিয়ন্ত্রণ বিস্মিত করে।
পাশাপাশি লেডি ম্যাকবেথের চরিত্রে রেশমি সেন দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। লেডি ম্যাকবেথের উচ্চাশা, উন্মাদনা তিনি গভীর দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন এই নাটকে। ভীত ম্যাকবেথকে হুঙ্কার দিয়ে জাগিয়ে তোলার দৃশ্য অভিভূত করে। অতি-অভিনয়ের প্রলোভন থেকে সরে এসে তিনি দৃঢ় নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে লেডি ম্যাকবেথের চরিত্রটিকে এঁকেছেন। তিন ডাইনির ভূমিকায় অর্চিতা মিত্র, রেনেসাঁ বসু ও নিবেদিতা দে চমৎকার কাজ করেছেন। গাজ়ার শিশুদের ভূমিকায় যে সব শিশু-শিল্পী অভিনয় করেছে, তারা সকলেই সুন্দর অভিনয় করেছে। আহত সৈনিক ও ব্যাঙ্কোর প্রেতের ভূমিকায় রায়ান রায় যথাযথ। নাটকের শেষে ঋদ্ধি সেন ও সুরাঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যায়। তাঁরাই কি ভবিষ্যতের ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথ? নাটকটি ইশারা করে, নির্দিষ্ট করে বলে না।
সৌমেন চক্রবর্তীর আলো, দীপ্তেশ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনা, রেশমি সেনের পোশাক পরিকল্পনা ভাল লেগেছে। ‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকটির মঞ্চসজ্জা, সম্পাদনা ও নির্দেশনা কৌশিক সেনের। এই নাটকে অসাধারণ কিছু দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন তিনি। পণ্ডিতদের মতে, ১৬০৬ সাল নাগাদ শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ প্রথম মঞ্চস্থ হয় লন্ডনে। এর পর কেটে গিয়েছে প্রায় চারশো কুড়ি বছর। সময়ের নিরিখে তা কম কিছু নয়। এই নাটকটি নিয়ে দেশ-বিদেশের নাট্য নির্দেশক ও চলচ্চিত্র পরিচালকরা পূর্বে কাজ করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা প্রেক্ষাপট।
‘ম্যাকবেথ ২.০’ নাটকটিতে কৌশিক সেন নিজের মতো করে ম্যাকবেথকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। আদ্যন্ত একটি রাজনৈতিক বার্তাপূর্ণ ভাষ্য তৈরি করেছেন। এই কালখণ্ডে দাঁড়িয়ে এই ভাষ্য নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই নাটক দেখতে হলে দর্শককে ম্যাকবেথ নাটকটির মূল সূত্রটি জেনে আসতেই হবে, নাহলে রসহানি ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
অনুষ্ঠান
নারীদিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানে।