আশাপ্রদ: চারুবাসনায় ইমন দে-র চিত্রকর্মের প্রদর্শনী
তরুণ শিল্পী ইমন দে। নামটি হয়তো এখনও মূলধারার শিল্পপরিসরে বহুল উচ্চারিত নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক একক প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ দেখার পর সহজেই বলা যায়, তিনি মনোযোগ দাবি করেন। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়েছেন অশোক গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল সেনগুপ্ত এবং অগ্রজ সুমন দে-কে। সেই অনুশীলন ও অধ্যবসায়ের ছাপ তাঁর কাজে স্পষ্ট। চারুবাসনার সুনয়নী চিত্রশালায় প্রবেশ করে যে অনুভূতিটি হয়, তা এককথায় বিস্ময়ের। এত অল্প বয়সে এমন আত্মবিশ্বাসী রংচেতনা এবং নিজস্ব ভিসুয়াল ভাষা সহজে দেখা যায় না। কোনও কাজই অনুকরণনির্ভর নয়, বরং ধীরে ধীরে নিজস্ব এক স্টাইলের পথে এগোনো।
ইমন দে-র সাম্প্রতিক একক প্রদর্শনীতে ২৯টি কাজ যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছে এক নীরব ভূদৃশ্য-আখ্যান। এই ভূদৃশ্য কেবল প্রকৃতি নয়, এটি জমির কাহিনি। যে জমির ভিতরে আছড়ে পড়েছে সময়ের ক্ষত। কাজের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে উল্লম্ব রেখার পুনরাবৃত্তি। খুঁটি, স্তম্ভ, বেড়া। কখনও কাঁটাতারের মতো টানটান, কখনও স্থাপত্যের অবশিষ্টের মতো নিশ্চুপ। এই উল্লম্বতা বুঝিয়ে দেয় বিভাজনের চিহ্ন। জমি এখানে আর বিস্তৃত মুক্ত প্রান্তর নয়, পরিমাপ করা, দখল করা এক সংকীর্ণ মানচিত্র।
শিল্পজীবনের শুরুতে তিনি প্রচুর রিয়্যালিস্টিক কাজ করেছেন— যা শিল্পচর্চার এক প্রয়োজনীয় অধ্যায়। কিন্তু বিমূর্তের জগৎ তাঁকে অদ্ভুত ভাবে আকর্ষণ করেছে। এই প্রদর্শনীতে সেই বিমূর্ত অভিযাত্রারই পূর্ণতর রূপ ধরা পড়ে। তাঁর বিমূর্ততা সম্পূর্ণ আকারহীন নয়, বরং বাস্তবের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অভিঘাত থেকে উঠে আসা এক রূপান্তরিত ভাষা। এ ভাবেও বলা যেতে পারে, বাস্তবের অনুবাদ নয়। বেছে নিয়েছেন এক ইঙ্গিতের ভাষা।
‘ল্যান্ড’ বা জমি— এই মোটিফ প্রদর্শনীর প্রায় প্রতিটি কাজেই প্রতিধ্বনিত। নগর কলকাতার মাটির উপরে যে নিরবচ্ছিন্ন আঘাত চলছে— উচ্চভবন, দখল, ভাঙচুর, পুনর্গঠন— তার মানবিক প্রতিফলন তাঁর ছবিতে অনুরণিত। কোথাও জমির অবস্ট্রাকশন আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, কোথাও বা রঙের স্তরে স্তরে জমেছে অস্থিরতার চাপা আর্তি। মাটি যেন আর স্থির নেই— তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও তাই অনিশ্চিত।
রং ব্যবহারে শিল্পী যথেষ্ট সংবেদনশীল। অ্যাক্রিলিকের নীল, সবুজ, ধূসর, ইয়েলো অকারের একাধিক স্তর ছবিতে গভীরতা তৈরি করেছে, কোথাও ঘন, কোথাও স্বচ্ছ। তার উপরে চারকোলের বলিষ্ঠ রেখা ক্ষতচিহ্নের মতো উঠে এসেছে পৃষ্ঠতলে। কিছু কিছু কাজে স্ক্র্যাপিং ও টেক্সচারের ব্যবহার দেখার মতো। রেখানির্ণয় শুধুই বিভাজন তৈরি করে না, বরং অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনেরও ইঙ্গিত দেয়। কখনও তা জমির ফাটল, কখনও মানচিত্রের বিভ্রান্ত সীমানা, কখনও বা মানুষের অদৃশ্য উদ্বেগের রেখাচিত্র।
ইমন দে-র কাজের বিশেষ শক্তি তার আবহ নির্মাণে। নীল আকাশ প্রায় প্রতিটি কাজেই উপস্থিত। তবে এই নীল প্রশান্ত নয়। বরং এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা বহন করে। জমির ক্ষয়, শুষ্কতা, বিভাজন, আর উপরে বিস্তৃত আকাশ। যেন দখলের চিহ্ন আকাশকেও ছাড়েনি। এই দ্বন্দ্ব ছবিগুলিকে গভীর করে তোলে। সরাসরি বয়ান নেই, তবু সামাজিক সঙ্কট স্পষ্ট। তিনি স্লোগান তোলেন না, বরং রং ও টেক্সচারের স্তরে স্তরে এক মানসিক ভূমানচিত্র নির্মাণ করেন। কিছু কিছু কাজ বিশেষ ভাবে আশাপ্রদ— যেখানে রঙের ভারসাম্য, কম্পোজ়িশনের ছন্দ এবং রেখার নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে মিলেছে।
শিল্পীর ‘ল্যান্ডস্কেপ’ কাজটিতে পার্সপেক্টিভের ব্যবহার লক্ষণীয়। দিগন্তের দিকে ছুটে যাওয়া আলোকরেখাগুলি দর্শককে চিত্রের ভিতরে টেনে নিয়ে যায়। নীল, ধূসর প্যালেটের উপরে সাদা রেখার বিকিরণ এক ধরনের ভোর কিংবা বিচ্ছুরিত আলোর ইশারা দেয়। এখানে প্রকৃতি বাস্তবের অনুকরণ নয়, যেন স্মৃতির উপর দিয়ে বহু বার হেঁটে যাওয়া। তবে তুলনামূলক ভাবে ‘ফ্র্যাগমেন্ট অব থট’ কাজটি অধিক গঠনমূলক। জ্যামিতিক গ্রিড এখানে যুক্তির কাঠামো, তার উপর বক্ররেখার প্রবাহ, চিন্তার খণ্ডিত বিন্যাসকে দৃশ্যমান করে। লাল ও গাঢ় বাদামি টোনে মানসিক উত্তাপ স্পষ্ট। এখানে স্থিরতা নেই। বরং স্তরবিন্যাসের মধ্যে ক্রমাগত পুনর্গঠন। যদিও কিছু অংশে অতিরিক্ত ঘনত্ব দৃশ্যপাঠকে জটিল করে তোলে। অন্য দিকে ‘নেচার’ কাজটি উক্ত দু’টি কাজের তুলনায় বেশি সংযত। উল্লম্ব রেখার প্রাবল্যে বৃষ্টিপাত, বনভূমি অথবা কুয়াশা ঢাকা প্রাকৃতিক আবহের ইঙ্গিত মিললেও, এটি প্রকৃতির একটি বিমূর্ত প্রতিধ্বনি। পৃষ্ঠতলে রঙের গলন ও মাটিরঙের স্তরীয় ব্যবহার চিত্রটিকে ধ্যানমগ্ন করে তোলে।
সব কাজ সমান শক্তিশালী নয়— এ কথা বলতেই হয়। কোথাও কোথাও কম্পোজ়িশন আরও সংহত হতে পারত। কিছু ক্যানভাসে ফোরগ্রাউন্ডের স্পেস একটু বেশি ছড়িয়ে গিয়েছে। তবুও শেষ পর্যন্ত তাঁর চিত্রপটে আমরা যে দৃশ্য দেখি, তা নিছক ল্যান্ডস্কেপ নয়, এটি ল্যান্ড-পলিটিক্স। মাটির ভিতরে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস।
যদিও এটি তাঁর একক প্রদর্শনী, এর আগে চারুকলা অ্যাওয়ার্ড, সিমা এবং বিড়লার বার্ষিক প্রদর্শনীতেও অংশগ্রহণ করেছেন ইমন, যা তাঁর যাত্রাপথকে দৃঢ় করেছে। এই ধারাবাহিক উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই— বরং শিল্পজগতে পাকাপাকি প্রবেশের প্রস্তুতিতে রয়েছেন।
ইমন দে-র সাম্প্রতিক প্রদর্শনী এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত। তাঁর বিমূর্ত ভাষা এখনও বিকাশমান। যদি এই অনুসন্ধানী মনোভাব ও তীব্রতা বজায় থাকে, তবে ভবিষ্যতেতাঁর কাজ আরও পরিণত ও গভীর হয়ে উঠবে— এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।