বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের। মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানে থাকা আরও চার যাত্রীর। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে তেমনটাই জানিয়েছে সংবাদসংস্থা পিটিআই। অন্য দিকে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ভারতের উড়ান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ-কে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বিমানে থাকা পাঁচ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। অজিত ছাড়াও মৃতদের তালিকায় রয়েছেন এনসিপি নেতার দুই নিরাপত্তাকর্মী, দু’জন বিমানকর্মী (এক জন পাইলট, অপর জন ফার্স্ট অফিসার)।
প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, বুধবার সকাল পৌনে ৯টা নাগাদ মহারাষ্ট্রের বারামতী বিমানবন্দরে অবতরণ করার সময় বিমানটি ভেঙে পড়ে। ওই বিমানেই ছিলেন শরদ পওয়ারের ভ্রাতুষ্পুত্র তথা এনসিপি প্রধান অজিত। ভেঙে পড়ার পরেই বিমানটিতে আগুন ধরে যায়।
এই দুর্ঘটনার পর যে সমস্ত ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা গিয়েছে, বিমানটি দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুন নেবানোর চেষ্টা করছে দমকল। ঘটনাস্থলে রয়েছে পুলিশও। তবে কী কারণে এই দুর্ঘটনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
অজিতের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ রাজনৈতিক মহল। শোকপ্রকাশ করেছেন দেশের তাবড় তাবড় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। শোকপ্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিমান দুর্ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি তুললেন মমতা। একই সঙ্গে শরদ পওয়ার-সহ গোটা পওয়ার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। অজিতের উত্থান এবং রাজনৈতিক দক্ষতার কথা স্মরণ করে এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— সকলেই শোকপ্রকাশ করেছেন। রাজ্যসভার সাংসদ তথা শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) নেতা সঞ্জয় রাউত অজিতের মৃত্যুকে মহারাষ্ট্রের ‘কালো দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, অজিত ছাড়া মহারাষ্ট্রের রাজনীতি অপূর্ণ।
মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী তথা এনসিপি-র বর্ষীয়ান নেতা অজিত বিগত কয়েক দশক ধরে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি নজরে পড়ার মতো ছিল তাঁর সম্পত্তির পরিমাণও।
নির্বাচনী হলফনামা এবং বিভিন্ন সরকারি নথি অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী নেতা অজিত সে রাজ্যের সবচেয়ে ধনী রাজনীতিবিদদের মধ্যেও এক জন ছিলেন। একনজরে দেখে নেওয়া যাক তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অজিতের পরিবারের মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১২৪ কোটি টাকা। মাথায় ঋণের বোঝাও ছিল প্রায় ২১ কোটির। অর্থাৎ, ঋণের পরিমাণ বাদ দিলে অজিতের মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১০৩ কোটি টাকা।
অন্য দিকে, ২০২৪ সালের মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের হলফনামার হিসাব বলছে, অজিতের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৮ কোটি টাকারও বেশি এবং স্থাবর সম্পত্তির মূল্য প্রায় ৩৭ কোটি টাকা।
অজিতের ঘোষিত সম্পত্তির বড় অংশ জুড়েই রয়েছে জমি, বাড়ি-সহ স্থাবর সম্পদ। চারটি আবাসিক সম্পত্তি ছিল অজিতের। এর মধ্যে দু’টি বাড়ির মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা করে। তৃতীয় একটি বাড়ির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা এবং চতুর্থ বাড়িটির মূল্য ছিল প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৪৫ কোটি টাকারও বেশি।
মহারাষ্ট্রের সদ্যপ্রয়াত উপমুখ্যমন্ত্রীর এই সম্পত্তিগুলিই প্রমাণ করে রাজ্য জুড়ে রিয়্যাল এস্টেট খাতে ভাল রকম বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি।
অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা পওয়ারও পারিবারিক রিয়্যাল এস্টেট সম্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্মিলিত ভাবে ২২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের চারটি ফ্ল্যাটের মালিক সুনেত্রা।
ঘরবাড়ির পাশাপাশি দম্পতির মালিকানাধীন জমিজমার পরিমাণও বিশাল। তাঁদের মালিকানাধীন একটি কৃষিজমির মূল্য প্রায় ১৩.২১ কোটি টাকা। কৃষি-বহির্ভূত জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৭ কোটি টাকা।
অজিতের পরিবারের ১১ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের একটি বাণিজ্যিক ভবনও ছিল, যা তাদের স্থাবর সম্পত্তির ভিত্তি আরও প্রসারিত করেছিল।
জমি-বাড়ির বাইরে অজিতের সম্পত্তির তালিকায় ট্রাক্টর, রুপোর পাত্র, স্থায়ী আমানত, শেয়ার এবং বন্ডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মহারাষ্ট্রের সদ্যপ্রয়াত উপমুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে রাজ্যসভার সাংসদ তথা অজিত-জায়া সুনেত্রাও তাঁর হলফনামায় উল্লেখযোগ্য সম্পত্তির কথা প্রকাশ করেছেন। সেই হলফনামা অনুযায়ী, সাড়ে ১৪ কোটি টাকারও বেশি অস্থাবর এবং প্রায় ৫৯ কোটি টাকার বেশি স্থাবর সম্পত্তির মালিক তিনি। অর্থাৎ, স্বামী এবং স্ত্রীর মিলিত সম্পত্তির পরিমাণ ১০০ কোটির বেশি।
আর্থিক দিক থেকে ফুলেফেঁপে ওঠার পর তদন্তের আওতায়ও পড়েছিল অজিত পওয়ারের পরিবার। ২০২১ সালে আয়কর কর্তৃপক্ষ বেনামি সম্পত্তি তদন্তের অংশ হিসাবে অজিত পওয়ার এবং তাঁর আত্মীয়দের সঙ্গে যোগ থাকা প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল। তবে ২০২৪ সালে প্রমাণের অভাবে অজিতকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তিও তাঁকে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।
১৯৮২ সালে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন অজিত। ১৯৯১ সালে প্রথম বার বিধায়ক হন তিনি। তখন থেকেই বারামতীর বিধায়ক অজিত। একাধিক মেয়াদে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
২০১৯ সালে বিজেপির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত জোটের পর অজিত মহাবিকাশ অঘাডী সরকারে যোগ দেন এবং ২০২৩ সালে শিন্দে-বিজেপি শিবিরের সঙ্গে জোট বাঁধেন। বুধবার সেই অজিতই বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
এনসিপি সূত্রে খবর, জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের হয়ে প্রচারের জন্য মুম্বই থেকে বারামতী যাচ্ছিলেন মহারাষ্ট্রের ‘মহাজুটি’ সরকারের অন্যতম শরিক তথা উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত। একটি ব্যক্তিগত বিমানে সফর করছিলেন তিনি। বারামতী বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শিবাজি তওয়ারে জানিয়েছেন, অবতরণের সময় বিমানটি রানওয়ের একদম ধারে চলে যায়। তার পরেই বিমানটি ভেঙে পড়ে। টুকরো টুকরো হওয়ার পরেই বিমানটিতে আগুন ধরে যায়।
ডিজিসিএ-র তরফে জানানো হয়েছে, কী কারণে দুর্ঘটনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটি পাহাড় এবং জঙ্গলে ঘেরা। প্রাকৃতিক, যান্ত্রিক না অন্য কোনও কারণে দুর্ঘটনা, তা তদন্তের পরেই জানা যাবে বলে জানিয়েছে ডিজিসিএ। স্বাভাবিক ভাবেই, অজিতের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিমান দুর্ঘটনার খবর পেয়েই মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফডণবীসকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ।